শুক্রবার ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ইং ১৫ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ:
লক্ষ্মীপুরে আগুনে পুড়ে ৯ দোকান ছাই, ৭৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি মানবিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গঠনে সবার সহযোগিতা চাই নবনির্বাচিত ২৯৭ সংসদ সদস্যের গেজেট প্রকাশ নির্বাচনে ভোটের বক্স নিয়ে যাবে নদীর দিকে, আশঙ্কা জেএসডি নেতার ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির মহিমান্বিত রজনী-শবে বরাত জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশ পাকিস্তান হয়ে যাবে : ফজলুর রহমান লক্ষ্মীপুরে ৬ সিলসহ ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার : বিএনপি-জামায়াত প্রার্থীর পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন যাদের জন্য দেশে আসতে পেরেছেন, তারা জুলাইয়ের অবদান অস্বীকার করছেন : ডা. শফিকুর রহমান লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে নিখোঁজের ৭দিন পর কলেজ ছাত্রের লাশ উদ্ধার লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে যৌথবাহিনীর অভিযানে অস্ত্রসহ শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘চিতা’ গ্রেপ্তার

‘উপকূল’ দিবস’ কেন চাই?

বিশেষ প্রতিবেদন


আনোয়ার হোসেন

প্রতিবছর বিভিন্ন দিনে বিশ্বব্যাপী নানা ‘দিবস’ পালিত হয়। এসব জাতীয় বা আন্তর্জাতিক দিবস সমূহের উদ্দেশ্য হচ্ছে, কোন একটি নির্দিষ্ট দিনে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা বৃদ্ধি বা ক্ষেত্র বিশেষ কোন অতীত ঘটনা স্মরণ বা উদযাপন করা। সাধারণতঃ প্রতিটি দিবসেই ‘প্রতিপাদ্য বিষয়’ নির্ধারণ করা হয় যা দিবসটির ভূমিকাকে জনসমক্ষে আরো গুরুত্ব ও অর্থবহ তুলে ধরা।

১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসে ‘ভোলা ঘূর্ণিঝড়’ নামক একটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় যা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ-এর) দক্ষিণাঞ্চলে আঘাত হানে। এ পর্যন্ত রেকর্ডকৃত ঘূর্ণিঝড় সমূহের মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ এবং এটি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এ ঝড়ের কারণে প্রায় ৫ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। যার অধিকাংশই জলোচ্ছ্বাসে ডুবে মারা যায়। এ ঘূর্ণিঝড়টি উত্তর ভারতীয় ঝড়ের মৌসুমের ৬ষ্ঠ ঘূর্ণিঝড় এবং ওই মৌসুমের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ছিল। এটি সিম্পসন স্কেলে ‘ক্যাটাগরি ৩’ মাত্রার ঘূর্ণিঝড় ছিল। ঘূর্ণিঝড়টি বঙ্গোপসাগরে ’৭১ সনের ৮ই নভেম্বর সৃষ্ট হয় এবং ক্রমশ শক্তিশালী হতে হতে এটি উত্তর দিকে অগ্রসর হতে থাকে।

১১ই নভেম্বর এটির গতিবেগ সর্বোচ্চ ঘন্টায় ১৮৫ কিঃ মিঃ (১১৫ মাইল) এ পৌঁছায় এবং সে রাতেই তা উপকূলে আঘাত করে। জলোচ্ছাসের কারণে (বর্তমান বাংলাদেশ) পূর্ব পাকিস্তানের দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চল ও দ্বীপসমূহ প্লাবিত হয়। এতে ঐসব এলাকার বাড়ি-ঘর, গ্রাম ও শস্য স্রোতে তলিয়ে যায়। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ছিল ভোলা জেলার তজুমদ্দিন উপজেলা, সেখানে ১ লক্ষ ৬৭ হাজার জন অধিবাসীর মধ্যে ৭৭ হাজার জনই (৪৬%) প্রাণ হারায়। এমন একটি দিনকে স্মরণীয় করে রাখতে আমরা কি পারবো না ?

