-
- জাতীয়, রাজনীতি
- ছন্দহারা ঐক্যফ্রন্ট
- আপডেট : November, 18, 2018, 5:10 am
- 333 জন পড়েছেন
আকাশবার্তা ডেস্ক :
মাত্র ৪২ দিন। তারপরই একাদশ সংসদ নির্বাচন। আওয়ামী লীগে আছে নির্বাচনি প্রস্তুতি। অন্যদিকে এখনো শর্ত দিয়ে যাচ্ছে বিএনপির সংসারে হওয়া ঐক্যফ্রন্ট! এই মুহূর্তে কী চাচ্ছেন ড. কামাল? নির্বাচন নাকি অন্য কিছু? তার ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছে আওয়ামী লীগ। বিএনপিও রয়েছে অন্ধকারে! কার হাতে দলের ভবিষ্যৎ?
বিএনপির জনপ্রিয়তা ও জনশক্তির ভাগ্য কে নির্ধারণ করবে? বিএনপি নাকি ড. কামাল, মান্না, আসম রবরা? ধোঁয়াশায় বিএনপির নীতিনির্ধারকরাও। এসব প্রশ্নের উত্তর তারাও জানেন না! কারণ ড. কামালও ঐক্যতে আসার আগে দেয়া প্রতিশ্রুতি রাখছেন না। তিনি বলেছিলেন, উদীয়মান সূর্য নিয়ে ভোটে লড়বেন এখন তিনি লড়ছেন ধানের শীষ প্রতীকে!
এছাড়াও বলেছিলেন, জামায়াত জোটে থাকলে তিনি থাকবেন না। এখন জামায়াতও আছে তিনিও আছেন! বিএনপির জনপ্রিয়তা ও জনশক্তিকে বাদ দিয়ে এখন বিএনপির কাছে ড. কামালের নতুন নতুন চাওয়া। একদিকে ঐক্যের জন্য আসন অন্যদিকে সুশীলদের জন্য আসন! বিএনপি ড. কামালকে শেষ পর্যন্ত কী দিয়ে সন্তুষ্ট রাখবে এমন প্রশ্নও উঠছে। তাদের এমন অগোছালো দাবিতেই অনড় সিদ্ধান্ত থেকে সাত দিন নির্বাচন পিছিয়ে ভোট ৩০ ডিসেম্বরে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। এখনো তারা আলোর ঘরে ফিরতে পারেনি।
ঐক্যফ্রন্টের অস্পষ্ট বক্তব্যে দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও কিছু বলতে পারছেন না। কারণ এর মধ্যেই হঠাৎ করে রাজরানৈতিক অঙ্গনে নির্বাচন বয়কট আলোচনা! ঐক্যফ্রন্টের সিদ্ধান্ত কী জানতে চাচ্ছে সবাই? ঐক্যফ্রন্টের প্রধানমন্ত্রী কে, ড. কামাল নাকি খালেদা জিয়া? নির্বাচনি ইশতিহার কার ছকে হবে, বিএনপি নাকি ঐক্যফ্রন্টের? খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্বাচন করতে পারবেন কিনা? যদি সেই সুযোগ না পান তাহলে নির্বাচনে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার হাতে? সাত দফা না মানলে কোন পথে হাঁটবেন? এর মাঝে হঠাৎ ফের এসকে সিনহাকে আলোচনায় নিয়ে আসছে বিএনপি।
অন্যদিকে ঐক্যফ্রন্টেও ড. ইউনূসের মতো নতুন মুখের গুঞ্জন! আর বিএনপিও নির্বাচনে থাকার জন্য পরিবেশকে শর্ত দিয়ে বসে আছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিএনপি চায়, ড. কামাল হোসেন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। ড. কামাল হোসেন প্রথমে বলেছিলেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণের তার কোনো ইচ্ছা নেই। তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। কিন্তু এখন শোনা যাচ্ছে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে সম্মত হয়েছেন। এমন বার্তা বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে জানিয়েছেন। তবে তিনি বিএনপিকে ৩টি শর্ত দিয়েছেন।
এ শর্তগুলো বিএনপি তাৎক্ষণিকভাবে মেনেও নিয়েছে বলে বিএনপির একাধিক সূত্রের মত।
১. নির্বাচনে ১০-২০টি আসন সুশীল সমাজের বিভিন্ন ব্যক্তিদের দিতে হবে। তাদেরকে জিতিয়ে আনার দায়িত্বও বিএনপিকে নিতে হবে।
২. নির্বাচনের ঘোষণাপত্র ও ইশতেহারে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও ক্ষমতার ভারসাম্য থাকতে হবে।
৩. জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হলে প্রথম দুই বছর বিএনপি মন্ত্রিত্ব কিংবা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিতে পারবে না। তারা শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সংসদে থাকবে।
