আকাশবার্তা ডেস্ক :
ভয়াবহ করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে দেশের বিভিন্ন মসজিদে রাতে হঠাৎ আজানের ধ্বনি শোনা গেছে। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত বেশিরভাগ মসজিদের মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি।
এছাড়া কালোজিরা, আদা, লবঙ্গ বা লবণ দিয়ে চিনি ছাড়া রং চা খেলে করোনাভাইরাস থেকে বাঁচা যাবে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্নস্থানে। এ ঘটনার পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনেকের নির্ঘুম রাত কাটে। বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে একজন থেকে আরেকজনের কাছে গুজবটি ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপকভাবে। প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদনে বিস্তারিত পড়ুন :
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি : লক্ষ্মীপুর জেলার বিভিন্নস্থানে রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত মসজিদগুলোতে হঠাৎ আজানের ধ্বনি শোনা যায়। মহিলারা একজন আরেকজনকে বলতে থাকে অমুক এলাকার অমুক বাড়িতে একটি শিশু জন্ম নেওয়ার পর শিশুটি কথা বলতে শুরু করে। এসময় শিশুটি নাকী প্রথমে বলেছে ভাইরাস। এরপর বলেছে, চিনি ছাড়া লবণ দিয়ে রং চা তৈরী করে খেলে করোনাভাইরাস মুক্ত থাকা যাবে। খবরটি মুহুর্তের মধ্যে জেলার চন্দ্রগঞ্জসহ আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে রাতের বেলায় রং চা বানিয়ে লবণ মিশিয়ে খেয়েছে বলেও শোনা গেছে। তবে শিশুটি নাকী এমন কথা বলার কিছুক্ষণ পরই মারা যায়। এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করতে যে এলাকায় এমন শিশু জন্ম নিয়েছে বলে শোনা গেছে, সেসব এলাকায় খবর নিয়ে এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
চাঁদপুর প্রতিনিধি : চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে রাতে হঠাৎ মসজিদে মসজিদে আজানের ধ্বনি শোনা গেছে। প্রথমে একজনেরটা শুনে অন্যরা আজান দিলেও কী কারণে এমনটি হয়েছে সে বিষয়ে কেউ সঠিক কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
ঢাকায় বসবাসরত হাজীগঞ্জের বাসিন্দা ইমাম হোসেন ইমন ফোন করে জানান, তিনি শুনেছেন– হাজীগঞ্জ উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামে নাকি বৃহস্পতিবার সকালে একটি শিশু জন্ম নিয়ে মারা গেছে। সে শিশু নাকি বলেছে আজান দিতে।
বিষয়টির সত্যতা জানতে ওই গ্রামে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, এটি গুজব। এ ঘটনা সত্য নয়।
হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ কর্তৃপক্ষ জানায়, এটি গুজব। আমরা আজান দিইনি।
উপজেলার ৯নং গন্ধর্ব্যপুর উত্তর ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর পূর্বপাড়া জামে মসজিদের খতিব শাহ আলম আল কাদরী ও কাকৈরতলা সিনিয়র মাদ্রাসার সাবেক উপাধ্যক্ষ আবদুল মমিন ফারুকি জানান, আমরা কোনো নির্দেশনা পাইনি। আর শরিয়তে এমন কোনো কাজ করার বৈধতাও দেখি না। এটি গুজব হবে।
একই গ্রামের মুন্সিবাড়ি মসজিদের ইমাম জানান, তাকে কোনো এক হুজুর আজান দিতে বলেছেন। তাই তিনি সে মোতাবেক আজান দিয়েছেন। তবে তিনি বলেছেন, করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে আজান দেয়া হয়েছে।
হাজীগঞ্জ থানার ওসি আলমগীর হোসেন রনি বলেন, ‘আমরা কোনো নির্দেশনা পাইনি। তবে আজানের কথা শুনেছি। রাত ১০টা থেকে বিভিন্ন মসজিদে হঠাৎ আজান দেয়া হয়েছে।
এদিকে ইসলামী ফাউন্ডেশন অথবা উপজেলা প্রশাসন এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেনি। তারা বলেছেন এটি গুজব।
চট্টগ্রাম ব্যুরো : চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় রাত ১০টার পর থেকে আজান দেয়া শুরু হয়েছে। রাত ১১টা পর্যন্ত থেমে থেমে আজান দেয়ার কার্যক্রম চলে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে আল্লাহর রহমত কামনা করে এই আজান দেয়া হচ্ছে।
