আকাশবার্তা ডেস্ক :
আগামী অক্টোবরে হতে পারে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন। এই সম্মেলনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলকে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নতুন করে ঢেলে সাজানোর ঘোষণা দিয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু অনেকটা গতিহীন হয়ে পড়েছে আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতীম ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। দুজনের নেতৃত্বে দীর্ঘ ১ বছর ধরে চলছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। যা নিয়ে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজমান।
অন্যদিকে, একই অবস্থা ছাত্রলীগের তৃণমূলে। দীর্ঘদিন জেলা-উপজেলায় সম্মেলন না হওয়ার কারণে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে সাংগঠনিক তৎপরতা। অনেক জেলায় বয়স ৪০ পেরিয়ে গেলেও বহাল তবিয়তে ছাত্রলীগ নেতা হয়ে আছেন অনেকে। আর এ কারণে যোগ্য ও মেধাবী নেতৃত্ব সংকটে পড়েছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যবাহী ছাত্রসংগঠনটি।
গত বছরের ১১-১২ মে ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনের আড়াই মাস পর ৩১ জুলাই সভাপতির পদে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক পদে গোলাম রাব্বানীর নাম ঘোষণা করা হয়। এরপর গত ১৫ এপ্রিল ছাত্রলীগের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।
সে সময় তিনি বলেন, দ্রুত পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে ব্যর্থ হলে প্রয়োজনে ছাত্রলীগের বর্তমান দুই সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে নতুন সম্মেলন করার হুমকি দেন। নেত্রীর বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারেনি তারা। শুধু তাই নয়, বর্তমান কমিটির দুই নেতা একটি সম্মেলনও করতে পারেনি।
কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদকের বয়স চল্লিশের কোঠায়। তারা দুজন ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দীর্য ৫ বছর। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি হলেও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের দাপটে সংগঠনটির কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তারা। তবে এই দুই নেতার কারণে ছাত্রলীগ থেকে ঝরে পড়ছে তরুণ নেতৃত্ব। একই অবস্থা সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগ কমিটির। বর্তমান কমিটির বয়স প্রায় ৬ বছর।
যদিও নিয়ম অনুযায়ী মাত্র দু-বছর থাকার কথা ছিলো। শুধু কিশোরগঞ্জ জেলা ও তাড়াশ উপজেলা নয়, দেশের প্রায় ৩০টি জেলা ও শতাধিক উপজেলাতে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতি চলছে। যা নিয়ে ওই সব জেলা-উপজেলায় ছাত্রলীগের রাজনীতির বেহাল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন নেতৃত্ব শূন্য দেখা দেবে বলে মনে করছেন স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
জামালপুর জেলা ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করা হয় ২০১৫ সালের ১ মার্চ। ওই কমিটিতে নিহাদুল আলম নিহাদকে সভাপতি ও মাকসুদ বিন জালাল প্লাবনকে সাধারণ সম্পাদক করে জেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। একই অবস্থা গাজীপুর জেলা ছাত্রলীগের কমিটির। জেলাটিতে ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয় ২০১৬ সালে। নিয়ম অনুযায়ী ওই জেলা বর্তমান কমিটি মোয়াদোত্তীর্ণ। তবে এসবের তোয়াক্কা করছে না সংগঠনের শীর্ষনেতারা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০১৬ সালের ৫ নভেম্বর মুন্সিগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়। ওই কমিটি প্রকাশ হওয়ার পর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে আলাদা উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিলো।
দীর্ঘ ১২ বছর পর জাহিদ হোসেন অনিককে সভাপতি ও তানভীর মাহমুদকে সাধারণ সম্পাদক করে মাদারীপুর জেলা ছাত্রলীগের দুই সদস্যবিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম। এরপর ছাত্রলীগের সোহাগ-জাকির কমিটির মেয়াদ শেষ হলে, বর্তমান শোভন-রাব্বানী নেতৃত্ব এলেও জেলাটির সম্মেলন হয়নি। উল্লেখ্য, সাবেক সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ এবং বর্তমান সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী দুজনের বাড়িই মাদারীপুরে। নিজ জেলাতে শক্তিশালী কমিটি দিতে পারেনি তারা।
২০১৬ সালের অক্টোবর রাজবাড়ী জেলার নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। কমিটিতে সভাপতি পদে মো. জাকারিয়া মাসুদ রাজিবকে সভাপতি ও মো. সাইফুল ইসলাম সুমনকে (এরশাদ) সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ফেনী জেলা ছাত্রলীগের কমিটি গঠন করা হয় ২০১৫ সালের ১৪ মে। জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলনের ২য় অধিবেশনে এ কমিটি ঘোষণা করেন তৎকালীন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি-সম্পাদক। কমিটিতে সালাহ উদ্দিন ফিরোজকে সভাপতি ও জাবেদ হায়দার জর্জকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়।