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, ১৯৭০-এর আগে ১৮৭৬ খ্রীষ্টাব্দে ‘বাকেরগঞ্জ সাইক্লোন’-এ প্রায় ২ লাখ লোক প্রাণ হারিয়েছিল। এরমধ্যে এক লাখ লোকের মৃত্যু ঘটে দুর্ভিক্ষ ও মহামারীতে। ১৫৮২ খ্রীষ্টাব্দে বাকেরগঞ্জ তথা বর্তমান বরিশাল অঞ্চলে আরেকটি ঘূর্ণিঝড়ের কথা জানা যায়। ওই ঘূর্ণিঝড়েও ২ লাখ লোক প্রাণ হারান। ১৯৭০-এর পরের ঘূর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড় ছিল ভয়াবহ। এতে প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার লোকের প্রাণহানি ঘটে। এছাড়া ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডর, ২০০৮ সালের ৩ মে নার্গিস, ২০০৯ সালের ২৫ মে আইলা, ২০১৩ সালের ১৬ মে মহাসেন, ২০১৪ সালের ২৮ অক্টোবর নিলোফার, ২০১৬ সালের ২১ মে রোয়ানুসহ বেশকিছু ছোটবড় ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আঘাত হানে। তবে ১৯৭০-এর ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতা অন্যকোন ঝড় অতিক্রম করতে পারেনি। উপকূলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া অপেক্ষাকৃত বড় ঘূর্ণিঝড়গুলো এখনও স্মরণ করছে গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

দুর্যোগ ধেয়ে এলেই গণমাধ্যম, সমাজকর্মীসহ, সরকারি-বেসরকারি সকল স্তরের প্রতিনিধিগণ ছুটেন উপকূলের দিকে। দুর্যোগে সব লন্ডভন্ড হয়ে গেলে আরও বেশি মানুষ ছুটে যান সেখানে। এক পর্যায়ে আসে বৈদেশিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিগণ। বিশেষভাবে কেন্দ্রীয় গণমাধ্যমসমূহ তখনই উপকূলের কথা বেশি করে প্রচার করা হয়। কিন্তু দুর্যোগকালীন সময়ের বাইরে স্বাভাবিক সময়েও উপকূলের মানুষের জীবন যে কতটা অস্বাভাবিক, সে খবর কে রাখে ? জলোচ্ছ্বাস, নদী-ভাঙন, লবনাক্ততার প্রভাব প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে ফেরে এই মানুষগুলোকে। হয় তো চিন্তা করছেন; নোনাজলের ঝাপটায় ক্ষত-বিক্ষত হবে, উপকূল এটাই স্বাভাবিক! তার জন্য আবার দিবস কেন! প্রতিদিনই তো তার এক একটি দিবস। অবশ্যই প্রয়োজন আছে এদের জন্য একটি দিবসের। উপকূলবাসীর দিকে বছরে অন্তত একটি দিনে বিশেষভাবে নজর ফেলার জন্য, উপকূলের সংকট-সম্ভাবনার কথা বছরে অন্তত একটিবার সবাই মিলে বলার জন্যে একটি বিশেষ দিন চাই। সে কারণেই উপকূলের জন্য একটি দিবসের দাবি রাখে। সেদিন সবাই মিলে একযোগে উপকূলের কথা বলবে। উপকূলবাসীর জন্য সবচেয়ে শোকের দিন হিসাবে পরিচিত ১২ নভেম্বরই হতে পারে ‘উপকূল দিবস’। শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, গোটা বিশ্বের জন্যই এই দিনটি ‘ওয়ার্ল্ড কোষ্টাল ডে’ হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

উপকূল এত ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকার পরও ‘উপকূল দিবস’ হিসেবে কোন দিন নির্ধারণ হলো না কেন; আজ তা জনমনে প্রশ্ন! বিশেষ এদিনে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের স্মরণে দোয়া-মোনাজাতও করা হয়। কিন্তু এসব দুর্যোগে নিহত কিংবা নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের চোখের জল হয়তো কোনদিনই মুছবে না। স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে দুঃসহ জীবন কাটাচ্ছেন তারা। ‘উপকূল দিবস’ পালনের মধ্যদিয়ে ওইসব মানুষদের কান্না হয়তো থামানো যাবে না। তবে দুর্যোগ মোকাবেলায় মানুষকে অধিকতর সচেতন করে তোলা সম্ভব হবে বলে আমার বিশ^াস। বাংলাদেশের উপকূল নির্ধারণ করা হয়েছে তিনটি নির্দেশকের ভিত্তিতে। এগুলো হচ্ছে- ঘূর্ণিঝড়ের বাতাস, জোয়ার-ভাটার বিস্তৃতি ও লবনাক্ততার প্রভাব। ১৯টি জেলা উপকূলের আওতাভূক্ত। এরমধ্যে তিনটি জেলা অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ। এগুলো হচ্ছে যশোর, নড়াইল ও গোপালগঞ্জ। বাকি ১৬ জেলাকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন, পূর্ব-উপকূলের ৫ জেলা কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর। মধ্য-উপকূলের ৮ জেলা বরগুনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ভোলা, ঝালকাঠি, বরিশাল, চাঁদপুর, শরীয়তপুর এবং পশ্চিম উপকূলের খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা। প্রতিনিয়ত বহুমূখী প্রতিবন্ধকতার ভেতর দিয়ে এই এলাকার মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছে। দুর্যোগে সব হারাচ্ছে; তারপরও আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। সংকট ও সমস্যা যেমন এই এলাকায় রয়েছে, তেমনি অবারিত সম্ভাবনাও রয়েছে গোটা উপকূল জুড়ে।

