আকাশবার্তা ডেস্ক :
বইমেলা বাঙালির প্রাণের মেলা হিসেবে সর্বমহলে খ্যাতি রয়েছে। ফেব্রুয়ারি এলেই বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দীতে জমে উঠে এই মেলা। প্রতি বছরের মতো এবারো বইমেলার উদ্বোধন করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
গত রোববার উদ্বোধনের পর বিকাল ৫টায় সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেয়া হয় মেলার গেট। মেলার শুরুর দিকে তেমন বেচা-বিক্রি হয় না। পাঠকরা ঘুরে ঘুরে স্টল দেখে। স্টল ঘুরে দেখার ফাঁকে চোখে পড়ে ইসকনের স্টল।
ইসকনের স্টল দেখার পরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠে। সময়ের ব্যবধানে সমালোচনা চলে যায় ইসলামি স্কলারদের কাছে। বিষয়টি জানার পর তারাও এ বিষয়ে আপত্তি পেশ করতে শুরু করে।
বইমেলা ঘুরে দেখা যায়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্টল বরাদ্দ পেয়েছে ইসকন। সংগঠনটির বিরুদ্ধে উগ্র সামপ্রদায়িক মতবাদ পরিচর্যার অভিযোগ থাকায় স্টলটির বরাদ্দ বাতিল চেয়েছে দেশের শীর্ষ স্থানীয় আলেমরা।
তারা অভিযোগ করে বলেন, বাংলা একাডেমি একুশের বইমেলায় ইসকনকে কোন আইনে স্টল বরাদ্দ দিলো? যে মেলায় ইসলামি ধারার বই প্রকাশনীকে স্টল বরাদ্দ দেয়ার আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।
আর সেখানে কেন ইসকনকে স্টল বরাদ্দ দেয়া হলো, এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন দেশের বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ তথা ‘ইসকন’কে স্টল বরাদ্দ দেয়ার ঘটনাকে বাংলা একাডেমির উস্কানিমূলক পদক্ষেপ উল্লেখ করে অবিলম্বে এই বরাদ্দ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব ও হাটহাজারী মাদ্রাসার সহযোগী পরিচালক আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী।
সংবাদমাধ্যমে প্রেরিত এক বিবৃতিতে আল্লামা বাবুনগরী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ইসকন উগ্র ও ফ্যাসিবাদী হিন্দুত্ববাদের মতাদর্শের প্রচার প্রসারে জড়িত একটি বিতর্কিত আন্তর্জাতিক সংগঠন।
তিনি আরও বলেন, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নয়ন এবং প্রসারের লক্ষ্যে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি এই বইমেলার আয়োজন করে। বাংলা একাডেমি হওয়ার কথা বাঙালি মুসলমানের মননের প্রতীক।
বাংলা একাডেমির মূল কাজ বাঙালি মুসলমানের সাহিত্য, জীবনবোধ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করা। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতো একজন বুজুর্গ এই প্রতিষ্ঠান গড়ায় মুখ্য ভূমিকা রেখেছেন। আজ সেখানে আমরা দেখছি উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের স্টল।এটা বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাতাদের চিন্তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
হেফাজত মহাসচিব বলেন, বাংলা একাডেমি গড়ে উঠেছে এবং পরিচালিত হচ্ছে দেশের জনগণের অর্থে। এরকম প্রতিষ্ঠানের কাজে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সংস্কৃতি, জীবনবোধ ও সাহিত্য-ঐতিহ্যের প্রতিফলন থাকার দায় রয়েছে।
এরকম একটি প্রতিষ্ঠান কোনোভাবেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম ও মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো সংস্থাকে তার দর্শন প্রচারের জন্য জায়গা করে দিতে পারে না। এটা জনগণের অর্থে জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি আক্রমণ বৈ কিছু নয়। বাংলা একাডেমির এই উস্কানিমূলক পদক্ষেপের জন্য জনগণের যেকোনো ক্ষোভের প্রকাশ ঘটলে তার দায়ভার বাংলা একাডেমির ওপরই বর্তাবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে অমর একুশে গ্রন্থমেলার সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদকে বারবার ফোন দেয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এদিকে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বইমেলা।
