বৃহস্পতিবার ১২ই মার্চ, ২০২৬ ইং ২৮শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বঙ্গবন্ধু রেলসেতু নির্মাণ ব্যয় বাড়ছে সাত হাজার কোটি টাকা

আকাশবার্তা ডেস্ক :

চলে গেছে তিন বছর। কিন্তু কাজের অগ্রগতি মাত্র সোয়া দুই শতাংশ। এডিবি ও জাইকার মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ফিজিবিলিটি স্টাডি করার পরও কাজে নেই গতি। শুধু তাই নয়, জাদুঘর ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় দেখানো হলেও বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন করা হয়নি ডিপিপিতে।

এছাড়া পরামর্শক খাতে অনেক ব্যয় ধরার পরও ফের অনেক বেশি করে ম্যানেজমেন্ট সাপোর্ট পরামর্শক ও বিশেষ ব্যয় ধরা হয়েছে। এভাবে বিভিন্ন অঙ্গে বেশি করে ব্যয় ধরে এর অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়।

এটি যেনতেন কোনো প্রকল্প নয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু নির্মাণ প্রকল্পের বাস্তব অবস্থা। বঙ্গবন্ধু সেতুর উপর চাপ কমাতে এবং গতি বাড়াতেই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কনটেইনার পরিচালনার জন্য ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুয়েল গেজ রেলসেতু ২০২৩ সালে নির্মাণের জন্য সরকার অনুমোদন দিয়েছে।

কিন্তু এবার তার মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে আরও দুই বছর অর্থাৎ ২০২৫ সাল পর্যন্ত। একই সাথে ব্যয় সাত হাজার কোটি টাকারও বেশি বাড়িয়ে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর অনুমোদনের জন্য সম্প্রতি রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে রোববার তা যাচাই করতে পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কিছু ব্যাপারে আপত্তি করে তা সংশোধন করতে বলা হয়েছে।

সার্বিক ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে আমার সংবাদকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, প্রথমপর্যায়ে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হলেও এখন দরপত্রের মূল্য অনুযায়ী প্রকৃত ব্যয় ধরা হচ্ছে। কাজেই বেশি ব্যয় বাড়ছে বিষয়টা তা না। চুক্তি অনুযায়ী সব ব্যয় করা হবে। ক্রয় কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে।

তিনি আরও বলেন, প্রকল্পটির বিভিন্ন খাতে যে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে সেটি যারা প্রস্তাবটি তৈরি করেছে তারা নিশ্চয়ই হিসাব করেই করেছে। তারপরও পরিকল্পনা কমিশন যেসব সুপারিশ দেবে, তা মানা হবে। সে অনুযায়ী কাজ করা হবে।

সার্বিক ব্যাপারে জানতে চাইলে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামসুল হক আমার সংবাদকে বলেন, সরকারের ভূমিনীতি গ্রহণের ফলে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ে, এটা স্বাভাবিক।

কিন্তু এই প্রকল্পে জাইকার কঠিন শর্তের কারণে ব্যয় বাড়ছে বলা যায়। জাপানের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতেই এ কাজ করা হচ্ছে। এটা সরকারকে দেখা দরকার। কারণ তাদের শর্তের কারণে রি-টেন্ডারিং করার সুযোগ থাকছে না।

অপরদিকে টেকনিক্যাল অভিজ্ঞতার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে তারা। অন্যরা কাজ পাচ্ছে না। তাই বাড়তি ব্যয় তাদের পকেটেই যাবে। এটা সরকারকে ভাবতে ও দেখতে হবে। জাদুঘরের ডিজাইন প্রণয়ন না করেই ব্যয় ধরা হয়েছে। তারা এ কাজ করতে পারে না।

এ ব্যাপারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আমার সংবাদকে বলেন, প্রকল্পটি তিন বছরে কেন বাস্তবায়নে যেতে পারেনি সেই কারণটি আগে খতিয়ে দেখা উচিত। এক্ষেত্রে যাদের অদক্ষতা ও দায়িত্বহীনতা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

