আকাশবার্তা ডেস্ক :
‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে না, শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন করবেন না, খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে নির্বাচনে যাবেন না,’ একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে এমন রাজনৈতিক কথা বললেও দিন শেষে ড. কামালের নেতৃত্বে আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিএনপি নির্বাচনে গেলো! আটটি আসনও পেলো! তখন ঘোষণা ছিল- ঐক্যফ্রন্টের আটজন কেউ শপথ নেবেন না। নিষেধাজ্ঞা ভেঙে ড. কামালের ঘনিষ্ঠজন সুলতান মনসুর ও মোকাব্বির খান শপথ নেয়ার পর বিএনপির পক্ষ থেকে তাদের বেঈমান ঘোষণা দেয়া হয়।
এরপর থেকে বিএনপির শক্ত অবস্থান থেকে বলা হয়, অন্তত বিএনপির কেউ শপথ নেবেন না। কিন্তু নির্বাচিত পাঁচজন সমপ্রতি দলের হাইকমান্ডকে নানাভাবে চাপ দিচ্ছেন তাদের শপথের জন্য অনুমতি দিতে। এরই মধ্যে সমপ্রতি দলের স্থায়ী কমিটিতে লন্ডন নেতা তারেক রহমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্পৃক্ত হয়ে ঘোষণা দেন, যাতে দলের কেউ শপথ না নেন। কিন্তু দলের নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া দলের নির্বাচিত পাঁচ সংসদ সদস্য আগামী ৩০ এপ্রিলের আগে যে কোনো দিন শপথ নেবেন।
দলের হাইকমান্ডের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও নির্বাচিত এমপিদের দাবি- তারা তারেক রহমান ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গ্রিন সিগন্যালেই সংসদে যাবেন। তবে এ পাঁচজন যদি স্থায়ী কমিটির সিনিয়রদের পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত তোয়াক্কা না করে গোপন সিদ্ধান্তে সংসদে যান, তাহলে বড় ধরনের দল ত্যাগের সম্ভাবনাও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, শপথ নিয়ে নির্বাচিতদের সঙ্গে ফখরুলের নেতৃত্বে তারেক রহমানের দীর্ঘ সময় আলাদা কথা হয়েছে। নির্বাচিতদের কথা তারেক জিয়া শুনেছেন, আর তারেক জিয়াও তাদের নানা পরামর্শ দিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, যাদের ভোটে বিএনপি আসনগুলো পেয়েছে, সেই ভোটারদের শ্রদ্ধা জানিয়ে সংসদে গিয়ে প্রতিবাদ করা উচিত। আর তাদের ওপরও চাপ রয়েছে নিজ নিজ আসনের মানুষের।
এলাকাবাসী চাইছেন, তারা সংসদে গিয়ে তুলে ধরুক এলাকার সমস্যা-সঙ্কটের চিত্র। দলের কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতেও সংসদে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানাতেন চান বিএনপির নির্বাচিতরা। যদিও নির্বাচনের আগের রাতে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরে রাখার অভিযোগ এনে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।
এখন ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে শপথ না নিলে তাদের সদস্যপদ খারিজ হয়ে যাবে সাংবিধানিকভাবে; সে নিয়মও তাদের ভাবতে হচ্ছে। সে ডেটলাইন আগামী ৩০ এপ্রিল। তাই এরই মধ্যে বিএনপির নির্বাচিতরা মির্জা ফখরুল ব্যতীত অন্যরা শপথের ইঙ্গিত পেয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এখন তারা যে কোনো দিন শপথ নিতে পারেন। এ পাঁচজন শপথ নিলে আগামী আড়াই মাসের মধ্যে খালেদা জিয়াকে জামিনেরও একটা ইঙ্গিত থাকবে বলে মনে করছেন বিএনপির বড় একটি অংশ।
জানা যায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়ে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিত এমপিরা শপথ না নেয়ার কথা জানান। পরবর্তীতে ড. কামালের অনুসারী গণফোরামের দুজন শপথ নেন।
এরপরই বিএনপি থেকে নির্বাচিত দলীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (বগুড়া-১), মো. জাহিদুর রহমান (ঠাকুরগাঁও-৫), মোশাররফ হোসেন (বগুড়া-৪), উকিল আবদুস সাত্তার (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২), হারুনুর রশিদ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২) এবং মো. আমিনুল ইসলাম (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩) শপথ নিতে পারেন বলে দলীয় ফোরাম থেকেই গুঞ্জন শুরু হয়। দলের শীর্ষ নেতারাও এ নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেন। শপথের বিষয়ে বিএনপির মহাসচিবসহ ছয়জনের ওপর আস্থাহীনতার ইঙ্গিত দেন।
এ নিয়ে জরুরি স্থায়ী কমিটির মিটিংও হয়। যদিও সেই বৈঠকে কৌশলগত কারণে বলা হয়, কেউ শপথ নেবে না। তবে অন্য একটি সূত্রের মত, এ নিয়ে আগেই তারেক জিয়া ও মির্জা ফখরুল আলাদা আলাপ করেছেন। শপথ নিতে অনুমতি প্রদানে মহাসচিব তারেক জিয়াকে উৎসাহ দিয়েছেন বলেও অনেকে ধারণা করছেন।
এর আগেও নির্বাচনে অংশ গ্রহণের জন্য বারবার খালেদা জিয়াকে বুঝিয়ে রাজি করিয়ে ছিলেন ফখরুল। এদিকে বিএনপির নির্বাচিত এমপিরা গণমাধ্যমকে জানান, দলের পক্ষ থেকে তাদের সাফ জানিয়ে দেয়া হয়েছে; শপথ নিলে বহিষ্কার করা হবে। তবে এখন ফখরুল ছাড়া বাকি সবাই শপথ নিতেও নানা ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসন থেকে নির্বাচিত মো. হারুনুর রশীদ সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, তিনি সংসদে গিয়ে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কথা তুলে ধরতে চান।