মেলার পঞ্চম দিন বাংলা একাডেমি এবং সোহরাওয়ার্দী ঘুরে দেখা যায়, এখনো তেমন বেচাকেনা শুরু হয়নি।
তবে মেলায় ক্রেতারা পছন্দের বই পেলে কিনছেন। প্রকাশকরাও স্টলে আনতে শুরু করেছেন নতুন নতুন বই। অধিকাংশ স্টলই সেজে গেছে নতুন বইয়ে, তবুও আরও নান্দনিক করে স্টল সাজাতেই আরও নতুন বইয়ের অপেক্ষায় পাঠকদের সঙ্গে প্রকাশকরাও।
এবারের মেলায় আগত অধিকাংশ নতুন বইয়ে উজ্জলতার ছাপ। প্রচ্ছদ শিল্পীদের কঠোর পরিশ্রমে বিভিন্ন গ্রন্থে পাঠকরা খুঁজে পাচ্ছেন নবতর পাঠের প্রেরণা। তারা প্রশংসা করছেন স্টল ও প্যাভিলিয়নের নান্দনিকতার।
বিকালে মেলা ঘুরে দেখা যায়, বইমেলার প্রায় প্রতিটি দোকানেই এখন নতুন বইয়ের সারি। সেখান থেকেই পছন্দের বই খোঁজার কাজটি করছেন পাঠকরা। বইয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকে নানা বয়সের বইপ্রেমীরা এসেছেন মেলায়। স্কুল শেষে মেলায় এসেছে শিক্ষার্থীরাও। কথা হয় আবুল কালাম আজাদ নামের এক বেসরকারি চাকরিজীবীর সাথে। বিকাল ৩টায় বইমেলায় প্রবেশ করেন তিনি।
তিনি আমার সংবাদকে বলেন, আজকে আসলে বই কিনতে আসিনি, দেখতে এসেছি কি কি বই আসছে। ১৪ তারিখ আবার আসবো বই কিনতে। তবে আজকে পরিবেশবিষয়ক একটি বই পছন্দ হয়েছে সেটা কিনেছি। ৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস নামের বইটি তিনি ১৭৫ টাকায় কিনেছেন বলে জানান।
ছোট্ট সন্তানসহ বিকালে মেলায় এসেছিলেন বইপ্রেমী দম্পতি সজিব আহমেদ এবং শিরীন আক্তার। তারা আমার সংবাদকে বলেন, এবারের মেলায় বাঁশ দিয়ে নান্দনিক কিছু ডিজাইন করা হয়েছে, যা আমার খুব ভালো লাগছে। বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরছি, খুব ভালো লাগছে।
বাচ্চাদের জন্য বই কিনেছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, টুনটুনি প্রকাশন থেকে চিরকালের ছড়া, কবিতা এবং মাশরাফি-সাকিবকে নিয়ে লেখা চমৎকার দুটি বই কিনেছি। আরও কিনব। ঘুরে ঘুরে দেখছি।
এ বিষয়ে কথা হয় শরৎ পাবলিকেশন্সের মালিক শাহজাহানের সাথে। তিনি বলেন, এবারের মেলায় আমাদের নতুন অনেক বই আসতেছে। বিশেষ করে সাইমুম সাদীর ক্যামোফ্লেজ নামে একটি থ্রিলার বই, আবু মহি মুসার প্রেমবিলাসী এবং যুগ যুগ ধরে দুটি চমৎকার উপন্যাস আসতেছে। এছাড়াও বইমেলায় আমাদের আরও ১২টি বই আসবে।
বইমেলায় বিকাল গড়ালে সন্ধ্যায় বাড়তে থাকে ভিড়। কেউ কেউ আসছেন বই দেখতে, আবার অনেকেই ব্যাগভর্তি বই নিয়েও বাড়ি ফিরছেন। আর বইপ্রেমীদের আনাগোনা কম থাকলেও বিক্রি তুলনামূলকভাবে ভালো বলেই মত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর। গতকাল ছিলো অমর একুশে গ্রন্থমেলার পঞ্চম দিন। মেলায় এদিন নতুন বই এসেছে ১১৮টি।
বিকাল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় নূহ-উল-আলম লেনিন রচিত ‘রাজনীতিতে হাতেখড়ি ও কলকাতায় শেখ মুজিব’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক মোহীত উল আলম। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন আসাদ মান্নান এবং সাহেদ মন্তাজ। লেখকের বক্তব্য প্রদান করেন নূহ-উল-আলম লেনিন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সৈয়দ হাসান ইমাম।
প্রাবন্ধিক বলেন, আলোচ্য বইয়ে লেখক অনেকটা নির্মোহ থেকে কীভাবে শেখ মুজিব টুঙ্গিপাড়া জন্মস্থান থেকে বাংলাদেশের জাতির পিতা হিসেবে আবির্ভূত হলেন তার একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রণিধানযোগ্য রাজনৈতিক আলেখ্য তৈরি করেছেন। শেখ মুজিব তাঁর যৌবনদৃপ্ত সময়ে পাকিস্তান-আন্দোলনের একজন একনিষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মী ও নেতা ছিলেন।
