আকাশবার্তা ডেস্ক :
রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে ঢাকা সিটি করপোরেশন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও ফায়ার সার্ভিসের সমন্বয়ে গঠিত ১১ সদস্যের একটি টিম। পরিদর্শন শেষে আবারও কেমিক্যালের উপস্থিতির কথা জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
শুক্রবার (২২ফেব্রুয়ারি) সকাল সোয়া ৯টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান ১১ সদস্য টিমটি। পরিদর্শন শেষে কমিটির সদস্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক লে. কর্নেল এস এম জুলফিকার রহমান সাংবাদিকদের সঙ্গে এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ভবনের ভেতরে গ্যাস লাইটার রিফিলের পদার্থ ছিল। এটা নিজেই একটা দাহ্য পদার্থ। এছাড়া আরও অন্যান্য কেমিক্যাল ছিল। প্রত্যেকটা জিনিসই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করেছে। পারফিউমের বোতলে রিফিল করা হতো এখানে। সেই বোতলগুলো ব্লাস্ট হয়ে বোমের মতো কাজ করেছে।
বৃহস্পতিবার (২১ফেব্রুয়ারি) ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে শিল্পমন্ত্রী বলেন, গতরাতে সেখানে যা ঘটেছে তার সঙ্গে রাসায়নিক পদার্থের কোনো সম্পর্ক নেই। সেখানে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটেছিল।
ভয়াবহ এই আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে ধারণা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, আমি নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। এই এলাকায় গ্যাসের স্বল্পতা থাকায় সিলিন্ডারে করে এলপি গ্যাস দিয়ে রেস্টুরেন্ট ও বাসা বাড়িতে রান্নার চালানো হয়। ঘটনার সময় সেখানে গ্যাসের সিলিন্ডার নেওয়া হচ্ছিল।
ওই সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে দুর্ভাগ্যবশত একটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারে আগুন লাগে। এতে ট্রান্সফরমারটিও বিস্ফোরিত হয়ে পুরো এলাকা অন্ধাকার হয়ে যায়।
আগুনে পুড়ে যাওয়া ভবন সম্পর্কে শিল্পমন্ত্রী বলেন, সেখানে কেমিক্যালের কোনো গোডাউন নেই, পারফিউম ও কসমেটিক সামগ্রীর গোডাউন আছে। আমি নিজে এটা দেখলাম। কেমিক্যালের সঙ্গে এই ঘটনার সম্পর্ক নেই।
তবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক লে. কর্নেল এস এম জুলফিকার রহমান বলছেন, আমরা দেখেছি, এখানে যে জিনিসগুলো আছে, এগুলো অবশ্যই কেমিক্যাল। যিনি বলেছেন এখানে কোনো কেমিক্যাল ছিল না, সে কথাটি সত্য নয়। আসলে উনি (শিল্পমন্ত্রী) কথাটা কোন আঙ্গিকে বলেছেন, এটা আমার জানা নেই।
তিনি আরও বলেন, এগুলো অবশ্যই কেমিক্যাল ছিল। এগুলো আগুনকে ট্রিগার করেছে। প্রতিটি কেমিক্যালই আগুনকে ট্রিগার করেছে। সে কারণে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। এগুলো কেমিক্যালের কারণেই হয়েছে। নইলে কখনোই আগুনের এভাবে টিকে থাকার সুযোগ নেই। কেমিক্যাল বা গ্যাসগুলো আগুনকে বার্স্ট করেছে। তখন ওই আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, ভবনের ভেতরে গ্যাস লাইটার রিফিলের পদার্থ ছিল। এটা নিজেই একটা দাহ্য পদার্থ। এছাড়া আরো অন্যান্য কেমিক্যাল ছিল। প্রত্যেকটা জিনিসই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করেছে। পারফিউমের বোতলে রিফিল করা হতো এখানে। সেই বোতলগুলো ব্লাস্ট হয়ে বোমের মতো কাজ করেছে।
কমিটির আরেক সদস্য বাংলাদেশ বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, আমরা পরিদর্শনের সময় দেখেছি, মোট পাঁচটির মতো ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওয়াহিদ ম্যানসনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলার কলাম ও বিনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবনটি ব্যবহার করা যাবে কি না, তা আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আগামী সাত দিনের মধ্যে বিস্তারিত বলা যাবে। এছাড়া অন্যান্য ভবনগুলোকে টিকিয়ে রাখার জন্য যে শক্তি দরকার, তা আছে বলে আমরা মনে করি।
তিনি বলেন, আমরা ঘুরে দেখলাম, ওয়াহিদ ম্যানসন অনেক বড় একটি ভবন। কমপক্ষে ১০ কাঠা জমির ওপর ভবনটি নির্মিত। এত বড় একটি ভবনে সিঁড়ি মাত্র একটি, যা মোটেও পর্যাপ্ত নয়। বুয়েটের এই অধ্যাপক বলেন, ভবনের দ্বিতীয় তলার পুরোটাই গোডাউন। কিন্তু এতে আগুন নেভানোর যে পদ্ধতি, তা পর্যাপ্ত না। অগ্নিনির্বাপণের জন্য পর্যাপ্ত ইক্যুইপমেন্ট নেই। আমি ওপরে উঠে দেখলাম, দ্বিতীয় তলায় পুরোটাই পারফিউম কেমিক্যালে ভরা। ফলে এগুলো আগুনকে বাড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছে।
রাজউকের অথরাইজড অফিসার মো. নুরুজ্জামান জাহিদ বলেন, এই ভবনটি রাজউক অনুমোদিত কি না, আমরা ওভাবে এখনও তথ্য নিতে পারিনি। কথা বলে জানা যাবে আসলে তারা অনুমোদন নিয়ে ভবন নির্মাণ করেছেন কি না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, কয়েক দিন আগেও সিটি করপোরেশনের মেয়র এলাকাবাসীকে অনুরোধ করেছেন, তারা যেন এই কেমিক্যাল গোডাউন বা কারখানাগুলো সরিয়ে নেন। এখানে কিন্তু কোনো কেমিক্যাল গোডাউন বা কারখানার লাইসেন্স দেওয়া হয়নি এবং কোনো লাইসেন্স রিনিউ করা হয়নি। এগুলোর জন্য আলাদ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কেন আগুন লেগেছে এবং কারা কারা এ ঘটনার জন্য দায়ী, কমিটি সে বিষয়ে তদন্ত করবেন। অল্প সময়ের মধ্যেই এ তদন্তের প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। তবে এখানকার মানুষদের আরও সচেতন হতে হবে।
উল্লেখ্য, বুধবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ১০টার দিকে আগুন লাগে চুড়িহাট্টার হাজী ওয়াহেদ ম্যানসনে। প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকেই বলছেন, ওয়াহেদ ম্যানসনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি পিকআপের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত। কেউ বলছেন, আগুনের সূত্রপাত হোটেল আমানিয়া থেকে। কেউ মনে করছেন, ওই ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার কেমিক্যালের গোডাউন থেকেই শুরু আগুনের। তবে কেমিক্যালের গোডাউনে আগুন লাগার পর তা মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের কয়েকটি ভবনে। ভয়াবহ এ আগুনে পুড়ে এখন পর্যন্ত ৭০ জনের মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।