আকাশবার্তা ডেস্ক :
*তেলে-জলে চরিত্রে কাদের সিদ্দিকী! প্রশংসায় বঙ্গবন্ধু সমালোচনায় বিএনপি *সুলতান মনসুরের দুই অস্ত্র হাতে ধানের শীষ, গায়ে মুজিব কোর্ট! *নিষ্ফল ঐক্যর মাঠে এখনো নিস্তেজ তেজ ছড়াচ্ছে আ স ম রব *নির্বাচনের পর থেকে মুখ ঢাকলেন মাহমুদুর রহমান মান্না *বিএনপি চুপ থাকলেও পুরনো স্টাইলে আন্দোলনের কথা বলছেন মন্টু *শেষ বেলায় লাভের পাল্লায় ড. কামালের ঐক্যফ্রন্ট, বুঝে নিলেন দুই আসন
রাজনীতিতে ডিগবাজি চরিত্রে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অনন্য! তিনি বিকালে যে ভাষণ দেন সন্ধ্যায় তা ভুলে যান। এবার রাজনীতির মাঠে নবরূপে আবির্ভাব হয়েছে ড. কামাল হোসেনের। বিকালে যেটা বলেন সকালে সেটার সংশোধন দেন! গণফোরামের দুই নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যকে একাদশ সংসদে পাঠানোর বিষয়ে ইতিবাচক চিন্তাভাবনা রয়েছে।
গত শনিবার এমন জানিয়ে ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, ‘আমরা নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছি, কিন্তু এমন নির্বাচনের মধ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আমাদের দুই প্রার্থী যেভাবে সফল হয়েছেন তা তাদের বিরাট অর্জন। তাই তাদের সংসদে পাঠানোর বিষয়ে আমরা ইতিবাচকভাবে চিন্তাভাবনা করছি।’ ইলেকট্রিক, প্রিন্ট ও নিউজপোর্টালে।
এমন সংবাদ প্রচারের পরদিন গতকাল সকালে গণফোরাম থেকে সংশোধন পাঠিয়ে মোস্তফা মহসিন মন্টু দাবি করেছেন, ড. কামালের বক্তব্যটি গণমাধ্যমে ভুলভাবে উপস্থাপন হয়েছে। ড. কামাল হোসেন কোনোভাবেই বলেননি গণফোরাম থেকে নির্বাচিতরা শপথ নিতে পারেন। একাদশ সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠের দাবিতে ঐক্যফ্রন্ট গঠন হলেও বেলাশেষে ঐক্যর ফলাফল জিরো বলে বিএনপির তৃণমূল থেকে দাবি উঠেছে। দ্বিমুখী আচরণে ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের রাজনৈতিক চরিত্র নিয়েও জোরালো প্রশ্ন উঠেছে।
ঐক্য নিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের যা বলেছিলেন সেটার দৃশ্যত রূপ দেখা মেলেনি। এখন আবার আসম রব ও মন্টু যা বলছে বিএনপি তার ছন্দ খুঁজে পাচ্ছে না। ঐক্য নিয়ে হতাশ বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতারা। গত ৬ নভেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের জনসভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘রাজপথে যদি শয়তানও থাকে, তার সঙ্গে ঐক্য হবে।’ তখন কাকে শয়তান বলেছিলেন সেই জবাব জনসম্মুখে তিনি স্পষ্ট করেননি।
তবে তখন থেকেই বিএনপির সংসারে ড. কামালের ঐক্য সুদৃঢ় রয়েছে। নির্বাচনের আগে নিস্তেজ বাণী ছড়িয়ে নির্বাচনের শেষ পর্যন্ত বিএনপিকে ভোটের মাঠে টিকিয়ে রেখেছিলেন। অবশেষে ফাঁকা বুলিতে বিএনপিকে খালি হাতেই ফিরতে হয়েছে। রাজনৈতিক মাঠ থেকে প্রশ্ন উঠে, আন্দোলনে না গিয়ে, ভোট বর্জন না করে ড. কামালের ঐক্যতে থাকার ফলে বিএনপির ভয়াল ভোট বিপর্যয় ঘটেছে। এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বিএনপি। ভোটের রাতে ধর্ষিত নারীকে দেখতে রাজধানী থেকে নোয়াখালী যান বিএনপির প্রতিনিধিদল।
কিন্তু পথে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী এবং সড়কে গুরুত্বপূর্ণ কোনো পয়েন্টে নেতাকর্মীকে শুভেচ্ছা জানাতে দেখা যায়নি। এত বড় একটা সফরে কেন দলের নেতাকর্মীরা নেই, এর আগে এমন সব সফরে হাজার হাজার নেতাকর্মীকে রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের অভিনন্দন জানাতে দেখা যেতো, এবার কেন নেই?