কিন্তু পাকিস্তান হওয়ার সাথে সাথেই তিনি হূদয়ঙ্গম করেন যে নতুন দেশটি দিয়ে বাঙালির স্বপ্ন পূরণ হবে না। নূহ-উল-আলম লেনিনের গ্রন্থটির মূল অনুসন্ধান এ জায়গায় যে, কখন থেকে বঙ্গবন্ধুর মানসে দ্বিজাতিতত্ত্বের ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের আবরণে সৃষ্ট সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান থেকে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের কাঠামোয় সৃষ্ট অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার ধারণা জন্ম নিলো।
আলোচকবৃন্দ বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত অত্যন্ত চমৎকারভাবে বিধৃত হয়েছে নূহ-উল-আলম লেনিন রচিত এ গ্রন্থে। রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই বাঙালি এবং বাংলাদেশ ছিলো বঙ্গবন্ধুর চেতনা ও মননে।
কলকাতায় রাজনীতির অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনের অভিঘাত হিসেবে কাজ করেছে এবং তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ ও চেতনাকে শাণিত করেছে। কাজেই বলা যায়, বঙ্গবন্ধুর রাজনীতিতে হাতেখড়ি মূলত বাঙালির বহু আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জনের পথে অভিযাত্রার সূত্রপাত।
গ্রন্থের লেখক নূহ-উল-আলম লেনিন বলেন, বর্তমান গ্রন্থের পরিসরে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতিতে হাতেখড়ি ও কলকাতার জীবনচর্যার দিকগুলোই আলোচিত হয়েছে। সেই সঙ্গে তাঁর পরবর্তী পরিণত রাজনৈতিক জীবনের কিছুটা আভাস এখানে উঠে এসেছে। তবে বঙ্গবন্ধুর মতো একজন মহান দেশপ্রেমিক ও রাজনীতিবিদকে সামগ্রিকভাবে দেখতে হলে তাঁর সমগ্র রাজনৈতিক জীবনকেই বিচার-বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
সভাপতির বক্তব্যে সৈয়দ হাসান ইমাম বলেন, বাংলার মানুষের ভালোবাসা ও বাংলার মাটির কোমলতাই বঙ্গবন্ধুকে ‘বঙ্গবন্ধু’ হিসেবে নির্মাণ করেছিল এবং তাঁর ভেতর অসাধারণ রাজনৈতিক প্রজ্ঞার উন্মেষ ঘটিয়েছিল।
মানুষের মনন ও চেতনাকে স্পষ্টরূপে বুঝতে পেরেছিলেন বলেই তিনি বাঙালির জাতির মহান রাজনৈতিক নেতায় পরিণত হতে পেরেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের উত্থানকে বুঝতে নূহ-উল-আলম লেনিন রচিত রাজনীতিতে হাতেখড়ি ও কলকাতায় শেখ মুজিব গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি।
কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন কবি ইকবাল আজিজ, কবি ঝর্ণা রহমান, কবি ফারুক মাহমুদ, ও কবি মারুফ রায়হান। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী রেজিনা ওয়ালী, মীর বরকত এবং নাজমুল আহসান।
সঙ্গীত পরিবেশন করেন চন্দনা মজুমদার, কোহিনুর আক্তার গোলাপী, লতিফ শাহ, রুশিয়া খানম ও রাকিবুল ইসলাম রাকিব। যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন দীপক কুমার দাস (তবলা), রতন কুমার রায় (দোতারা), আবদুস সোবহান (বাংলা ঢোল) এবং সুমন রেজা খান (কী-বোর্ড)।
গতকাল লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন জসিম মল্লিক, অনন্ত উজ্জ্বল, হানযালা হান এবং মন্দিরা এষ।
আজকের অনুষ্ঠানসূচি : আজ শুক্রবার অমর একুশে গ্রন্থমেলার ষষ্ঠ দিন। মেলা চলবে সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। আজ সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত গ্রন্থমেলায় শিশুপ্রহর ঘোষণা করা হয়েছে। সকাল সাড়ে ৮টায় অমর একুশে উদযাপনের অংশ হিসেবে শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিযোগিতা উদ্বোধন করবেন বরেণ্য চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী।
বিকাল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে সৈয়দ শামসুল হক রচিত বঙ্গবন্ধুর বীরগাঁথা এবং এর অনুবাদ বাল্ড অব আওয়ার হিরো : বঙ্গবন্ধু শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন।
আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন খায়রুল আলম সবুজ এবং আনিসুল হক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এমরান কবিরচৗধুরী। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ, আবৃত্তি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।