সাংবাদিকদের প্রশ্নে জবাবে হারুনুর রশিদ বলেন, জনগণ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর আসন থেকে ভোট দিয়ে তাকে নির্বাচিত করেছে। সংসদ হিসেবে শপথ নেয়ার জন্য জনগণের চাপ রয়েছে। সারা দেশে কী হচ্ছে সেটা আপনার দেখার বিষয় নয়, আপনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন সংসদে গিয়ে জনগণের কথা বলবেন। এভাবেই জনগণ তার ওপর চাপ করছে বলে দাবি বিএনপি সাংসদের। হারুনুর রশিদ বলেন, শপথ নিয়ে সংসদে গিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরতে চাই।
এর আগে চাঁপাইনবাবঞ্জ-২ (নাচোল-ভোলারহাট-গোমস্তাপুর) আসন থেকে বিজয়ী বিএনপি নেতা আমিনুল হককে উদ্ধৃত করে জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে জানায়, শপথ না নিলে তিনি এলাকায় যেতে পারবেন না এবং তাকে এলাকার লোকজন মারবে। এ ছাড়া ঠাকুরগাঁও-৫ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচিত মো. জাহিদুর রহমান বলেন, সংসদে যেতে এলাকার জনগণের চাপ রয়েছে। আমরা মহাসচিবের সঙ্গে এ বিষয়ে বসেছিলাম। মহাসচিবকে বলেছি, আমরা সংসদে গেলে যদি খালেদা জিয়ার মুক্তি হয়, তাহলে শপথ নিতে পারি। তিনি আরো বলেন, আমরা পাঁচজন আলাদাভাবে বসে শপথ নেয়া না নেয়ার লাভ-ক্ষতি নিয়ে আলাপ করেছি। তবে এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি।
তিনি বলেন, দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা প্রেস ক্লাবে সভা-সমাবেশে যেসব কর্মসূচি দেন; তাতে দলের অগ্রগতি কিংবা ম্যাডামের মুক্তি হবে না। এর চেয়ে সংসদের দাঁড়িয়ে নিজেদের দাবির বিষয়ে আওয়াজ তুললে সেটা বেশি কার্যকর হবে বলেই মনে হয়।
বগুড়া-৪ আসন থেকে নির্বাচিত মোশাররফ হোসেন বলেন, ম্যাডামকে মুক্তি দিলে শপথের ব্যাপারে বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখব। জামিন দিয়েও সরকার মামলা চালাতে পারে। এটা করলে আমরা ভেবে দেখব। আমরা এখনো দলীয় সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে আছি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ থেকে নির্বাচিত এমপি উকিল আব্দুল সাত্তার বলেন, সংসদে যাওয়ার ইচ্ছা আছে।
তবে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নয়। বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়নি। খালেদা জিয়ার আদর্শের কর্মী যারা জয়লাভ করেছেন, আমি বিশ্বাস করি, তারা সংসদে যাওয়া তো দূরের কথা, সংসদের আশপাশেও কেউ হাঁটবে না। কারণ, সংসদের আশপাশ দিয়ে হাঁটলে বাংলাদেশের মানুষ তাদের ক্ষমা করবে না, দলীয় নেতাকর্মীর কথা বাদই দিলাম।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে কেউ জয়লাভ করেনি। সুতরাং কেউ পরাজিতও হয়নি। নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে জনগণ। কিন্তু জনগণ ভোট দিতে পারেনি। সুতরাং আমরা পরাজিতও হইনি। সংসদে যারা গেছে, তারা নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের মাধ্যমে ভোট চুরি করে গেছে। এই চুরি করা ভোটের ফলাফল জনগণ মানতে পারে না।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায় আরও বলেন, সে কারণেই বলছি, নেত্রী জেলে থাকবে আর আমরা সংসদে গিয়ে মজা নেবো, শেখ হাসিনা সন্তুষ্ট করব এমন ব্যক্তি বিএনপিতে আছে বলে আমি বিশ্বাস করি না। যদি থাকে, যথাসময়ে যথাযথ উত্তর তাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
এ ছাড়া কয়েকদিন আগে ২০ দলীয় জোটের প্রধান সমন্বয়ক ও এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম বলেছেন, দেশের ১৬ কোটি মানুষকে অসম্মান করে বিএনপির এমপিরা জাতীয় সংসদে শপথ নিলে জাতীয় বেঈমান হিসেবে চিহ্নিত হবেন। লোভে পড়ে জাতির সঙ্গে বেঈমানি করার কোনো কাজে এলডিপি সমর্থন করবে না।
স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, একাদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত ছয় সংসদ সদস্যের শপথ নেয়ার প্রশ্নই আসে না। খালেদা জিয়ার মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত সংসদে যাওয়া নিয়ে কোনো আলোচনা নয়।
তবে এ বিষয়ে ভিন্ন সূর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমানের। তিনি বলেন, সংসদ অনেক বড় একটি বিষয়। সেখানে দলের পক্ষ থেকে কথা বলার লোক থাকা দরকার। বিগত সংসদ নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচনে নানা অনিয়ম হয়েছে, তবে সেখানে গিয়েই কথা বলতে হবে। তিনি বলেন, দল যদি কোনো দিকে যেতে চায় তাহলে এর মধ্যেই যেতে হবে। তবে সবারই নীতির মধ্যে থাকা উচিত। সব কিছু মিলিয়ে খালেদা জিয়াকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