সাংবাদিকরা কুমিল্লায় উপস্থিত এক ভাইস চেয়ারম্যানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নেতাকর্মীরা এ নির্বাচনের পর হতাশ, অনেকেই আতঙ্কে আছেন, তাই এই সফরের কথা জেনে থাকলেও কেউ শুভেচ্ছা জানাতে দাঁড়ায়নি।’ এদিকে বিএনপির সংসারে এসে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর বক্তব্যে বিভ্রান্ত হচ্ছে বিএনপির নেতাকর্মীরা।
ঐক্যতে যোগ দিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রথম জনসভায় তিনি বলেছিলেন, ‘১৯৭১-এর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের আহ্বানে আমরা স্বাধীনতা এনেছিলাম। আমি বিএনপিতে যোগদান করি নাই, আমি ডকামাল হোসেনের ঐক্যফ্রন্টে যোগদান করেছি।’ নোয়াখালীতে একটি অনুষ্ঠানে বলেন, বিএনপি যদি বিশৃঙ্খল থাকেন তাহলে ১০০ বছরেও শেখ হাসিনার বংশ, তার বাড়ির লোকজন দেশ শাসন করবে সেখান থেকে সরাতে পারবেন না।
এছাড়াও ছাত্রদল-যুবদল ও বিএনপির যেসব নেতারা ফেসবুক চালায় তাদেরও সমালোচনা করেন কাদের সিদ্দিকী। বিএনপির অনুষ্ঠানে এসে আওয়ামী লীগের জয়গান এবং বিএনপির নেতৃত্ব নিয়ে সমালোচনায় সাধারণ নেতাকর্মীরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ আসছে। বিএনপির অনেক নেতাই বলছেন, গায়ে মুজিব কোর্ট পরে এসে বিএনপির সমালোচনা বন্ধে এখনই কাদের সিদ্দিকীকে নিয়ন্ত্রণের জন্য সিনিয়র নেতাদের ভূমিকা পালন করতে হবে।
আর তা হলে বিএনপির লাখ লাখ নেতা জিয়াউর রহমানের আদর্শের পথ হারিয়ে ফেলবে।নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকে আন্দোলন নিয়ে বিএনপি চুপ থাকলেও পুরনো স্টাইলে আন্দোলনের কথা বলছেন মোস্তফা মহসিন মন্টু। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে শিগগিরই কর্মসূচি আসছে গতকাল এ তথ্য জানান তিনি। মন্টু বলেন, আমরা বসেছিলাম। গত নির্বাচনে যে বিপর্যয় হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
আগামী ৮ জানুয়ারি আবার আমরা বসবো, বসে নতুন কর্মসূচির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কী ধরনের কর্মসূচি দেয়া হতে পারে জানতে চাইলে সাংবাদিকদের বলেন, কর্মসূচি এখনো তৈরি হয়নি। খুব শিগগিরই নতুন কর্মসূচি তৈরি করা হবে। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে প্রশ্ন, কখন তৈরি করবে আন্দোলনের ছক? আন্দোলনের সময় কখন ছিলো? নির্বাচনের আগ থেকে নাকি নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকে? এ বিষয়ে বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান আমার সংবাদকে বলেন, ঐক্যফ্রন্ট যদি আন্দোলনেই যেতো তাহলে নির্বাচনের আগ থেকেই করা উচিত ছিলো। কিংবা নির্বাচনের দিন থেকে।