সেই কমিটির কর্যক্রম এখনো চলছে। ২০১৫ সালের ২১ জুলাই গঠন করা হয় কুমিল্লা (দক্ষিণ) জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগ কমিটি। কুমিল্লা (দক্ষিণ) জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি গঠন করা হয়। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ এবং সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম অনুমোদন দেন। আবু তৈয়ব অপিকে সভাপতি, মিজানুর রহমান রাতুল ও শাহাদৎ হোসেনকে সহ-সভাপতি, লোকমান হোসেন রোবেলকে সাধারণ সম্পাদক এবং ওমর ফারুক মির্জা ও হোসেন মো. মনিরকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে ছয় সদস্যের কুমিল্লা (দক্ষিণ) জেলা ছাত্রলীগের কমিটি গঠন করা হয়। শুধু এই জেলা ছাত্রলীগ নয়, প্রায় ৩০টির মতো জেলা ও শতাধিক উপজেলাতে ছাত্রলীগের কমিটিগুলোতে একই অবস্থা বিরাজ করছে।
ছাত্রলীগের সূত্রে মতে, ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ’৬৯-র গণঅভ্যুত্থান, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এমনকি ৯০-এ এরশাদ পতন আন্দোলনে অসামান্য অবদান রেখেছিলো ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। দেশ স্বাধীনের সময়ে ছাত্রসমাজ বিশেষ করে ছাত্রলীগের যে গৌরবোজ্বল ভূমিকা ছিলো তা আজ ইতিহাস। সে সময় শুধু অধিকার আদায়ের আন্দোলন নয়, বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন তারা। জাতীয় সংসদ সদস্যের পাশাপাশি স্থান পেয়েছেন মন্ত্রিসভায়।
এ নেতাদের অধিকাংশেরই রাজনীতির গোড়াপত্তন ঘটে ছাত্রলীগের মাধ্যমে। অথচ সেই ছাত্রলীগের রাজনীতির এখন অনেকটাই বেহাল অবস্থা। বিশেষ করে অধিকাংশ জেলা-উপজেলায় নতুন করে কমিটি গঠন না হওয়ার কারণে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। শুধু ছাত্রলীগের ওই সব নেতার একক নেতৃত্ব নয়, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা-উপজেলার আওয়ামী লীগের সভাপতি-সম্পাদকসহ প্রভাবশালী নেতারা নিজেদের বলায় ভারী করার জন্য ছাত্রলীগ কর্মীদের ব্যবহার করছে। ওই সব জেলা-উপজেলার নেতাকর্মীদের দিবস ভিত্তিক অনুষ্ঠান ছাড়া সাংগঠনিক কাজ নেই বললেই চলে।
ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ২ বছর পর পর ছাত্রলীগের সম্মেলন হবে। কেন্দ্রীয় কমিটিতে এই ধারাবাহিকতা মানা হলেও অধিকাংশ জেলা-উপজেলায় অনেকটাই অকার্যকর। দুই বছরের কমিটি কোথাও কোথাও চার বছর, কোথাও ৬ বছর থেকে এক যুগ পর্যন্ত হয়ে থাকে। ওই সব জেলা-উপজেলায় সম্মেলনের জন্য কোনো ধরনের তাগিদ নেই। কেন্দ্র থেকে শুধু মৌখিকভাবে বলা হলেও কার্যত বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এদিকে জেলা ছাত্রলীগের পদ ছাড়তে নারাজ বর্তমান ছাত্রলীগের কমিটির সভাপতি-সম্পাদকসহ বিভিন্ন নেতাদের। একই অবস্থা উপজেলা, ইউনিয়ন, পৌরসভাসহ বিভিন্ন ইউনিটের নেতৃত্বে। মূলত ওই ইউনিটগুলোতে যুবলীগের সম্মেলন না হওয়ার কারণেই মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি নিয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতি করছেন তারা। তাদের নেতৃত্বের কারণে তরুণ ছাত্রনেতারা সুযোগ পাচ্ছেন না নেতৃত্ব দেয়ার। তাই ছাত্রলীগের রাজনীতি ছেড়ে বিভিন্ন রাজনীতিতে চলে যাচ্ছেন অনেকেই।
শুধু তাই নয়, এ নিয়ে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে ওই সব পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মীদের মাঝে। যা নিয়ে অনেক স্থানে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বিরাজ করছে। স্থানীয় নেতাদের সাথে বলয় তৈরি করছেন তারা। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ছাত্রলীগের কমিটি না হওয়ায় মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে পক্ষপাতিত্ব শুরু করেছেন অনেকেই। শুধু জেলা-উপজেলা নয়, একই সমস্যায় ভুগছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। এমন অবস্থার জন্য ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকেই দায়ী করছেন সংগঠনের তৃণমূলের নেতারা। তারা বলছেন, এসব সমস্যা দূর করতে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের উপ-ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক ইয়াসির আরাফাত শুভ আমার সংবাদকে বলেন, ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন, ’৬৯-র গণঅভ্যুত্থান, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এমনকী ৯০-এ এরশাদ পতন আন্দোলনে অসামান্য অবদান রেখেছিলো ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। একইভাবে এখনো ছাত্রলীগের কর্মীরা রাজনীতির মাঠে আছে। তিনি বলেন, অথচ দিনের পর দিন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অবহেলিত রয়ে গেছে। একটি কমিটি দিয়ে বছরের পর বছর পার হচ্ছে। দেখার কেউ নাই।
কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের পাঠাগাড়-বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম স্বপ্ন বলেন, দীর্ঘদিন একটি কমিটি থাকার কারণে তরুণ ও মেধাবী ছাত্রনেতাদের বয়স শেষ হয়ে যাচ্ছে। আবার বয়ষ শেষ হওয়ার কারণে অনেকেই ছাত্রলীগ ছেড়ে চলে গেছেন। আমরা চাই বর্তমান কমিটির নেতারা তরুণদের রাজনীতি করার সুযোগ তৈরি করে দেবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা ছাত্রলীগের একজন সভাপতি প্রার্থী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রলীগের রাজনীতি করি। অথচ আমার বয়স শেষের দিকে এখন নতুন করে কমিটি না করলে আর কোনো দিন ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিতে পারবো না। তিনি বলেন, শুধু আমি নই, আমার মতো আরও অনেক নেতা আছেন। তাদেরও বয়স শেষ হয়ে যাচ্ছে। তবে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদকের ফোনে একাধিকবার ফোন করলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