আকাশবার্তা ডেস্ক :
ফ্লাইওভারকেন্দ্রিক সক্রিয় ছিনতাই ও কিলিং গ্রুপের দুই সদস্য পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। গত ৫ জানুয়ারি রাতে মগবাজার ফ্লাইওভারের উপর সোনারগাঁও প্রান্তে রেলক্রসিং থেকে বেসরকারি এশিয়ান ইউনিভার্সিটির ছাত্র মিজানুর রহমানের লাশ উদ্ধার এবং এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনের মধ্য দিয়েই কিলিং গ্রুপের বিরুদ্ধে সক্রিয় অবস্থান নেয় পুলিশ।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ এবং হাতিরঝিল থানা পুলিশ কিলিং গ্রুপের নুরুল ইসলামসহ তিনজনকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে জানতে পারে রাতের অন্ধকারে ফ্লাইওভারগুলোতে ঘটে যাওয়া লোমহর্ষক ঘটনার বৃত্তান্ত।
এতে এহেন অপরাধ দমনে পুলিশ আরও অধিক গতি পায়। তদন্ত এবং অভিযানের ধারাবাহিকতায় হাতিরঝিল থানা পুলিশ গাজীপুরের টঙ্গী থেকে জীবন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে জানতে পারে তাদের এই দুজন সহযোগী একটি সিএনজি নিয়ে ৩০০ ফিট এলাকায় ছিনতাই কাজে বেরিয়েছে।
এ তথ্যের ভিত্তিতে হাতিরঝিল থানা পুলিশের একটি টহল টিম গত বুধবার রাতে সেখানে চেকপোস্ট বসায়। চেকপোস্ট চলাকালে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে পিস্তল থেকে গুলি ছোড়ে। তখন পুলিশও গুলি ছোড়ে।
এতে ওই কিলিং গ্রুপের নাজমুল ও মোটা শাহীন নামে দুজন নিহত হয়। এর আগে ভয়ংকর কিলিং গ্রুপ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার দুদিনের ব্যবধানেই পুলিশের এ অভিযান এবং বন্দুকযুদ্ধের এ ঘটনা ঘটে।
জানা গেছে, রাজধানীর ফ্লাইওভারগুলোতে রাতের অন্ধকারে সক্রিয় হয়ে ওঠে ভয়ংকর ওই কিলিং গ্রুপের সদস্যরা। ফ্লাইওভারে ল্যাম্পপোস্ট থাকলেও তাতে আলো এবং সিসি ক্যামেরা না থাকায় রাতে হত্যাকাণ্ড, ছিনতাইসহ মাদকসেবন এবং অন্যান্য নানান অপরাধ সংগঠিত হয়।
রাতে ফ্লাইওভারের উপরে ভবঘুরে, টোকাই ও মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। এছাড়া বাইক, সিএনজি, গাড়িযোগে এসে এখানে ওঁৎপেতে থাকে ছিনতাইকারীরা। রাতে অন্ধকারে ভুতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করে ফ্লাইওভারগুলোতে। মাদকসেবন ছাড়াও অসামাজিক কার্যকলাপও চলে বলে অভিযোগ ফ্লাইওভার ব্যবহারকারীদেরও।
এ যখন অবস্থা এবং মিজানুর হত্যকাণ্ডের পর গ্রেপ্তার নুরুল ইসলামসহ তিনজনের স্বীকারোক্তি নিয়েই বুধবার অভিযানে নামে হাতিরঝিল থানা পুলিশসহ পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মর্কতারা। গ্রেপ্তারকৃত নুরুল ইসলাম মূলত সিএনজিচালক এবং সিএনজি চালানোর আড়ালে তার মূল পেশা ছিনতাই, এর ব্যতিক্রম হলেই হত্যা।
নুরুল ইসলামসহ আরও আটজন মিলেই গড়ে তুলেছিল সিএনজিকেন্দ্রিক ভয়ংকর ছিনতাই ও কিলিং গ্রুপ। রাত ৮টার পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত আশুলিয়া, আব্দুল্লাহপুর, উত্তরা, গুলশান, ভাটারা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, মহাখালী, তেজগাঁও, মগবাজার, রামপুরা, ৩০০ ফুট, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী ও সাইনবোর্ড এলাকায় চলতো তাদের অপকর্ম।
নুরুল ইসলাম পুলিশকে জানিয়েছে, সে পাঁচ-ছয় মাস ধরে একাই প্রায় ৬০০ ছিনতাই করেছে। তার সহযোগী পাঁচ-ছয়জন আছে, যারা প্রায় তিন-চার বছর ধরে ছিনতাই করছে। অনেকেই দুই থেকে আড়াই হাজার ছিনতাই করেছে।
জালাল ও আব্দুল্লাহ বাবু যে তথ্য দেয়, তা রীতিমতো লোমহর্ষক। গত ১০ ডিসেম্বর থেকে এ বছরের ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীর ভিন্ন ভিন্ন ফ্লাইওভারে পাওয়া গেছে চারটি মরদেহ। প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের ধরন একই রকম। সবার গলায় গামছা বা মাফলার পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