যদি তখন থেকে আন্দোলন হতো তাহলে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন, মন্ত্রিপরিষদ গঠন করতে পারতো না। এখন বিরতি দিয়ে আওয়ামী লীগকে সকল সুখের আনুষ্ঠানিকতার সুযোগ দিয়ে আন্দোলনের কথা বলে দলের সঙ্গে হাস্যরস তামাশা ছাড়া আর কিছুই করছে না। এদিকে সুলতান মনসুরের কাছে দুই অস্ত্র! এক হাতে ধানের শীষ আর গায়ে মুজিব কোর্ট। তার এমন ভূমিকাকে সন্দেহের চোখে দেখছে বিএনপি। ঐক্যফ্রন্ট গঠনের আগ থেকেই সব কর্মসূচিতে সরব থাকলেও ধানের শীষের মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকে সুলতান মনসুর উধাও! ঐক্যফ্রন্টের কোনো কর্মসূচিতে তিনি আর সরব নয়! নীরবেই থাকলেন এবং জয়ীও হলেন। কিন্তু নির্বাচনের পরও ঐক্যফ্রন্টের কোনো বৈঠকে তিনি আর আসেননি।সরকারবিরোধী ভূমিকায় তার অবদান কী এটাও এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে যে মাহমুদুর রহমান মান্না ঐক্যফ্রন্টে এসে গরম বার্তা ছড়িয়েছেন তিনি এখন খুবই শীতল হয়ে গেছেন। গণমাধ্যমেও তেমন মুখ দেখান না। ঐক্যফ্রন্টের বৈঠকে নীরবে এসে নীরবে চলে যান। তবে ভিন্ন চরিত্রে আছেন আসম আবদুর রব! এখনো তার গলার জোর বেশ শক্তই আছে। তবে ফলাফল কতটুকু তার কোনো গতিপথ জানেন না সাধারণ মানুষ? গত শনিবার নোয়াখালীতে তিনি বলেন, আপনারা (উপস্থিত স্থানীয় নেতাকর্মীরা) ঐক্য রাখতে চান না ভাঙতে চান? ঐক্য রাখতে হবে। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনতে হবে, ঐক্য রাখতে হবে। না রাখলে অস্তিত্ব থাকবে না। জনগণকে বাদ দিয়ে আন্দোলন হয় না। জনগনের সাথে থাকতে হবে।
আমরা এখনো ঐক্যফ্রন্টের বৈঠক করতে পারি নাই। আমরা ঐক্যফ্রন্ট করেছিলাম তিনটি কারণে। আন্দোলন করবো, নির্বাচন করবো, জনগণকে গণতন্ত্র উপহার দেয়ার জন্য সরকার গঠন করবো। নির্বাচনে ভোট ডাকাতি হয়েছে, নেত্রী খালেদা জিয়া মুক্তি পায় নাই। হাজার হাজার কর্মী কারাগারে। ঐক্য থাকলে আউটপুট কী? এর কোনো স্পষ্ট বার্তা শোনা যায়নি আসম রবের মুখ থেকে।
এদিকে গতকাল একাদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী গণফোরামের দুই নেতা শপথ নিতে পারেন বলে সভাপতি ড. কামাল হোসেনের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু। গতকাল ফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, শপথ নেয়ার কোনো কথা কখনো হয় নাই। কালকে (শনিবার) কিছু মিডিয়া অত্যন্ত ভুলভাবে এটার ব্যাখ্যা করেছে। ড. কামাল হোসেন সাহেব কখনো ঘূর্ণাক্ষরেও বলেননি এই ধরনের কোনো কথা। আমাদের শপথ এখন নেয়া হচ্ছে না।
আমি স্পষ্ট করে বলছি গণফোরামের কোনো সদস্য শপথ নিচ্ছেন না। ঐক্যফ্রন্টের শরিক জেএসডির নেতা আসম আব্দুর রবও বলেন, ভোটে জয়ী তাদের জোটের নেতারা কেউই শপথ নিচ্ছেন না। গণফোরামের অবস্থান স্পষ্ট করার বিষয়ে জানতে চাইলে এ সময় জেএসডির সভাপতি আসম আবদুর রব বলেন, গণফোরামের কেউ শপথ নিচ্ছেন না। আর কিভাবে বললে পরিষ্কার হবে? আমি আবারো বলছি, ঐক্যফ্রন্টের কেউই শপথ নিচ্ছেন না।
এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্ট ছিল, আছে এবং থাকবে। ঐক্যফ্রন্ট জনগণের দাবি আদায়ে যে আন্দোলন করেছিল, সেই আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। আগামী পরশুদিন মিটিং আছে সেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।’