বাংলাদেশে এ দিবসটি পালন শুরু হলে গোটা বিশ্বেই প্রথমবারের মত এ ধরণের একটি দিবস হবে। কারণ বিশ্বের কোথাও ‘কোস্টাল ডে’ পালিত হয়েছে বলে তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়নি। উপকূলের উন্নয়ন, সংকটের উত্তরণ, সম্ভাবনা বিকাশসহ উপকূলের অন্ধকারকে প্রকাশের আলোয় আনতে ‘উপকূল দিবস’ প্রবর্তন এখন সময়ের দাবি। দিবস পালনের ভেতর দিয়ে প্রতিবছর অন্তত একটি দিনে সবাই মিলে উপকূলের কথা বলা যাবে। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে দিবস পালনের মধ্যদিয়ে উপকূলের ইস্যুসমূহ সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাব ফেলতে পারবে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের উপকূলের নতুন নতুন দুর্যোগ সৃষ্টি হচ্ছে। এগুলো সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে তুলতেও একটি দিবসের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। দিবস তো কতই আছে! ডিম দিবস, পাখি দিবস, পানি দিবস, শকুন দিবস, হাতি দিবস, শিক্ষা দিবস, স্বাস্থ্য দিবস, জনসংখ্যা দিবস, নারী দিবস, গ্রামীণ নারী দিবস, মানবাধিকার দিবস, ভালোবাসা দিবসসহ আরও কত দিবসের ভিড়ে আরেকটি দিবসের প্রস্তাব করছি শুধুমাত্র উপকূলের জন্য। যে দিবস উপকূল সুরক্ষার কথা বলবে, উপকূলের সংকট-সম্ভাবনার কথা বলবে, উপকূলকে এগিয়ে নেওয়া কথা বলবে। যে দিবসে উপকূলবাসীর কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হবে।

এই উপকূল জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ন অবদান রাখছে। বিপুল সংখ্যক মৎস্যজীবী সমুদ্র-নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। আর তাদের আহরিত মাছ জাতীয় অর্থনীতির বিরাট অংশিদার। উপকূলের উন্নয়ন, সংকট সমাধান, সম্ভাবনা বিকাশ, পর্যটনের প্রসারসহ বিভিন্ন বিষয়ে সঠিক কর্মপরিকল্পনার লক্ষ্যে ২০০৫ সালে ‘উপকূল অঞ্চল নীতিমালা ২০১৫’ গৃহিত হয়। কিন্তু এই নীতির প্রতিফলন কোথাও দেখা যাচ্ছে না। এমন একটি দিনকে ‘উপকূল দিবস’ হিসাবে প্রস্তাব করছি।
‘১২ নভেম্বর’ দিনটি যেন উপকূলের মানুষের প্রাণে গেঁথে আছে’। এ দিনটি কখনোই ভুলতে পারবে না স্বজন হারানো মানুষেরা। দিনটি এলেই সেই ভয়াল ছবি তাঁদের চোখের সামনে ভাসে। তাছাড়া এ বছরও উপকূলে আরও কয়েকটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে। এসব বিবেচনায় ১২ নভেম্বরই হোক ‘উপকূল দিবস’। তথ্য সূত্র : উইকিপিডিয়া।

আনোয়ার হোসেন- সাংবাদিক ও লেখক

writerah@yahoo.com

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

ফেব্রুয়ারি ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« জানুয়ারি    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