আকাশবার্তা ডেস্ক :
২০২১ সালে সবার ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তা আমলে নিয়ে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পল্লীবিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) ব্যতিক্রম উদ্যোগও নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে সারা দেশে আট বিভাগের জন্য শতভাগ পল্লী বিদ্যুতায়নের জন্য বিতরণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ প্রকল্পটি তৈরি করে।
প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এ দুটি প্রকল্প ২০১৭ সালে অনুমোদনও দিয়েছে সরকার। যা ২০১৯ সালে বাস্তবায়ন করার কথা। এর মাধ্যমে ৯৬ হাজার কি.মি. নতুন লাইন নির্মাণের কথা। যাতে ৩৪ লাখ গ্রাহককে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া যায়। তা আমলে নিয়ে বিআরইবি অনেকদূর এগিয়ে গেছে। একে ভরসা করে আগামী জুনেই শতভাগ বিদ্যুৎ দেয়ার কথা ঘোষণা করেছে।
গ্রাহকরা যাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পায় তা নিশ্চিত করতে প্রকল্প দুটি সংশোধন করা হচ্ছে। এতে আরও সাত লাখ গ্রাহককে সংযোগ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সময় বাড়ছে দুই বছর। ব্যয়ও বাড়ছে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। তা যাচাই করতে সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় পরামর্শক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি যৌক্তিকপর্যায়ে আনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সংশোধন করে পাঠানো হলে খুব শিগগিরই একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে সূত্র জানায়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, শতভাগ বিদ্যুতায়ন নিশ্চিতকরণে ২০১৭ সালের ২০ জুন ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের জন্য শতভাগ পল্লীবিদ্যুতায়নের জন্য নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের জন্য শতভাগ পল্লীবিদ্যুতায়নের জন্য নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ প্রকল্প দুটির অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে এই প্রকল্প দুটি ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বাস্তবায়ন করার কথা। রিটেইনার কনসালট্যান্টের মাধ্যমে মাস্টারপ্লানের আলোকে ফিজিবিলিটি স্টাডির ওপর ভিত্তি করে প্রকল্প দুটি প্রণয়ন করা হয়।
ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের জন্য শতভাগ পল্লীবিদ্যুতায়নের জন্য নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে সাত হাজার ১৩২ কোটি টাকা। এর প্রধান কাজ ধরা হয়— ৩৯ হাজার ১০০ কি.মি.নতুন লাইন নির্মাণ, ৬১টি নতুন ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্র নির্মাণ, বিদ্যমান ১০০টি ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্রের ৯৯৫ এমভিএ ক্ষমতাবর্ধন এবং ৩৯ সেট রিভার ক্রসিং টাওয়ার নির্মাণ। পার্বত্য তিন জেলা বাদে ২৯টি জেলার ৪৪টি পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির এলাকায় এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এছাড়া ২২ দশমিক ৮ একর ভূমি অধিগ্রহণ এবং একটি সুইচিং স্টেশন নির্মাণও করা হবে। তাতে ১৩ লাখ ৭০ হাজার নতুন গ্রাহক সংযোগ দেয়ার কথা বলা হয়। চলতি অর্থবছরে দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। কাজও শুরু হয়েছে। আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৪২ দশমিক ২০ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ৫১ শতাংশ। বাকি কাজ ডিসেম্বরে সম্ভব নয়।
এছাড়া নতুন করে বসতবাড়ি এবং নদীভাঙনের ফলে পাশের এলাকায়ও বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া দরকার। এজন্য তিন লাখ ৪০ হাজার নতুন সংযোগ বাড়িয়ে ১৭ লাখ ১০ হাজার নির্ধারণ করা হয়েছে। বিতরণ লাইনও আট হাজার ৭৪০ কি.মি. বাড়িয়ে ৪৭ হাজার ৮৪০ কি.মি. ধরা হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে আটটি উপকেন্দ্র বাড়িয়ে ৬৯টি নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাড়তি এসব কাজ বাস্তবায়নে সময় বাড়ানো হয়েছে দুই বছর অর্থাৎ ২০২১ সালের ডিসেম্বরে শেষ করা হবে শতভাগ বিদ্যুৎ দেয়ার এ প্রকল্প। তাতে ব্যয় বাড়িয়ে ধরা হয়েছে আট হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। বাড়ছে এক হাজার ২৪৮ কোটি টাকা বা সাড়ে ১৭ শতাংশ। তা যাচাই করতে সম্প্রতি পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় প্রকল্প সংশোধনের কারণ হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে ৫৩টি অঙ্গের মধ্যে ১৫টির ব্যয় বাড়ছে। এর মধ্যে পরামর্শক খাতে সাড়ে ৮২ কোটি টাকা থেকে ব্যয় বাড়িয়ে প্রায় ৯৬ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। আর ব্যয় কমছে ২৯টির অঙ্গের। গত অক্টোবর পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে তিন হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা বা ৪২ দশমিক ২০ শতাংশ। প্রায় পুরো সময়ে এ অগ্রগতি, যা ধীর অগ্রগতি বলে কারণ জানতে চাওয়া হয় সভায়।
