খোকন নন্দী ওরফে খোকন চৌধুরীর দুই স্ত্রীর এমন দাবির বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আদালতে গড়িয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত আদালতও কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেননি। দুই স্ত্রীর এমন দাবির কারণে নিহতের লাশের ঠিকানা হয়েছে এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গের মরচ্যুয়ারিতে। নিহতের লাশ নিয়ে দুই পরিবারের টানাটানি এখনও চলছে। তবে এই টানাটানির পেছনে রয়েছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, হিন্দু না মুসলিম, তা নিয়ে দুই পরিবারের দাবি ও লাশ নিয়ে টানাহেঁচড়ার পেছনে নিহত খোকন চৌধুরীর ফার্মগেট এলাকায় শত কোটি টাকার তিনতলা বিশাল মার্কেটসহ সম্পত্তির লড়াই। কিসের হিন্দু কিসের মুসলমান! ধর্ম নিয়ে কোনো বিষয় নয়, খোকন নন্দী ওরফে খোকন চৌধুরীর রহস্যময়ী জীবনের অজানা সব তথ্য বেরিয়ে আসছে। তিনি জীবিত থাকা অবস্থায় হিন্দু-মুসলিম দুই পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতেন। দুই স্ত্রী তার রহস্যময়ী জীবন সম্পর্কে অবগত ছিলেন। রাজধানীর উত্তর শাহজাহানপুরে তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। তখন ওই এলাকার মসজিদে গিয়ে মাঝেমধ্যে নামাজও পড়তেন। আবার ঈদের সময় গরু কোরবানি দিয়ে এলাকায় মাংসও বিতরণ করতেন খোকন চৌধুরী।
অপরদিকে প্রথম স্ত্রী ও তার দুই সন্তানকে নিয়ে রায়েরবাজার এলাকায়ও বসবাস করতেন। তখন তিনি সনাতন ধর্মের সব আচার-অনুষ্ঠান পালন করতেন। নিয়মিত মন্দিরেও যেতেন বলে জানা গেছে। জানা গেছে, ২০১৪ সালের ১৪ জুন খোকন চৌধুরী তার দ্বিতীয় স্ত্রীর বাসায় থাকা অবস্থায় গুরুতর অসুস্থ হন। এরপর দ্বিতীয় স্ত্রী হাবিবা আক্তার খানম ওরফে বাবলি তাকে নিয়ে বারডেম হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার দুদিন পর ১৬ জুন সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে তিনি মারা যান।
পরে হাসপাতাল থেকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী বাবলি স্বামীর লাশ নিয়ে দাফনের উদ্যোগ নেন। আর তখনই খোকন নন্দী ওরফে খোকন চৌধুরীর প্রথম স্ত্রী মিরা নন্দী এবং তার দুসন্তান বাবলু নন্দী ও চন্দনা বাধা দেন। তারা দাবি করেন মৃত খোকন নন্দীর লাশ তারা নিয়ে হিন্দুধর্ম মতে সৎকার করবেন। দুপক্ষের এমন বিরোধের কারণে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি থানা পুলিশ থেকে আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এ বিষয়ে এখনও আদালতে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
গত বছর ১২ নভেম্বর জেলা জজকোর্টে সাক্ষী নেওয়ার দিন ছিল। কিন্তু সেদিনও তার সাক্ষী নেওয়া হয়নি। এরপর গত ১৫ নভেম্বর শুনানি হয়। মামলাটি এখন দ্বিতীয় জেলা জজ আদালতে পাঠনো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অপর সূত্র জানায়, খোকন নন্দী মুসলমান হয়ে খোকন চৌধুীর নাম রেখেছিলেন। আর মুসলমান হওয়ার পক্ষে দ্বিতীয় স্ত্রীর কাছে যথেষ্ট দালিলিক ও স্থানীয়ভাবেও প্রমাণ রয়েছে বলে জানা গেছে।
গত ১৯৮৪ সালের ২ জুলাই খোকনের সঙ্গে বাবলির বিয়ে হয়। এর আগে হাবিবুর রহমান নামে প্রথম শ্রেডুর একজন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে এফিডেভিট করে খোকন নন্দী ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। আর তার নাম রাখেন খোকন চৌধুরী। তাদের বিয়ের কাবিননামা ও এফিডেভিটও রয়েছে। খোকন জীবিত থাকা অবস্থায় তার চার ভাইয়ের মধ্যে দুভাই জহরলাল নন্দী ও সাগর নন্দী রাজধানীতেই থাকতেন। এর মধ্যে তাদের উত্তর শাহজাহানপুরের ৩৩১ নম্বর বাসায় প্রায়ই আসা-যাওয়া করতেন সাগর নন্দী। সাগর নন্দী দীর্ঘদিন তেজতুরি বাজার এলাকায় থাকতেন। আর রাজধানীর উত্তর শাহজাহানপুরে খোকন চৌধুরী তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করতেন। ওই এলাকার লোকজন খোকন চৌধুরীকে মুসলমান হিসেবেই জানতেন।
তাকে স্থানীয়রা খোকা ভাই বলে ডাকতেন। প্রতিদিন সকালে তিনি বাসা থেকে বের হতেন, আর রাতে বাসায় ফিরতেন। তবে মাঝে মাঝে শুক্রবার জুমার নামাজ পড়তে পাশের মসজিদে যেতেন বলেও স্থানীয়রা জানিয়েছেন। আবার ঈদ-উল আজহায় কোরবানি দিতেন খোকন চৌধুরী ও বাবলি দম্পতি। গরু কোরবানির পর মাংস বিতরণ করতেন খোকন নিজেই। এলাকার অনেককেই তিনি কোরবানির গরুর মাংস দিতেন। বাবলির বাবার বাড়িতেই কোরবানি দিতেন উত্তর শাহজাহানপুরে দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে ছিলেন এ দম্পতি।
অপর সূত্র জানায়, হাবিবা আক্তার খানম বাবলির জাতীয় পরিচয়পত্রে তার পিতার নাম মৃত হাবিবুর রহমান, মায়ের নাম মঞ্জুরা বেগম, জন্ম তারিখ ২ ডিসেম্বর ১৯৫৬ সাল ও বাসার ঠিকানা ১১/১ সিদ্ধেশ্বরী উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু স্বামীর নাম উল্লেখ নেই। আর এ বিষয়টি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন খোকন চৌধুরীর প্রথম স্ত্রীর ছেলে বাবলু ও খোকনের ভাইয়েরা। আবার এত বছর সংসার করার পরও তাদের ঘরে কোনো সন্তান না থাকার বিষয়টির প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। হাবিবা খানম বাবলি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকার সময় তার সঙ্গে খোকন নন্দীর পরিচয় হয় পুরানা পল্টনে একটি চটপটির দোকানে।
এর সূত্র ধরেই ১৯৮৪ সালের ২ জুলাই তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এরপর ১৯৮৬ সালে প্রথম স্ত্রী মীরাকে ডিভোর্স দেন খোকন। এ সংক্রান্ত কাগজপত্র বাবলির কাছে রয়েছে বলে আদালত সূত্র জানিয়েছে। আর খোকন চৌধুরী অসুস্থ হলেও ধর্মান্তির হওয়ার কারণে তার ছোট ভাই সাগর ছাড়া কেউ তাকে দেখতে বারডেম হাসপাতালে যেতেন না।
বারডেমে ভর্তির সময় বাবলি ফোন করে ডেকে এনেছিলেন খোকনের ম্যানেজার দুলাল চন্দ্রকে। হাসপাতালের যাবতীয় কাগজে খোকনের নাম খোকন নন্দী লেখান দুলাল। ধর্মান্তরিত হলেও ব্যবসার প্রয়োজনে খোকন তার আগের নামই ব্যবহার করতেন বলে তার ব্যবসায়প্রতিষ্ঠান ফার্মগেট ক্যাপিটাল সুপার মার্কেটের লোকজন জানিয়েছেন। সূত্র জানায়, দ্বিতীয় স্ত্রী বাবলি খানমকে নিয়ে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে তার মাঝে মধ্যে ঝগড়া লাগতো। তারা কেউ কাউকে দেখতে পারতেন না। দুজনই একে অপরের ডিভোর্সের জন্য খোকনকে চাপ দিতেন।
খোকন নন্দী ওরফে খোকন চৌধুরীর ছেলে বাবলু জানান, তার বাবার লাশের শেষকৃত্য না হওয়ায় তাদের পরিবারের মাঝে হতাশা বিরাজ করছে। লাশ নিয়ে মামলা চলছে। মামলা মামলার মতোই চলবে। সামাজিক ও পারিবারিকভাবে আমরা সমস্যায় পড়েছি। মামলার ব্যাপার জানতে চাইলে তিনি বলেন, মামলার বিষয়টি আমার চাচা দেখছেন। তাই আমি মামলাসংক্রান্ত কিছুই বলতে পারব না।
এর আগে নিহত খোকন নন্দীর ফার্মগেটের ক্যাপিটাল মার্কেটের সামনে শামছু মিয়া নামের এক ব্যক্তি জানান, এই মার্কেটের সবাই জানেন, খোকন নন্দী হিন্দু ধর্মেই ছিলেন। তবে একজন শিক্ষিকা তার স্ত্রী দাবি করেন। এ নিয়ে বেশকিছু দিন আগে মার্কেটে দেন দরবার হয়েছে। এ ব্যাপারে খোকন চৌধুরীর দ্বিতীয় স্ত্রী দাবিদার বাবলি খানমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে ২৫ ডিসেম্বর রাতে রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায় সন্ত্রাসীদের ছুরিকাঘাতে চন্দন কুমার চক্রবর্তী ওরফে সাজ্জাদ হোসেন নামে এক শিক্ষক খুন হন। এ ঘটনায় পুলিশ বাদি হয়ে মামলা করে। এরপর নিহতের লাশ পলি আক্তার নামে মুসলিম স্ত্রী পরিচয়ে লাশ দাফনের চেষ্টা করেন। ঠিক তখনই তিথি চক্রবর্তী নামে হিন্দু আরেকজন মহিলা তাকে প্রথম স্ত্রী দাবি করেন। এ ঘটনায় আদালতে মামলা হয়। শেষ পর্যন্ত নিহতের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগকে জনস্বার্থে দেওয়ার জন্য আদালত রায় দেন।
সূত্র : আমার সংবাদ/আকাশবার্তা।