আকাশবার্তা ডেস্ক :
আজ পহেলা বৈশাখ শুভ বাংলা নববর্ষ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ। ১৪২৩ কে পেছনে ফেলে ১৪২৪ কে বরণ করে নিতে বাঙালির প্রাণের মেলা বর্ষবরণের সুর বয়ে যাচ্ছে সারাদেশে। পয়লা বৈশাখ, আসলেই যেন বাঙালির আবহমান ঐতিহ্যের এক অন্তহীন সমুদ্র-তরঙ্গের একটি বিশাল ঢেউয়ের নাম। আমাদের বিশ্বাস বছরের প্রথম দিন যদি আনন্দে কাটে, তবে বছরের বাকি দিনগুলোও তেমনিভাবেই কাটবে। আমরা আজও সেটাই বিশ্বাস করি। তাই যে করেই হোক আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠে ভাবতে থাকি বছরের বাকি দিনগুলোও কাটুক এমনিভাবে। রবিঠাকুরও বন্দনা করেছেন বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক, যাক যাক, এসো এসো, এসো হে বৈশাখ ।’ আর নজরুল বলেছেন, ঐ নূতনের কেতন উড়ে কালবৈশাখীর ঝড়, তোরা সব জয়ধ্বনি কর।
উৎসবের শুরু এ শতক থেকে নয়। হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য নিয়েই বাঙালি। বাংলা নববর্ষের সঙ্গে মিশে আছে সেই প্রাচীনকালের নানা পুরোনো উৎসব, পুরোনো ঐতিহ্য, পুরোনো শিল্প-সঙ্গীত, খেলাধুলা, নৃত্য। এগুলোর মধ্যে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান হলো পুণ্যাহ। পুণ্যাহ পালন হতো পয়লা বৈশাখে। প্রজারা জমিদার বাড়িতে হাজির হতো খাজনা দিতে।
জমিদার তাদের পান সুপারি কিংবা মিষ্টি খাওয়াতেন। বাঙালির আরেকটি উৎসব হালখাতা। নতুন বাংলা বছরের হিসাব পাকাপাকি টুকে রাখার জন্য ব্যবসায়ীদের নতুন খাতা খোলার এক আনুষ্ঠানিক উৎসব হলো হালখাতা। তাতে অবশ্য আনন্দ উৎসবের চেয়ে ব্যবসায়ীক লাভের চিন্তাটাই বেশি। যারা অর্থ পরিশোধ করার জন্য আসত, তাদের সাধ্যমতো জলযোগে আপ্যায়ন করা হতো। বৈশাখ উপলক্ষে গ্রামের সবাই চাঁদা তুলে কোনো যাত্রাদলকে তিন-চার দিনের জন্য ভাড়া করতো। বারোয়ারি গানের মেলার রীতি যেমন সেকালেও ছিল, তেমনি একালেও দেখা যায়।
ব্যবসায়ীক হালখাতার ঐতিহ্য ধরে রাখতে এবার রাজস্ব আদায়ে হালখাতার আয়োজন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। পুরনো ট্যাক্স পরিশোধে এনবিআর এর এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে সবাই। বৃহস্পতিবার ট্যাক্স পরিশোধ করতে গেলে এনবিআর কর্মকর্তারা ব্যবসায়ীদেরকে মিষ্টি মুখ করান।
আমাদের দেশে গ্রামবালায় নববর্ষকে ঘিরে খেলাধুলার রীতিও কম দেখা যায়না। অনেকটা হকি খেলার মতো খেলা হয়ে ‘ঢোপবাড়ি খেলা’। চট্টগ্রামে খেলা হয় বলি খেলা। স্থানীয় বা দূর থেকে কুস্তি গিররা এসে কুস্তি লড়ে শারীরিক শক্তির পরিচয় দেন। বেশ কয়েকশ দশক আগে খুব চল ছিল গরুর দৌঁড়ের। এলাকার অবস্থা সম্পন্ন গৃহস্থরা তাদের হালের হরুর গায়ের রঙের, ছোট দিয়ে, গলায় কড়ির মালা পরিয়ে প্রতিযোগিতায় নামাতেন সেই গরুগুলোকে। যেসব জায়গায় এমন খেলা হতো তার চারপাশে বসে যেত ছোটখাটো মেলা। নববর্ষ উপলক্ষে বিভিন্ন স্থানে সঙ সাজার রীতিও বেশ পরিচিত। সঙ্গ সেজে হাসি-তামাশার সঙ্গে সঙ্গে অন্যের আচরণ অনুকরণ করে দেখানো, ঠাট্টা করা কিংবা সামাজিক বিভিন্ন সমস্যাকে তুলে ধরা হতো। উদ্দেশ্য একটাই আনন্দ উল্লাস করা।
চট্টগ্রামের পাহাড়ি উপজাতিদের বর্ণাঢ্য ‘বিজু মেলা’, ‘মণিপুরী মেলা’ বসে বৈশাখকে কেন্দ্র করে।
সোনারগাঁয়ে বসে বছরের আকর্ষণীয় লোকশিল্প মেলা। মেলা বসে ঢাকায়ও। আর দেশ জুড়ে গ্রামের বৈশাখী মেলা তো আছেই। যাত্রা, সার্কাস, পুতুল নাচ, বায়োস্কোপ, বাজি খেলা, ঘুড়ি প্রতিযোগিতা, সংগীতসহ নানা আমোদ-প্রমোদের আয়োজন অল্প সময়ের জন্য হলেও মাতিয়ে রাখে গ্রামের মানুষকে।
সে যা-ই হোক, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদল তো নিয়মের খেলা। ওটা থামানোর সামর্থ কারও নেই। আমরা শুধু পারি পরিবর্তনের হাওয়া আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে আরও সুদৃঢ় ও শক্তিশালী করতে। পরিবর্তন এনে দিক নতুন মাত্রা। বাঙালি সংস্কৃতিকে জীবিত রাখার জন্য আমাদের প্রতিটি শিশু-কিশোরদের বৈশাখী মেলার আমেজকে গায়ে মাখায় উদ্বুদ্ধ করা উচিত।