একই সাথে কতটি উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন করা হয়েছে তাও জানতে চাওয়া হয়। দীর্ঘ সময়ে জিপ, পিক-আপ ও মোটরসাইকেল কেনা হয়নি, তাই বাকি সময়ে এক কোটি টাকা বৃদ্ধির প্রয়োজন নেই বলেও জানানো হয়। ফিজিবিলিটি স্টাডির পরও বাড়তি বিতরণ লাইন এবং উপকেন্দ্র নির্মাণ প্রস্তাব কিসের ভিত্তিতে প্রণয়ন করা হয়েছে তা জানতে চাওয়া হয়।
৫১ শতাংশ অগ্রগতিতে পরামর্শক খাতে প্রায় ৩২ কোটি টাকা ব্যয় হলেও বাকি কাজের জন্য এ খাতে ১৩ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে ৯৬ কোটি টাকা ব্যয় পর্যালোচনা করে যৌক্তিকপর্যায়ে আনার জন্য বলা হয়েছে। এভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন করতে বলা হয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে শতভাগ পল্লীবিদ্যুতায়নের জন্য নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ প্রকল্পটিরও অনুমোদন দেয়া হয়েছে ২০১৭ সালের ২০ জুনে। তাতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ছয় হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। ৩৬টি পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির এলাকায় ২০১৯ সালে তা বাস্তবায়ন করার কথা।
প্রধান কাজ ধরা হয় ১৩ লাখ ৩০ হাজার গ্রাহক সংযোগ। নতুন লাইন নির্মাণ ৩৮ হাজার কি.মি. নতুন উপকেন্দ্র নির্মাণ ৪৮টি। কাজও শুরু হয়েছে। কাজ এগিয়ে নিয়ে সরকার চলতি অর্থবছরে এক হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা বরাদ্দও দিয়েছে। গত অক্টোবর পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে তিন হাজার ৬৫ কোটি টাকা বা ৪৫ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ৪৮ শতাংশ। প্রকল্পের সময় প্রায় শেষ।
তাই বাকি কাজ শেষ করতে এ প্রকল্পেরও দুই বছর অর্থাৎ ২০২১ সালে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ব্যয়ও বাড়ছে প্রায় এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা বা ২৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ। কারণ গ্রাহক সংযোগ তিন লাখ ৬০ হাজার বাড়িয়ে ১৬ লাখ ৯০ হাজার নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া নতুন বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন ১০ হাজার ২৪৫ কি.মি. বাড়িয়ে ৪৮ হাজার ২৫৫ কি.মি. এবং উপকেন্দ্র সাতটি বাড়িয়ে ৫৫টি নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব যাচাই করতে সম্প্রতি পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রথম প্রকল্পের মতোই পরামর্শক খাতে ১৪ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে ৯৪ কোটি টাকার প্রস্তাব করায় তা যৌক্তিকপর্যায়ে আনতে বলা হয়েছে। তিন বছর চলে গেলেও কোনো গাড়ি কেনা হয়নি।
তাই বাড়তি ব্যয় এক কোটি টাকারও বেশি আর প্রয়োজন নেই। গাড়ি না কিনেও পেট্রল ও লুব্রিকেন্টের জন্য সাত লাখ টাকা ব্যয়ের ব্যাখা চাওয়া হয়েছে। এছাড়া কয়টি উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন হয়েছে তা জানতে চাওয়া হয়েছে। এভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রশ্ন করে তা সংশোধন করতে বলা হয়েছে। এসব সংশোধন করে পরিকল্পনা কমিশনে ডিপিপি পাঠানো হলে খুব শিগগিরই একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে সূত্র জানায়।
বিআরইবির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মঈন উদ্দিন (অব.) সম্প্রতি বলেন, ৬১টি জেলার (পার্বত্য তিন জেলা বাদ) ৪০টি বাদে সব উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুৎ পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্ব, উত্তম চর্চা এবং দলগতভাবে কাজ করার কারণেই এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। ৯২ শতাংশ গ্রাহককে কম দামে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে। বাকি কাজ অর্থাৎ শতভাগ বিদ্যুতায়নের কাজ আগামী জুনে বাস্তবায়ন করা হবে।