আকাশবার্তা ডেস্ক :
আগামীকাল শুক্র ও শনিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় কাউন্সিল। কাল শুক্রবার রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কাউন্সিলের উদ্বোধন করবেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সে জন্য সকল প্রস্তুতি শেষ করেছেন দায়িত্বশীল নেতারা।
এদিকে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে দলের শীর্ষ পদে আসতে শেষ মুহূর্তেও জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন পদপ্রত্যাশীরা। তবে তাদের নানা সমীকরণ ও বিশ্লেষণ পিছু ফেলে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন ওবায়দুল কাদের। দলটির শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক সূত্র আমার সংবাদকে এমনটাই নিশ্চিত করেছে।
আ.লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্র জানায়, সভাপতি পদটি আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলটির রাজনীতির হাল ধরার পর থেকে প্রায় চার দশকে এই পদে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। তার এই দীর্ঘ সময়ের নেতৃত্বের কারণে দেশ ও দেশের বাইরে প্রশংসা কুড়িয়েছে দলটি।
আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে শুধু দলেই শেখ হাসিনার বিকল্প নেই এমন নয়— রাষ্ট্র পরিচালনায়ও তার মতো দক্ষ, দূরদর্শী ও প্রাজ্ঞ নেতা দেশে নেই বলে মনে করেন নীতিনির্ধারকরা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগকে চান দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সমর্থকরা। কয়েকবার অবসরের ঘোষণা দিলেও নেতাকর্মীদের দাবির মুখে দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে দলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। যার ফলে এই পদে পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই।
সভাপতি পদ নিয়ে আলোচনা না থাকলেও সম্মেলন ঘিরে দলটির কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে সাধারণ সম্পাদক পদটি নিয়ে বেশ আলোচনা রয়েছে। বর্তমানে এই পদে দায়িত্ব পালন করছেন ওবায়দুল কাদের। পদটিতে দায়িত্বের পরিবর্তন আসবে কী না? সভানেত্রীর কাছ থেকে ইঙ্গিত পাননি সাধারণ সম্পাদক পদে আগ্রহী নেতারা। ফলে সব সমালোচনাকে পেছনে ফেলে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন ওবায়দুল কাদের। দলটির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তবে সব কিছু নির্ভর করছে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার ওপর। একক সিদ্ধান্ত হওয়ায় এ বিষয়ে কোনো কিছুই নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। ওবায়দুল কাদের ছাড়াও সাধারণ সম্পাদক পদে জোর আলোচনায় আছেন— প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আব্দুর রহমান। ওবায়দুল কাদের দ্বিতীয় মেয়েদে দায়িত্বে না পেলে এদের যেকোনো একজনকে সাধারণ সম্পাদক পদে দেখা যেতে পারে।
বর্তমান আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন চারজন। এর মধ্য একজন সরকারের মন্ত্রিপরিষদে রয়েছেন। বাকি তিনজনের একজন সংসদ সদস্য। বাকি দুজন সাংগঠনিক কাজ নিয়ে ব্যস্ত।
আসন্ন কাউন্সিলে এই চার নেতার দুইজনকে প্রেসিডিয়াম সভায় দেখা যেতে পারে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলকে সাংগঠনিকভাবে চাঙ্গা রাখেন দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকরা। সংগঠনের সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে আওয়ামী লীগের এই পদটিতে রয়েছেন মোট আটজন। এরই মধ্যে বিএম মোজাম্মেল হক ও আফম বাহাউদ্দিন নাছিম বিশেষ দায়িত্ব পালন করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
এবারো সম্মেলনে তাদের পদোন্নতি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া সংগঠনটির সম্পাদকের মধ্যে তিনজন রয়েছেন মন্ত্রিসভায়। এদের মধ্যে একজনকে ঘিরে পদোন্নতির আলোচনা চললেও শেষ মুহূর্তে তিনজন স্বীয় পদে বহাল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বাকিদের বাদ দিয়ে তরুণ ও সাবেক ছাত্রনেতাদের আশার সম্ভাবনা রয়েছে।
