বিশেষ প্রতিবেদন :
বিগত দশ বছর ক্ষমতায় থেকে যারা রাষ্ট্রিয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন, এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন। তারা মনোনয়ন না পেয়ে যদি বিদ্রোহী প্রার্থী হন, তাহলে আওয়ামীলীগের ত্যাগী নেতা-কর্মীরা তাদের পাশে থাকবে কোন স্বার্থে? বরং দল যাকে মনোনয়ন দিবে, নেত্রীর সিদ্ধান্ত মেনে তার পক্ষেই কাজ করা উচিৎ। পাশাপাশি ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিনের দুই বছরসহ বিগত বার বছর যারা আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে ছিলেন না, তারাও দলের মনোনয়ন না পেলে বিএনপির নেতা-কর্মীরা এসব নেতার পাশে থাকা উচিৎ হবেনা। মূল বিষয় হচ্ছে, ব্যক্তির চেয়ে দল বড়।
অন্যদিকে, কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠির কাছে দল রাজতান্ত্রিকভাবে জিম্মী থাকতে পারেনা। ২০-৩০ বছর পর্যন্ত আওয়ামীলীগ বা বিএনপির জেলা-উপজেলার রাজনীতি যারা নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের কাছে দল অনেকটা যেন রাজতন্ত্রের মত। এসব পরিবারতন্ত্র থেকে দলকে মুক্ত করতে হবে। না হলে ভবিষ্যতে উভয় দলে নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি হবেনা। পরিবারতান্ত্রিক এসব নেতারা মনে করেন, তাদেরকে ছাড়া দল চলবেনা। এতে একদিকে একটি ব্যক্তি বা গোষ্ঠির কাছে দল জিম্মী হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে নতুন নতুন নেতৃত্ব প্রত্যাশীরা দলের নেতৃত্ব থেকে বঞ্ছিত হচ্ছেন আবার নির্বাচনে তারা মনোনয়ন বঞ্ছিতও হচ্ছেন।
তৃণমূলের রাজনীতিকে চাঙ্গা করতে হলে এবং দলে গণতন্ত্র চর্চা করতে হলে নতুনদের জায়গা করে দিতে হবে পুরনোরা। বিগত দুইযুগ ধরে দেখে আসছি, বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রত্যেকটি জেলা-উপজেলায় আওয়ামীলীগ ও বিএনপিতে ব্যক্তি কেন্দ্রীক রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ বা পরিবার কেন্দ্রীক রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ হয়ে আসছে। এই শ্রেণির নেতারা একেকজন এখন শত শত কোটি টাকার মালিক। অথচ, তৃণমূলের হাজারো নেতা-কর্মী আছেন, যাদের নুন আনতে পান্তা পুরাই অবস্থা। এই শ্রেণির দলীয় নেতা-কর্মীদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
বিগত ইউপি নির্বাচনেও স্থানীয় আওয়ামীলীগ প্রার্থীদের থেকে বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে জেলা পর্যায়ের নেতারা। এসব ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা উন্নয়ন কাজের টাকা নয় ছয় করলে তাদের দোষ আছে বলেও মনে করিনা। কারণ, মনোনয়ন নিতে বিশাল অংকের টাকা দিতে না হলে তাদের উপর চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ থাকতো। যার ফলে ইউপি চেয়ারম্যানদের থেকেও দলীয় সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত হচ্ছেন কর্মীরা।
রাজনীতি এখন অনেকটা ব্যবসায় পরিনত হয়েছে। ইউপি বা উপজেলার চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র, এমপি-মন্ত্রী হতে পারলে কাউকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়না। ক্ষমতার জৌলসে তারা অল্প কয়েক বছরে বনে যান কোটি কোটি টাকার মালিক। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের বেচারা আমজনতা বা কর্মীরা আমের আঁটিরও ভাগ পায়না। অপরদিকে জেলা, উপজেলা বা থানা পর্যায়ের দলীয় কমিটি আনতে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক হতে ইচ্ছুক প্রার্থীরা উর্ধ্বতন নেতাদের দিতে হয় লক্ষ লক্ষ টাকা। তৃণমূলের এসব নেতারা দলের দায়িত্ব পাওয়ার পর তাদেরকেও এই টাকা তুলতে বিভিন্ন ধরণের অপরাধসহ ধান্ধাবাজি করতে হয়। যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা। এসব কর্ম-কান্ডের দায় এসে পড়ে দলের উপর, যার প্রভাব পড়ে জাতীয় নির্বাচনে।
আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতায় কয়েকটি নির্বাচনে দেখেছি, ভোটের আগেরদিন কেন্দ্র খরচের টাকা নিয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়িসহ দাঙ্গা-হাঙ্গামার ঘটনা। অনেক কেন্দ্রে যার দায়িত্বে কর্মীদের জন্য খরচ দেওয়া হয়, সেই নেতাকে ভোটের দিন আর কেন্দ্রের আশেপাশেও দেখা যায় না। তিনি সেদিন ঘুম থেকেই ওঠেন দিনের বারটায়। ততক্ষণে প্রায় ভোটও শেষ, খেলাও শেষ। ফলশ্রুতিতে দেখা যায়, ওই কেন্দ্রে তার প্রার্থী বিপুল ভোটে পরাজিত হয়েছেন।
এমন বাস্তবতায় কর্মীদের পাশাপাশি সয়ং প্রার্থী নিজে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, নির্বাচনের বাজারে একদল আছে সুযোগ সন্ধানী। এরা মনে করেন, ভোটের আগেরদিন পর্যন্ত প্রার্থীর নির্বাচনী খরচের টাকা যা পকেটে পুরানো যায় তাই লাভ। ভোটের পরে আর এই সুযোগ পাওয়া যাবেনা।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন উৎসব মুখর এবং প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ হবে এমনটাই প্রত্যাশা দেশের মানুষের। তবে, আওয়ামীলীগ-বিএনপি বা তাদের জোট যাই বলুন তাদের প্রার্থীদের পা ফেলতে হবে অত্যন্ত কৌশলে। নিজ দলের কতিপয় নেতার আত্মঘাতি কর্মকান্ডের কারণে যে কোনো প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করতে পারেন। অতএব, সাধু সাবধান।
মো. আলী হোসেন- সাংবাদিক ও লেখক
ahossain640@gmail.com