তা না হলে দেখা যাবে আবারো সংশোধনের পর মেয়াদ ও ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। বিভিন্ন খাতের ব্যয় নিয়ে যৌক্তিক ব্যাখ্যা না পেলে অনুমোদন বন্ধ করতে হবে। সরকারকে এটা শক্তভাবে দেখতে হবে। কেননা এই টাকা জনগণের, তা মনে রাখতে হবে।

তিনি আরও বলেন, নতুনভাবে অঙ্গযুক্ত হতে পারে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশন সেই ব্যয়ের ব্যাপারে আপত্তি করেছে, তা এমনি তো করেনি। এটা অযৌক্তিক ব্যয় বলেই আপত্তি করা হয়েছে। এ জন্য সরকারকে বলবো ব্যয় যাতে যথাযথভাবে হয়। প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সরকারকে এটা ভাবতে হবে।

সূূত্র জানায়, বিদ্যমান বঙ্গবন্ধু সেতুতে রেলের চাপ ও গতি খুবই সীমিত করার কারণে পাশের দেশগুলোর সাথে ফ্রেইট যোগাযোগের সম্ভাবনা থাকার পরও পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

এছাড়া রেলপথের অবস্থারও উন্নতি করা দরকার। এসব আমলে নিয়ে সরকার এডিবির অর্থায়নে বিদ্যমান বঙ্গবন্ধু সেতুর সমান্তরাল ডুয়েলগেজ একক রেলসেতু নির্মাণের জন্য কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ করে।

পরে জাপান ইন্টারনাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) মাধ্যমেও একটি সম্পূরক সমীক্ষা করা হয়। এই সমীক্ষা প্রতিবেদনে প্রস্তাবিত ব্রিজের কাঠামো ও ফাউন্ডেশন পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়।

জাইকার সমীক্ষায় ট্রাস ব্রিজ নির্মাণের সুপারিশ করা হয় এবং সেতুটির নির্মাণকাজ দ্রুত ও সহজ এবং ব্যয় সাশ্রয়ী করার জন্য স্টিল পাইপ সিট পাইল ফাউন্ডেশন এবং ওয়্যারিং স্টিল ইন স্টিল ট্রাস গার্ডার ব্যবহারের মাধ্যমে ব্রিজটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়।

পরে জাপান-বাংলাদেশ কমিপ্রহেনসিভ পার্টনারশিপের আওতায় যৌথ ঘোষণায় পাঁচটি প্রকল্পের মধ্যে যমুনা রেলসেতু নির্মাণ প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০১৪ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরে এ প্রকল্পে অর্থায়নের আলোচনা হয়।

তা আমলে নিয়ে প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হলে ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর সরকার অনুমোদন দেয়। তাতে ব্যয় ধরা হয় ৯ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাইকার ঋণ সাত হাজার ৭২৪ কোটি টাকা। বাকি অর্থ সরকারি কোষাগার থেকে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত হয়।

আর বাস্তবায়নকাল ধরা হয় ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর। কাজও শুরু হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ তিন বছরে আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ২১৯ কোটি টাকা বা মাত্র ২ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর বাস্তব অগ্রগতি ৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ। তাই বাকি কাজ করতে রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে এখন মেয়াদ বাড়িয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।

একই সাথে ৯ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা থেকে মোট প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে ১৬ হাজার ৮০৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাইকার ব্যয় বাড়িয়ে ধরা হয়েছে চার হাজার ৪২৫ কোটি টাকা।

উল্লেখ্য, এ প্রকল্পের আওতায় বঙ্গবন্ধু সেতুর প্রায় ৩০০ মিটার উজানে যমুনা নদীর উপর দিয়ে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনসহ ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার একটি রেলসেতু নির্মাণের জন্য দুটি প্যাকেজের দরপত্র গত ৯ জানুয়ারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি অনুমোদন দিয়েছে।

