আকাশবার্তা ডেস্ক :
জিয়া পরিবারের আস্থাভাজনদের একজন ড. কর্নেল অলি আহমদ। খালেদা জিয়াকে বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত করার প্রধান উদ্যোক্তাও তিনি। জিয়াউর রহমানের দীর্ঘদিনের সহযোগী এবং বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে বঙ্গভবনে থাকা অবস্থায় পর্দার আড়ালে থেকে ড. অলি আহমদ নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করার ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। যা পরবর্তীতে বিএনপি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। সারা দেশে বিএনপিকে সুসংগঠিত করার জন্য কঠোর পরিশ্রমও করেন এই অলি।
যাকে বিএনপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। সেই বিএনপির প্রধান নেত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘ দেড় বছরেও মুক্ত না হওয়ায় জিয়া পরিবারের অনেকের মাঝে ক্ষোভ রয়েছে, তেমনি এই রাজনীতিবিদেরও। বিএনপির রাজনীতিতে খালেদাকে মাইনাস করে অন্য কিছু ঘটছে বলেও এর আগে ইঙ্গিত দিয়েছেন কর্নেল অলি।
এটি লন্ডন নেতার ইশারায় হচ্ছে বলে দলের ভেতরে-বাইরে দীর্ঘদিন থেকে আলোচনা হচ্ছে। এখন খালেদার মুক্তিতে রাজপথে একটা অবস্থান করে ফের বিএনপিতে ফেরা এবং নতুন করে এই দলকে সাজাতে চেষ্টা করছেন জিয়াউর রহমানের এই আস্থাভাজন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের দুর্নীতি, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, অস্ত্রবাজ, মন্ত্রী, এমপি এবং সিনিয়র দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন অলি বিএনপিকে দুর্নীতিবাজদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য অপরিসীম চেষ্টা করে একপর্যায়ে বিফল হন পরবর্তীতে ২৬ অক্টোবর ২০০৬ সালে দুর্নীতির প্রতিবাদ করে তিনি বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে নতুন পার্টি এলডিপি গঠন করেন এরপর থেকে তিনি বিএনপি ছাড়লেও খালেদার দলে জোটে রয়েছেন। আর বিএনপিতে না থাকলেও খালেদা জিয়ার আস্থাভাজন হিসেবে রয়েছেন।
কিন্তু দলের এবং জোটের প্রধান দীর্ঘ সময় ধরে আটক থাকায় একাধিকবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অলি আহমেদ। লন্ডন নেতা তারেকের ওপরও ক্ষুব্ধের ইঙ্গিত দিয়ে কিছুদিন আগে একটা অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘কেউ যদি মনে করে আমরা কারো দাস হিসেবে কাজ করব, তাহলে ভুল করবে।
২০০৫ সালে আমরা মনে করেছিলাম, রাজনীতিতে ভুল হচ্ছে। সে জন্য উপমহাদেশে একটা নজিরবিহীন ঘটনা হয়েছিল। তিনজন মন্ত্রীসহ ৩২ জন সংসদ সদস্য নিয়ে আমরা এলডিপি গঠন করি। এটা বিএনপির বিরুদ্ধে নয়, সে সময়ে সামগ্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আমাদের বিদ্রোহ ছিল।’
২০ দলীয় জোটে থেকেও হঠাৎ খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে কর্নেল অলির ‘মুক্তিমঞ্চ’ ঘটনার পর কথা হয় তারেকপন্থি হিসেবে পরিচিত এক নেতার সঙ্গে। তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগেও গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে আট দিনের ভারত সফর করে এসেছেন তিনি। গেল বছরের মার্চেও ১৫ দিনের সফর করেন। এ ছাড়াও শুনেছি, সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করেছেন। সব নিয়ে তার কাছে একটা আপডেট কিছু থাকতে পারে।
গোপনীয়তার শর্তে তিনি আরও বলেন, বর্তমানে তারেক জিয়ার নির্দেশনায় দল পরিচালনায় তিনি অনেক আগ থেকেই অসন্তুষ্ট। তারেক জিয়া যেভাবে দলকে ঢেলে সাজাচ্ছেন এতে করে খালেদা জিয়া রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।
খালেদা জিয়ার আস্থাভাজন হিসেবে তার একটা ক্ষোভ থাকতেও পারেন। এ ছাড়া বিএনপি সংসদে যাওয়ায় খালেদা জিয়ার মুক্তিতে একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তারেকপন্থিদের ধারণা, খালেদা জিয়া এখন যদি হঠাৎ করে মুক্তি পেয়ে যান তাহলে তার পুরো ভূমিকা নিতে চান রাজনৈতিক দূরদর্শী অলি আহমদ।