দেশ পরিচালনা করবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যান্য দলগুলো। প্রথমে ড. কামাল হোসেন যে ১০ জন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নির্বাচনে আনার সুপারিশ করেছিলেন তারা হলেন বর্তমানে কারাবন্দি ঐক্যফ্রন্ট নেতা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান, অ্যাডভোকেট শাহদীন মালিক, মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল হাসান মশহুদ চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
এমন প্রস্তাবে বিএনপি মহাসচিব দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বলে ড . কামালকে আশ্বস্ত করেন। কিন্তু ফের শোনা যাচ্ছে এখন তিনি সেই সিদ্ধান্ত থেকেও সরে এসে দেশের বিশিষ্ট ২৫ নাগরিককে সংসদে দেখতে চান। ১০ এর সঙ্গে আরও ১৫ জন বাড়াতে চান। গণফোরামের একাধিক সূত্র সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, নবগঠিত রাজনৈতিক মোর্চা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক দল গণফোরাম নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপির কাছে ৫০টি আসন চাইবে। এর মধ্যে প্রায় ২৫টি আসনে দেশের বিশিষ্ট ২৫ নাগরিককে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হবে। এই ২৫ নাগরিক সবাই গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের পছন্দের প্রার্থী।
২৫ নাগরিকের মধ্যে রয়েছেন আইনজীবী শাহদীন মালিক, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার ছেলে রেজা কিবরিয়া, ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, রোকনউদ্দিন মাহমুদ, শিক্ষাবিদ আসিফ নজরুল।এ নিয়ে বিএনপির এক সিনিয়র নেতার সঙ্গে কথা বললে তিনি আমার সংবাদকে বলেন, ঐক্যফ্রন্টের শতাধিক আসন, অন্যদিকে সুশীলদের জন্য ২৫ আসন! এমন অদ্ভুত চাওয়া বিএনপির নীতিনির্ধারকরা পূরণ করলে তৃণমূলকে হারাবে। বিএনপিতে বিভক্তি তৈরি হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে।
তৃণমূলে বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মী হামলা-মামলায় ঘর ছাড়া। অনেক নিহত, গুম! দলের জন্য যাদের এত ত্যাগ তাদেরকে উপেক্ষা করে এতগুলো আসন ছেড়ে দিলে বিএনপির ভবিষ্যৎও অন্যের হাতে চলে যাবে। কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে তৃণমূলের দাবি, যেন তৃণমূলকে সাথে রেখেই বিএনপি ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ক্ষমতায় গেলে বেগম জিয়া ও তারেক জিয়াকে নিয়ে তাদের অবস্থান কি হবে? বিএনপির টিকিট নিয়ে অনেক জামায়াত নেতা নির্বাচন করবে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বলেছিল, তারা জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য করবে না। এটা তাহলে কি? তারেক জিয়ার ব্যাপারে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অবস্থান কি? তিনি এখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান শরিক।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কি বিএনপি নেতাকে বাদ দিয়েছে? এমন সব প্রশ্নের মাঝে নির্বাচনের চাইতে যেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা খালেদা জিয়ার মুক্তিকেই গুরুত্ব দেন। এছাড়াও গতকাল ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে মতবিনিময়ে সম্পাদকরা ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন ফ্রন্ট যদি জয়লাভ করে তাহলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন? যদিও