মসজিদে মসজিদে আজান দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে রাউজান উপজেলার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, ‘একটি ইসলামী সংগঠনের পক্ষ থেকে মসজিদে রাত ১০টায় আজান দেয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। সেই অনুসারে আশপাশের মসজিদ থেকে রাত ১০টার পর থেকে আজান দেয়া শুরু হয়।’
এদিকে একটি ভিডিও বার্তায় আজান দেয়ার বিষয়টিকে গুজব বলে দাবি করেছেন চট্টগ্রামের জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মাদরাসার প্রফেসর মুফতি ওবায়দুল হক নঈমী।
তিনি ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, আমার নামে কারা গুজব ছড়িয়েছে জানি না। করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকানোর বিষয়ে আমি রাতে মসজিদে মসজিদে আজান দেয়ার কথা কোথাও বলেনি। আমার নামে কেউ এসব কথা বললে সেগুলো গুজব।
রাত পৌনে ১১টায় চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কেঁওচিয়া গ্রামের মাইজপাড়া জামে মসজিদের পেশ ইমাম আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘কোন সংগঠন মসজিদে আজান দেওয়ার কর্মসূচি দিয়েছে আমি জানি না। তবে এলাকার অন্য মসজিদগুলোতে থেকে আজানের শব্দ শোনে আমিও আজান দিয়েছি।’
এরপর রাত ১১টায় চট্টগ্রাম নগরীর বেশ কয়েকটি মসজিদ থেকে আজানের শব্দ ভেসে আসে। রাত ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত সময়ে চট্টগ্রামের অনেক মসজিদে আজান দেওয়া হয়।
মধ্য রাতে আজানের বিষয়ে কেঁওচিয়া মোজহেরুল হক ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসার সুপারিটেডেন্ট আবদুল মালেক বলেন, ‘মধ্যরাতে আজান দেওয়ার কর্মসূচি কারা ঘোষণা করেছে জানি না। তবে এলাকার মসজিদগুলোতে আজান দেয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য আজান দেওয়ার ধর্মীয় বিধান আছে। এর বাইরে আজানের ফজিলত কী? সেটা আমার কাছে স্পষ্ট নয়।’
নরসিংদী প্রতিনিধি : নরসিংদীর বিভিন্ন মসজিদেও আজানের ধ্বনি শুনা গেছে। রাত সাড়ে ১০টায় হঠাৎ নরসিংদীর
বিভিন্ন মসজিদের মাইক থেকে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি। কিছুক্ষণ পর মসজিদের মাইকে ঘোষণা করা হয় বাড়ি বাড়ি আজান দিতে হবে ও দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করতে হবে।
আতঙ্ক ও ভয়ে মানুষ আজান ও নামাজের প্রস্তুতি শেষ করার পর বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয় করোনাবিরোধী মিছিল। ‘করোনা থেকে সাবধান’, ‘আল্লাহ আকবার’ শ্লোগান শোনা যায় চারদিকে। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মিছিল নিয়ে শত শত মানুষ নেমে আসে রাস্তায়। পরে পুলিশ গিয়ে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
এলাকাবাসী ও প্রত্যক্ষদশীরা জানান, রাত সাড়ে ১০টায় হঠাৎ করে বেলাব, আমলাব, বাজনাব, নারায়নপুর, সল্লাবাদ, চরউজিলাব, পাটুলী ইউনিয়নের প্রায় সব মসজিদ থেকে একের পর এক আজান দেয়া হয়। এসময় কিছু কিছু মসজিদ থেকে মাইকে ঘোষণা দেয়া হয় বাড়িতে বাড়িতে আজান, নফল নামাজ, কোরআন তেলওয়াত ও তওবা করার জন্য।
বৃহস্পতিবার রাতে কেয়ামত হয়ে যাবে- এমন বিশ্বাসে এ সময় অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এর কিছুক্ষণ পর উপজেলার বারৈচা, দেওয়ানেরচর, খামারচর এলাকায় করোনাবিরোধী মিছিল বের করে কিছু মানুষ।
‘করোনাভাইরাস নিপাত যাক’, ‘আল্লাহু আকবার’- এসব শ্লোগানে দিতে থাকেন তারা। পরে পুলিশ গিয়ে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
এছাড়া বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে ফেনী জেলার বিভিন্নস্থানে এবং নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ, বেগমগঞ্জ, চাটখিল, সোনাইমুড়ী, সেনবাগ, কবিরহাট, সুবর্ণচর, সদর ও হাতিয়া উপজেলার বিভিন্ন মসজিদের মাইক থেকে হঠাৎ করে থেমে থেমে আজান শুরু হয়। অসময়ে আজানের ধ্বনি শুনে অনেকেই চমকে উঠেন।