কেননা, খালেদা জিয়া জেল থেকে বের হলেই দলের বর্তমান সেটআপ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। অনেক রদবদলও আসবে। তখন ফের বিএনপিতে প্রবেশ করা অলি আহমদের জন্য সহজ হয়ে যাবে। যেহেতু রাজনীতিতে চলমান সব নেতার চেয়ে তিনি সিনিয়র তাই মহাসচিব কিংবা বড় পদটিও তার জন্য অপেক্ষা হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য— খালেদা জিয়া যদি এখন হঠাৎ মুক্তি পেয়ে যান, তাহলে বিএনপিতে বড় আকারে ভাঙন তৈরি হবে। আর সরকারও পুত্রফলনে খালেদা জিয়ার জামিন দিয়ে দিতে পারেন। খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে সরকার আগের চেয়ে কিছুটা নরম হয়েছে বলেও খালেদার আইনজীবীদের দাবি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, ‘আমি গত সপ্তাহে বলেছিলাম, এক সপ্তাহের মধ্যে খালেদা জিয়ার মুক্তি হবে, জামিন এক সপ্তাহের মধ্যে দুটি হয়েছে, এখন আর দুটির অপেক্ষায় আছি, আইনি মাধ্যমে আমরা তাকে বের করতে চেষ্টা করছি, ইনশাআল্লাহ আমি আশা করছি তিনি শিগগিরই জামিনের মাধ্যমে মুক্তি পেয়ে ফিরে আসবেন।’ খালেদা জিয়ার এই মুক্তির ইঙ্গিত যেমন সিনিয়র নেতারা কয়েকজন জানেন, তেমনি রাজনীতিতে জ্যেষ্ঠ অলি আহমদেরও না জানার কথা নয়।
বিএনপির একটি সূত্র বলেছেন, খালেদা জিয়া মুক্তির আগে জিয়াউর রহমানের আস্থাভাজন, এই দলের প্রতিষ্ঠাতা এবং খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে আনায় যে ব্যক্তিটির ভূমিকা তিনি যদি দৃশ্যত বড় ধরনের ভূমিকা দেখিয়ে ফেলেন এবং খালেদা জিয়ার চোখে পড়েন তাহলে বিএনপিতে নেতৃত্বে অনেক পরিবর্তন চলে আসবে।
এ জন্য এখন থেকেই অনেকে আতঙ্কে আছেন। কেননা, অলি শুধু একা নয়, খালেদা জিয়ার মুক্তিতে জোরালো ভূমিকা পালন করতে জামায়াতে ইসলামীকেও সাথে রেখেছেন।
ইতোমধ্যে তিনি জামায়াতের প্রশংসা করে বলেছেন, ‘১৯৭১ সালের জামায়াত আর ২০১৯ সালের জামায়াত এক নয়। দেশকে তারা অনেক ভালোবাসে, তাদের মধ্যে অনেক সংশোধনী এসেছে। জামায়াতের নেতাকর্মীরা দেশকে ভালোবাসে ও তারা দেশপ্রেমিক।’
খালেদার মুক্তিতে আন্দোলনে জনবল দিয়ে সাপোর্ট করতে ঝুঁকি নিয়ে তিনি এসব বলেছেন। তাছাড়া তিনি সমপ্রতি ভারতসহ অনেকগুলো দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে কি ম্যাসেজ নিয়ে এসেছেন এ নিয়েও বিএনপি চোখ রাখছে।
আরেকটি সূত্রের ভাষ্য, বাংলাদেশে যেহেতু ইসলামপন্থি দলগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়ছে তাই কৌশলে তাদের কাছে টানছেন সিনিয়র এই রাজনেতা। তা ছাড়া খালেদা জিয়ার মুক্তিতে রাজপথের আন্দোলনে অর্থ ও লোকবল সাপোর্টে থাকবে জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামপন্থি দলগুলোও, এমনি জানায় সূত্রটি।
লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে কর্নেল অলি বিভাগীয় সফরের উদ্যোগ নিয়েছেন। যার একমাত্র উদ্দেশ্যই খালেদা জিয়ার মুক্তি। আগামী ১ জুলাই সোমবার চট্টগ্রামে জাতীয় মুক্তিমঞ্চের ব্যানারে সংবাদ সম্মেলন করবেন এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল অলি আহমদ। সেখানে তিনি খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে কথা বলতে পারেন। এলডিপির যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন।
দলটির অন্য একটি সূত্রের দাবি, জাতীয় নির্বাচনের আগে পরে ঘোষণা ছাড়াই খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে ঢাকাতে অবস্থান কর্মসূচির কথা ভেবেছিল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। কিন্তু ড. কামাল ও মির্জা ফখরুলরা এ কর্মসূচি পালন করতে ব্যর্থ হয়। এখন খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য এ কর্মসূচি পালনে বিভাগীয় পর্যায়ে সফর করে বার্তা দিয়ে আসবেন তিনি।
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