গত ১০ ডিসেম্বর আক্তার হোসেন নামে এক স্বর্ণকারকে হত্যার পর মরদেহ ফেলে রাখা হয় কুড়িল ফ্লাইওভারে। ৩১ ডিসেম্বর খিলক্ষেত ফ্লাইওভারে উঠার পথের ডানপাশে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ পাওয়া যায়।
৩ জানুয়ারি কুড়িল বিশ্বরোড সংলগ্ন ফ্লাইওভারে মনির হোসেন নামে এক ব্যক্তির মরদেহ পাওয়া যায় এবং সর্বশেষ ৬ জানুয়ারি মগবাজার ফ্লাইওভারের উপর সোনারগাঁও প্রান্তে রেলক্রসিং বরাবর মিজানুরের মরদেহ পাওয়া যায়।
এ সবকটি হত্যাকাণ্ডে জড়িত নুরুল ইসলাম ও তার সহযোগী দুই ছিনতাইকারী। গ্রেপ্তার নুরুল আদালতে এ বিষয়ে স্বীকারাক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে।
সে জবানবন্দিতে বলেছে, মূলত সিএনজিতে যাত্রী হিসেবে উঠিয়ে ছিনতাইয়ে বাধা দেয়ায় তাদের হত্যা করা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অধিক্ষেত্রের বাইরে দুটি এলাকায় গত দুই মাসে তারা আরও চারটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলেও স্বীকার করে নুরুল।
সে পুলিশ এবং আদালতকে জানায়, ছিনতাইয়ের পর অজ্ঞান বা অর্ধমৃত অবস্থায় ৩০-৪০ জন যাত্রীকে বিভিন্ন ফ্লাইওভার বা নির্জন অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থানে সিএনজি থেকে ফেলে দেয়। এদের মধ্যে ৮-১০ জন বাস-ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যান।
সব তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেই রাজধানীর খিলক্ষেত থানাধীন ডুমনি কালিমন্দির আহবপাড়ায় ৩০০ ফিট সড়কে কিলিং গ্রুপের সদস্যদের ধরতে চেকপোস্ট বসালে তা লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে নাজমুল ও মোটা শাহীন।
এসময় পুলিশের পাল্টা গুলিতে নিহত হয় তারা। পরে ঘটনাস্থল থেকে ছিনতাই কাজে ব্যবহূত সিএনজি ও একটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে এবং নিহতরা ছিনতাইকারী দলের সদস্য বলেই দাবি করে পুলিশ।
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের ডিসি মাসুদুর রহমান জানান, নিহত দুজনই ছিনতাইসহ চারটি খুনের ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলো। তাদের নামে একটি মামলা হাতিরঝিল থানায়, দুটি মামলা খিলক্ষেত থানায় এবং একটি মামলা ভাটারা থানায় তদন্তাধীন আছে। তিনি বলেন, তাদের ধরতে অভিযানে নামে হাতিরঝিল থানা পুলিশ।
খিলক্ষেত থানাধীন ৩০০ ফিট সড়ক এলাকায় যাওয়ার পর পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পুলিশের ওপর গুলি বর্ষণ করে তারা। পরে পুলিশও আত্মরক্ষার্থে গুলি ছুড়লে ওই দুজন গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাদের ঢামেক হাসপাতালে পাঠানো হলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। নিহতদের মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে।
তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) বিপ্লব বিজয় তালুকদার জানান, নিহত নাজমুল ও মোটা শাহীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা ছিনতাইয়ের পাশাপাশি ছিনতাই কাজ করতে গিয়ে মানুষ খুন করতো। তাদের বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগর পুলিশের পাঁচটি মামলা রয়েছে। তিনি বলেন, সমপ্রতি ফ্লাইওভারে ছিনতাই করতে গিয়ে তারা কয়েকটি খুনের ঘটনা ঘটায়।
সেই চক্রের কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে এবং তাদের বক্তব্যে উঠে আসে যে, তারা একটি সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের সদস্য। চক্রটি ‘গামছা পার্টি’ নামে পরিচিত। তাদের বক্তব্যে এই নাজমুল ও মোটা শাহীনের নাম উঠে আসে। আমাদের কাছে তথ্য ছিলো, তারা সিএনজি ব্যবহার করে ছিনতাই করতো।