সেই প্রশ্নের উত্তর সম্পাদকরা পাননি। সম্পাদকদের মত, কে প্রধানমন্ত্রী হবেন। সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সংসদীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে, সংসদীয় গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে। যেমন বাংলাদেশ ব্রিটিশ সংসদীয় ব্যবস্থা অনুসরণ করার চেষ্টা করে। ভারতে হোক, ব্রিটেনের হোক বা অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে সবাই কিন্তু আগে থেকে জানেন যে, এই দল বা এই জোট বিজয়ী হলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন। সেই বিষয়টা কিন্তু এই ফ্রন্টকে স্পষ্ট করতে হবে। সেটা তারা এখনো স্পষ্ট করেননি।
অন্যদিকে তারা যেন শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় টিকে থাকে দেশের জন্য, দেশের গণতন্ত্রের জন্য এমন পরামর্শও দেন।দেশের নির্বাচন প্রসঙ্গ টেনে গতকাল একটি অনুষ্ঠানে গণফোরামের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, সময় খুব কম, দেরি করা যাবে না। ২০১৪ সালের নির্বাচনের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন হয়েছিল। হাইকোর্ট আমাকে অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দিয়েছিল। তারা নির্বাচন বিষয়ে আমার মতামত জানতে চেয়েছিল। আমি বলেছিলাম, বলতে গেলে দুই মিনিটেই বলা যায় কোনো নির্বাচনই হয়নি। সে সময় সরকার বলেছিল, দ্রুত তারা আরেকটি নির্বাচন দেবেন?’ ‘আমি আন্দাজে বলছি না। রেকর্ড আছে।
দ্রুত নির্বাচন মানে কি পাঁচ বছর? আমি এটা জানতে চাই।’ ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘সরকার ভাওতাবাজি করেছে। ভাওতাবাজির জন্য তাদের গোল্ড মেডেল দেয়া উচিত।’ ড. কামাল বলেন, ‘পাঁচ বছরে আমরা কোনো গণতন্ত্র দেখতে পাইনি। জনগণের শাসন থেকে আমাদের বঞ্চিত করা হয়েছে, গণতন্ত্র থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, সংসদীয় শাসন থেকে জনগণকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নেতাকর্মীদের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, যদি জাতিকে বাঁচাতে হয়, বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে যদি বাঁচাতে হয়, আমাদের মানুষকে যদি বাঁচাতে হয়, আমাদের স্বাধীনতাকে যদি রক্ষা করতে হয়, তাহলে এই উপযুক্ত সময়। আসুন সবাই মিলে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভোটযুদ্ধে নেমে পড়ি। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা তাদেরকে পরাজিত করি। যেই তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে, তারপর থেকে এখন পর্যন্ত সাড়ে ৪শ গায়েবি মামলা হয়েছে। কীভাবে নির্বাচন করবেন? এভাবেই করতে হবে।
এভাবেই মানুষকে নিয়ে এগিয়ে গিয়ে এদের এই নির্যাতন, এদের এই নিপীড়ন, এদের এই নীলনকশা-চক্রান্তকে বানচাল করে দিয়ে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ভোট বিপ্লব ঘটিয়ে আমরা জয়লাভ করব। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, ‘যত ষড়যন্ত্রই হোক আমরা ভোটে আছি এবং শেষদিন পর্যন্ত থাকব। আমার ভোট আমি দেব, লড়াই করে ভোট দেব।’ ঐক্যফ্রন্টের শরিক দলও বিএনপির কাছে আসন চাচ্ছে এবং ড. কামালও নতুন করে সুশীল ব্যক্তিদের জন্য আসন চাচ্ছেন এ ক্ষেত্রে দুদিক থেকে আসন পাওয়ার দাবিটা বিএনপি কতদূর পূরণ করতে পারবে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এ প্রশ্নের উত্তর আমাদেরও জানা নেই, এ প্রশ্নটা বিএনপি মহাসচিবকে করেন, তিনিই একমাত্র এর উত্তর জানেন।’
এই বিভাগের আরও সংবাদ