এছাড়াও আওয়ামী লীগের অর্থ, পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক, আইন, কৃষি ও সমবায়, তথ্য ও গভেষণা, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ, দপ্তর, ধর্ম, প্রচার ও প্রকাশনা, বন ও পরিবেশ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, মহিলা, মুক্তিযুদ্ধ, যুব ও ক্রিড়া, শিক্ষা ও মানব সম্পদ, শিল্প ও বাণিজ্য, শ্রম ও জনশক্তি, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক পদগুলোতে ব্যাপক পরিবর্তন হতে পারে।
মূলত ওই পদে থাকা অনেক নেতা মাঠের রাজনীতি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। সক্রিয় ওই সকল নেতাকে এবার আরও গুরুত্বপূর্ণ পদে দেখা যেতে পারে। তবে বাদের খাতায় রয়েছেন অনেকে।
দল ও সরকারকে আলাদার করতে আগেই ঘোষণা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দলের ২১তম জাতীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে সেই সিদ্ধান্ত তিনি বাস্তবায়ন করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আগামী বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে মন্ত্রিসভায় রদবদল আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
আসন্ন কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল পদপদবি পাওয়া নেতারা মন্ত্রিপরিষদ থেকে বাদ পড়তে পারেন। যদিও আওয়ামী লীগের একটি পক্ষ দলকে আলাদা করার পক্ষে, আরেক পক্ষ চাইছে দলের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য সরকারে থাকতে। আওয়ামী লীগের সম্মেলনের শেষ মুহূর্তে বিভিন্ন কৌশলে দুই পক্ষই মাঠে আছে। এতে নেতাকর্মীরা অনেকটা বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছেন। শেষ পর্যন্ত সম্মেলনে কী হবে তার সবকিছু নির্ভর করছে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর থেকে তরুণদের সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগাচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকার। সেই ধারাবাহিকতার আরও বৃদ্ধি করতে এবার দলেও তরুণ নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি করে দেবেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। শুধু তরুণদের সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী শক্তিই নয়, একই সাথে আরও বৃদ্ধি পাবে নারীনেতৃত্বে।
মূলত দলের গঠনতন্ত্র বাস্তবায়ন ও নারীদের কাজে লাগাতেই এমন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে চায় আওয়ামী লীগ। তাই এবার কেন্দ্রী কমিটিতে নারীনেতৃত্বে বড় একটি পরিবর্তন আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে গতবারের মতোই এবার কাউন্সিলের আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে একজন নারীনেতৃত্ব দেখা যেতে পারে।
আওয়ামী লীগের প্রতিটি সম্মেলন আসলেও দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে আলাদা কৌতূহল সৃষ্টি হয়, বঙ্গবন্ধু পরিবারের কেউ নতুন কমিটিতে স্থান পাচ্ছে কী। তাই দলটির কেন্দ্রীয় সম্মেলন সামনে রেখে নানা কিছু ছাপিয়ে এবারও বিশেষ আলোচনায় স্থান করে নিয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর পরিবার।
দলের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, বঙ্গবন্ধু পরিবারের অন্তত দুজন সদস্য এবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আসতে পারেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। তারা দুজন কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ পেতে যাচ্ছেন বলে আলোচনা চলছে দলের ভেতরে। অন্যান্যবার আলোচনায় থেকেও শেষ পর্যন্ত তারা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দায়িত্ব না নিলেও এবারের বিদ্যমান বাস্তবতা ভিন্ন বলে মনে করছেন দলের নীতিনির্ধারকরা।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কর্নেল (অব.) ফারুক খান বলেন, সম্মেলনে পরিবর্তন আসাটা স্বাভাবিত। তবে এবার বিষয়টা একটু ভিন্ন। নেত্রী কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন, বিতর্কিতরা কেউ দায়িত্বে আসবে না। স্বচ্ছ, সৎ, দক্ষ, দুর্নীতিমুক্ত নেতারাই দায়িত্বে আসবেন।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, বিজয়ের মাসে ২১তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এটি স্মরণকালের বড় সম্মেলন। তিনি আরও বলেন, সাধারণ সম্পাদকসহ যেকোনো পদ-পদবিতে থাকার ইচ্ছে সবারই থাকতে পারে। তবে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তই শেষ কথা।