আকাশবার্তা ডেস্ক :
সদ্য জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম ধাপের প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন শিক্ষককে সহকারি শিক্ষক হিসেবে গেজেট প্রকাশ করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো (কমিউনিটি ও স্যাটালাইট) জাতীয়করণের ঘোষণা দেন। এরফলে প্রথম ধাপে ধারাবাহিক ভাবে বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণকে জাতীয়করণ করা হয়। কিন্তু জাতীয়করণের আগে কর্মরত প্রধান শিক্ষক পদের পরিবর্তে সহকারী শিক্ষক করে জাতীয়করণ করা হয়।
তৎকালীন সময়ে উক্ত শিক্ষকরা উচ্চ আদালতে প্রধান শিক্ষক পদ ফিরিয়ে পেতে রিট দায়ের করেন। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে কিছু নামধারী শিক্ষক সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। তারা বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষকদের মন্ত্রণালয় থেকে প্রধান শিক্ষকের গেজেট করিয়ে দেওয়ার কথা বলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শিক্ষক নামধারি ঐ সিন্ডিকেট চক্র অসহায় শিক্ষদের মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে বিভিন্ন সময়ে টাকা নিতে থাকেন। সর্বশেষ তারা বিভিন্ন জেলায় তাদের প্রতিনিধি তৈরি করে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকের গেজেট করিয়ে নেয়ার জন্য শিক্ষক প্রতি প্রায় ১৫ হাজার টাকা করে চাঁদা উঠায়। এতে প্রায় ৪০০ শিক্ষকের একটা তালিকাও করেছে বলে জানিয়েছেন কয়েক জন ভুক্তভোগী শিক্ষক।
হবিগঞ্জ জেলার কয়েকজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার সংবাদকে বলেন আমরা উচ্চ আদালতে রিট করার সময় বেশ কয়েকজন শিক্ষকের সাথে পরিচয় হয়। তারা বলেন, গোফুর ও মানিক নামের দুই শিক্ষক বিভিন্ন জেলায় একজন করে প্রতিনিধি যুক্ত করেছেন। মুলত এদের মাধ্যমেই টাকা লেনদেন হয়ে থাকে। নড়াইল জেলার রীটকারি শিক্ষক শ্যামল কান্তি দাশ আমার সংবাদকে জানান, আমার কাছে গোফুর গেজেট করিয়ে দেওয়ার জন্য টাকা চেয়েছিলো, পরে আমি তাদের কথায় বিশ্বাস না পাওয়ায় আর টাকা দেয়নি।
এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় সিন্ডিকেট দেলোয়ার মাস্টারের সাথে। তিনি সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ফুলপেতুয়া, প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। তাকে ফোন দিলে জানান, আমি এখন অনেক ব্যস্ত সময় পার করছি। মিরপুর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে আছি। আপনার কথা থাকলে এখানে আসতে পারেন। তাকে ৪০০ জনের একটি লিষ্ট হয়েছে এমন কথা বললে তিনি জানান, আমরা ৪০০ জনের একটা তালিকা দিয়েছি। সরকারি গেজেট করে নিতে কি পরিমান টাকা দিতে হবে জানতে চাইলে দেলোয়ার হোসেন বলেন এতো কথা ফোনে বলা যাবে না।
আমি মন্ত্রণালয়ে যাবো যদি সুযোগ থাকে আপনার নাম ওই লিষ্টে যুক্ত করা হবে। আপনি যদি পারেন আমার সাথে সরাসরি দেখা করে কথা বলেন। সিন্ডিকেটের আরেক সদস্য নিলফামারী জেলার জলঢাকা উপজেলার উত্তর ছিরিঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো: সাফিয়ার রহমানের সঙ্গে শিক্ষক পরিচয়ে কথা বললে তিনি জানান, গেজেটের কাজ দুর্বার গতিতে চলছে। গেজেট দিতে গেলে কিছু অন্তরায় আছে সেগুলো সরে যাচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ে গেজেটের বিষয়ে কি অবস্থা জানতে চাইলে সাফিয়ার রহমান বলেন, গেজেট দিতে সবাই রাজি, এ টু জেড। মন্ত্রণালয়কে তালিকা দেয়া হয়েছে। তালিকার প্রস্তাবনা পাশ হয়েগেছে। আমরা একটা লিষ্ট করেছি তার ভিত্তিতে প্রস্তাবনা গেছে অধিদপ্তরে। এই প্রস্তাবনার জন্য মন্ত্রণালয়ে মিটিং চলছে। তিনি জানান, আমরা আগে বিভক্ত ছিলাম এখন একসাথে কাজ করছি। আমি তালিকা দিয়েছি, গোফুর এক তালিকা দিয়েছে এবং মানিক ভাই একতালিকা দিয়েছেন। সবগুলো একসাথে কাজ হচ্ছে। এখানে রীটে কোনো কাজ হবে না। সরাসরি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কাজ হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে সাফিয়ার রহমান বলেন, মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কাজ হচ্ছে। আমরা সব কিছু ওকে করছি। যা লাগে আমরা ফাস্ট স্টেপে সামলাইতে পারিনি। অর্থ সংকটের কারণে আমরা পারিনি। পরে গোফুরের মাধ্যমে টাকার যোগান দিয়ে কাজ কার হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, টাকা ছাড়া কিছু হয় না। আজ এতোগুলো সিদ্ধান্ত হয়েছে, টাকা ছাড়া সিদ্ধান্ত হয় নাকি। পরে গোফুরের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, তিনি এই সিন্ডিকেটের বড় নেতা। নঁওগা জেলার শিক্ষক। তাকে ফোন দিলে অনেক ব্যস্ততা দেখান। পরে সিন্ডিকেটের সদস্য সাফিয়ার ও মানিকের কথা বললে তিনি বলেন, আমি কোনো টাকা নিয়ে মন্ত্রণালয়ে কাজ করছি না। তারা (সাফিয়ার ও মানিক) তো মনছুরের লোক। আমি মামলা করেছি, মামলার জন্য সুপ্রিম কোর্টে কাজ করছি। টাকা নিয়ে আপনি মন্ত্রণালয়ে গেজেট করিয়ে দিবেন বলে প্রশ্ন করলে তিনি বিষয়টা এরিয়ে যান। এদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিদ্যালয় শাখাতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রথম ধাপের এসকল শিক্ষকদের নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। তাদের কোনো তালিকা অধিদপ্তর থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি।
এগুলো সব ভুয়া। তবে ঐ শাখায় একজন কর্মরত জানান, গোফুর নামের একজন নাকি বিভিন্ন জনের কাছ থেকে গেজেটের কথা বলে টাকা নিচ্ছেন। এর বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানে না মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. এ এফ এম মনজুর কাদির আমার সংবাকে বলেন, গেজেটের বিষয় টা একদম ভুয়া। ৪০০ জনের কোনো লিষ্ট করা হয়নি। প্রথম ধাপের জাতীয়করণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষদের নিয়ম অনুসারে সহকারি শিক্ষক হিসেবে গেজেট দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে থেকে কিছু কিছু রীট করেছে। সেগুলো আইনি বিষয়।
এগুলো মন্ত্রণালয় আইনগত ভাবে মোকাবিলা করবে। অতিরিক্ত সচিব বলেন, আমরা বারবার সবাইকে সতর্ক করে দেওয়ার পর কেনো তারা ভুল করেন। এগুলো একটা চক্র। এই রকম অনেক চক্র আছে। মনজুর কাদির বলেন, এদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তথ্য মতে, ২০১৩ সালে ২৬ হাজার ১৯৩টি বিদ্যালয়ের এক লাখ তিন হাজার ৮৪৫ শিক্ষকের চাকরি তিন ধাপে জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ২২ হাজার ৯২১, দ্বিতীয় ধাপে এক হাজার ৭১৯টি বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালের ৯ জানুয়ারি রাজধানীর প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত শিক্ষক মহাসমাবেশে ২৬ হাজার ১৯৩ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের ঘোষণা দেন।
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