আকাশবার্তা ডেস্ক :
হঠাৎ বিএনপিতে গ্রেপ্তার-মামলা আতঙ্কেও চিন্তিত নয় বিএনপি। খালেদা জিয়ার পরবর্তী শুনানিকে কেন্দ্র করে আগামী ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিএনপিকে চাপে রাখতে ক্ষমতাসীন মহলের নির্দেশে প্রশাসন এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। সে জন্যই তাৎক্ষণিক দলের শীর্ষ নেতাকর্মীদের শান্ত থাকতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যাতে সাময়িক গ্রেপ্তার-মামলায়ও কোনো ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি না করা হয়।
বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি— একদিকে সরকার বিএনপিকে চাপে রাখলেও অন্যদিকে কৌশলে ছাড় দেয়ার মানসিকতা দেখাচ্ছে। সমপ্রতি হাইকোর্টের সামনে সড়ক অবরোধ-যান চলাচল বন্ধ, পুলিশের সঙ্গে মারামারিতে জড়ানোর অভিযোগে বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় সংসদের (ডাকসু) সাবেক জিএস খায়রুল কবির খোকন, জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নেতা মোস্তাফিজুর রহমান, কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পিয়নের দায়িত্ব পালনকারী ফারুক হোসেন ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের কার্যালয়ের পিয়নের দায়িত্ব পালনকারী মঞ্জুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
অন্যদিকে একই ঘটনায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল আদালতে উপস্থিত হয়ে আগাম জামিন চাইলে আদালত তাদের ৮ সপ্তাহের জন্য আগাম জামিন মঞ্জুর করেন। এতে করে দলটি সাময়িক ঘটনাকে চাপ হিসেবে মনে করলেও অন্যদিকে ইতিবাচকও মনে করছেন।
কেননা বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ, যুগ্ম-মহাসচিব খায়রুল কবির খোকনসহ ৩ জনকে গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জামিন দিয়ে দেয় আদালত।
জানা গেছে, তিনজনকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের রমনা জোনাল টিমের পরিদর্শক দেলোয়ার হোসেন। অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করেন। পরে আদালত তাদের জামিনের আবেদন মঞ্জুর করেন।
দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়কে আগামী ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। খালেদা জিয়ার জামিনের বিষয়টি খারিজ না করে শুনানি মুলতবি করায় এখনো আশার আলো দেখছেন বিএনপি। তাই আগামী ৫ তারিখ পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে চাচ্ছে না দলটি। শেষ সময় পর্যন্ত তারা আদালতের ওপর আস্থা রাখতে চাচ্ছেন। তবে দলের ভেতরে খালেদাপন্থিদের বড় একটি অংশ চূড়ান্ত শুনানির আগেই আন্দোলনের মাধ্যমে বিশেষ মহলকে বার্তা দিতে চাচ্ছেন।
বিএনপির একটি সূত্রের দাবি, গতকাল খালেদা জিয়ার জামিনের আপিল খারিজ হয়ে গেলে তাৎক্ষণিক তার বড় প্রতিক্রিয়া দেখানোর প্রস্তুতি ছিলো। শুনানি মুলতবি হওয়ায় তারা আর প্রতিক্রিয়ার দিকে যায়নি।তবে খালেদাপন্থিদের ওই অংশটি এখনো তৎপর রয়েছে। আগামী ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজপথে থেকে বিএনপির ক্ষমতা ও অস্তিত্ব প্রমাণ দিতে। স্বল্প এই সময়ে বিএনপির রাজপথমুখী অবস্থানের ওপরই খালেদা জিয়ার ভাগ্য নির্ভর করবে বলে মনে করছেন।