ওই সময়ে শর্ত জুড়ে দেয়া হয় সংশোধনের। তার আলোকেই সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটি সংশোধনের কারণ হিসেবে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য হচ্ছে— প্রকল্পের আওতাভুক্ত নির্মাণকাজের দরপত্রের প্যাকেজ-১ ও প্যাকেজ-২ এর মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া বেড়েছে সিডি ভ্যাটের হার ও পরিমাণ।

নতুন অঙ্গ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ভূমি অধিগ্রহণ, ভূমি ও অন্যান্য ফ্যাসিলিটি ভাড়ার সংস্থান। এছাড়া ব্যয় বেড়েছে জাপান-বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের নিদর্শন হিসেবে ব্রিজ এলাকায় জাদুঘর নির্মাণ, প্রাইস ও ফিজিক্যাল কন্টিনজেন্সির। আর মেয়াদ বৃদ্ধির কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন ইউনিটে জনবল ও অন্যান্য খাতে ব্যয় বেড়ে যাবে।

পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, সিগন্যালিং ও টেলিকমিউনিকেশন ওয়ার্কস (প্যাকেজ-৩) এবং ব্যাংক চার্জ বাবদ ব্যয়ও বাড়বে। কার্যপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, বাস্তবতার নিরিখে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক খাতে ব্যয় হ্রাস এবং বিশদ নকশা ও সুপারভিশন পরামর্শক খাতে ব্যয় কমে যাওয়ায় প্রকল্পটির প্রথম সংশোধন করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে গতকালের পিইসি সভায় পরিকল্পনা কমিশন বলেছে, সংশোধিত প্রকল্পে ডিজাইন ও সুপারভিশন পরামর্শক খাতে সরকারি তহবিল থেকে ২১২ কোটি টাকাসহ মোট ৮১৭ কোটি ৮১ লাখ টাকার প্রস্তাব কেন? আবার সরকারি অর্থে ম্যানেজমেন্ট সাপোর্ট পরামর্শক বাবদ ৫২ কোটি টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে।

ম্যানেজমেন্ট সাপোর্ট পরামর্শকের কাজ কি? এছাড়া দেশি-বিদেশি ডিজাইন ও সুপারভিশন পরামর্শক থাকার পরও ম্যানেজমেন্ট সাপোর্ট পরামর্শকের প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা- তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।

সূত্র আরও জানায়, সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবে জমি অধিগ্রহণ, জমি ব্যবহার ও আনুষঙ্গিক ব্যয় বাবদ মোট ৩৪৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি অনুমোদিত মূল প্রকল্প প্রস্তাবে ছিলো না। এ জমি বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের, যা সরকারি সংস্থা।

তাই এই ব্যয়ের বিষয়ে কোনো অব্যাহতি পাওয়া যাবে কিনা তা সভায় জানতে চাওয়া হয়। প্রকল্পের কাজের বেশিরভাগ আইটেমের বিশদ নকশা প্রণীত হয়েছে।

এ অবস্থায় প্রাইস ও ফিজিক্যাল কন্টিনজেন্সি বাবদ ১২২ কোটি টাকা অতিরিক্ত সংস্থানের প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা তা পুনঃপর্যালোচনা করা যেতে পারে বলে জানানো হয়।সার্বিকভাবে পরামর্শক খাতে ২৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে, এর কারণও জানতে চাওয়া হয়।

শুধু তাই নয়, দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক অটুট রাখতে একটি জাদুঘর স্থাপনের জন্য ব্যয় ধরা হলেও বিস্তারিত নকশা এখনো প্রণয়ন করা হয়নি। তাই এ খাতের ব্যয় প্রাক্কলনের ভিত্তি কি তাও জানতে চাওয়া হয় সভায়।

এভাবে বিভিন্ন ব্যাপারে প্রশ্ন জাগায় তা সংশোধন করতে বলা হয়েছে। রেল মন্ত্রণালয় থেকে এসব সংশোধন করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে একনেক সভায় প্রথম সংশোধন অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে সূত্র জানায়।

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

মার্চ ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« ফেব্রুয়ারি    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১