তাই দলটির অন্য একটি সূত্রের দাবি— যারা খালেদা জিয়ার মুক্তির ইস্যুতে আন্দোলনের জন্য তৎপর তাদেরই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। অন্যদিকে যারা শান্ত থাকার পক্ষে তারা সবুজ সংকেতে মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে। ৫০১ নেতার বিরুদ্ধে মামলা হলেও শুধু চার নেতার জামিন নিয়েও ইতোমধ্যে দলের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। কর্মীদের রেখে শুধু নেতারা কেনো আদালতে গেলো এ নিয়েও দলের ভেতরে ভেতরে রাগ ক্ষোভ চলছে।
মামলায় উল্লেখ থাকা এক ছাত্রদলের নেতার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের শীর্ষ নেতারা এখনো আদালতে আগাম জামিন চাইতে নির্দেশনা দেননি। শুনেছি আমাদের অভিভাকদের চারজন জামিন নিয়েছেন। নির্দেশনা পেলে তারাও জামিন নিতে আগ্রহী বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, শাহবাগ থানায় বেশ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন পুলিশ। আরও ৫০০ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, কায়সার কামাল ছাড়াও ভাইস-চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, শওকত মাহমুদ, হাবিব উন নবী খান সোহেল, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, শফিউল বারী বাবু, সাইফুল আলম নীরব, সরফত আলী সপু, হাবিবুর রশীদ হাবিব, শাহ মো. আবু জাফর, ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, সাদেক খান, সৈয়দ এহসানুল হুদা, ফজলুর রহমান খোকন, ইকবাল হোসেন শ্যামল, মোস্তাফিজুর রহমান, মেহেদী হাসান তালুকদার, কেএম রকিবুল ইসলাম রিপন, শাহ নেওয়াজ, সাঈফ মাহমুদ জুয়েল, রওনুকুল ইসলাম শ্রাবণ, আশরাফুল ইসলাম রবিন, মো. আল আমিন, মো. রফিকের নাম রয়েছে।
গতকাল এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শুধু মহাসচিবসহ চারজনই আদালতে জামিন চাইতে গিয়েছেন। বাকি আসামিদের কিউ আদালতে যাননি।
অভিযুক্ত অন্য আসামিরা মহসচিবদের ন্যায় জামিনের জন্য আদালতে যাবেন কি না— জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আমার সংবাদকে গতকাল মুঠোফোনে বলেন, মহাসচিব জামিনের জন্য গিয়েছেন কি না আমি এখনো জানি না। আমি মাত্র বিদেশ থেকে আসলাম। অন্য যারা অভিযুক্ত তারাও আদালতে জামিনের জন্য যাবে কি না দল থেকে কি সিদ্ধান্ত হয়েছে আমি এখনো বিষয়টা জানি না।
তবে তিনি সরকারের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার এভাবে করে বেশিদিন দেশ চালাতে পারবে না। সবকিছুরই একটা শেষ আছে, এই সরকারেরও তাই হবে। সরকার আর বেশিদিন দেশ চালাতে পারবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী দুপুরে নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ক্ষমতার মোহে অন্ধ, উন্মত্তের মতো সরকার ও সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তিতে বারবার বাধা দিচ্ছে। আওয়ামী সরকার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকে উপেক্ষা করে চক্রান্তের বদ্ধ চোরাগলিতে হাঁটছে। সরকার ও সরকারপ্রধানের কারণেই বিএনপি চেয়ারপারসন মুক্তি পাচ্ছেন না। তারা বারবার বেগম জিয়ার মুক্তিতে বাধা প্রদান করছে।
তিনি বলেন, জুলুমবাজ সরকার হিংস্র আঁচড়ে এদেশের বিরোধী শক্তিকে জর্জরিত করার জন্য সকল শক্তি নিয়োগ করেছে। সরকারের দুর্বিনীত হিংস্রতা এখন চরম আকার ধারণ করেছে। তারই বহিঃপ্রকাশ গত পরশু মঙ্গলবার (২৪ নভেম্বর) রাতে বিএনপির ৫ শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে পুলিশের মিথ্যা মামলা দায়ের। আমরা এই বানোয়াট মামলায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। একইসঙ্গে গ্রেপ্তারকৃতদের অবিলম্বে মুক্তি দাবি করছি।