আকাশবার্তা ডেস্ক :
কমান্ডো ট্রেনিংপ্রাপ্ত সাবেক এসএসএফ সদস্য সিনহা মো. রাশেদ খানের ডাক নাম আদনান। সাবেক সহকর্মী ও বন্ধুরা সিনহা নামে ডাকলেও পরিবারের সদস্যরা তাকে আদনানই ডাকতেন।
দুই বছর আগে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়া সিনহা ‘লেটস গো’ নামে একটি ভ্রমণ বিষয়ক ডকুমেন্টারি বানানোর জন্য গত প্রায় একমাস ধরে কক্সবাজারের হিমছড়ি এলাকায় ছিলেন। আরও তিন সঙ্গীকে নিয়ে তিনি উঠেছিলেন নীলিমা রিসোর্টে।
গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন।
ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের কথা জানিয়ে সে সময় পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, সিনহা তার পরিচয় দিয়ে ‘তল্লাশিতে বাধা দেন’। পরে ‘পিস্তল বের করলে’ চেক পোস্টে দায়িত্বরত পুলিশ তাকে গুলি করে।
এরপর গত ৫ আগস্ট টেকনাফ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হত্যা মামলা করেন তার বোন।
তাদের বাড়ি যশোরের বীর হেমায়েত সড়কে হলেও বাবা মুক্তিযোদ্ধা এরশাদ খানের সরকারি চাকরির সুবাদে বিভিন্ন জেলায় তাদের থাকতে হয়েছে। সবশেষ অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপ সচিব ছিলেন এরশাদ খান।
৩৬ বছর বয়সী সিনহা ছিলেন অবিবাহিত। তিন ভাইবোনের মধ্যে বড় বোন শারমিন শাহরিয়া একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন, আর ছোট বোন থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে।
৫১ বিএমএ লং কোর্সে অংশ নিয়ে সেনাবাহিনীতে কমিশন পাওয়া সিনহা ২০১৮ সালে সৈয়দপুর সেনানিবাসে থাকা অবস্থায় স্বেচ্ছায় অবসরে যান।
সিনহার ইচ্ছা ছিল নিজের বিশ্ব ভ্রমণের সব খুঁটিনাটি তিনি প্রকাশ করবেন নিজের ইউটিউব চ্যানেলে। এর মধ্যে রাজশাহী গিয়ে চার মাস ছিলেন সিনহা। উদ্দেশ্য ছিল সেখানে তার এক বন্ধুর মায়ের গড়ে তোলা লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করে নিজেকে বিশ্বভ্রমণের জন্য আরও তৈরি করা।
কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারী শুরু হয়ে যাওয়ায় তার পরিকল্পনা থমকে যায়। তখন ‘লেটস গো’ নামে একটি ভ্রমণ বিষয়ক ডকুমেন্টারি বানানোর পরিকল্পনা করেন সাবেক এই সেনা সদস্য। কক্সবাজারের হিমছড়িতে সেই ডকুমেন্টারির কাজই তিনি করছিলেন বলে জানান তার বোন শারমিন।
কক্সবাজারের টেকনাফে ভিডিও চিত্র ধারণ করতে গিয়েই থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, পরিদর্শক লিয়াকত আলীর টার্গেটে পড়েন মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। ঘটনার দিন বিকেলে তিনি সহযোগী সাহেদুল ইসলাম সিফাতকে নিয়ে টেকনাফ থানা এলাকা, বাহারছড়ার নোয়াখালীপাড়া ও মারিসঘোণা এলাকায় বেশ কিছু দৃশ্য ধারণ করেন।
ধারণা করা হচ্ছে, এই কাজের ফাঁকে সিনহা রাশেদ ইয়াবা কারবারে প্রদীপের সিন্ডিকেটসহ স্পর্শকাতর কিছু প্রমাণ পেয়ে যান। আর এই কারণেই সিনহাকে হত্যা করেন প্রদীপ।
পুলিশের পক্ষ থেকে টেকনাফ ও রামু থানায় দায়ের করা দুটি মামলার এজাহার ঘেঁটে দেখা গেছে, সেখানে নেই সিনহার শুটিং টিমের ল্যাপটপ ও ক্যামেরার মেমোরি কার্ড। এসব ডিভাইসে স্পর্শকাতর ভিডিও চিত্র বা মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত গায়েব করা হয়েছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছে যে সিনহা ওসি প্রদীপের বক্তব্যসহ কিছু ভিডিও রেকর্ড করার কারণে তাঁকে অনুসরণ করে হত্যা করা হয়।
সিনহার মৃত্যুর ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় একমাত্র সাক্ষী করা হয়েছে সিফাতকে। যিনি পুলিশের দায়েরকৃত দুইটি মামলার আসামি। তিনি এসব মামলায় সোমবার জামিন পেয়ে বিকালে কারামুক্ত হয়েছেন।
এদিকে ওসি প্রদীপ গ্রেপ্তারের পর একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। টেকনাফ থানায় যোগ দেয়ার আগে তিনি কক্সবাজার জেলার মহেশখালী, উখিয়া, কক্সবাজার সদর মডেল থানা, চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, পাঁচলাইশ ও বায়েজিদ বোস্তামী থানায় কর্মরত ছিলেন।
১৯৯৫ সালে চাকরিতে যোগদান করা এই পুলিশ কর্মকর্তা চাকরিজীবনে একাধিবার পুলিশ বিভাগের সর্বোচ্চ সম্মাননা পুরস্কার পিপিএম, বিপিএম পেয়েছেন। তার বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে। ঘুরে ফিরে কক্সবাজারে গড়ে তুলে শক্ত সিন্ডিকেট। তাদের দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া হতো।
মাদক নির্মূলের উসিলায় ক্রসফায়ারের নামে কন্ট্রাক্ট কিলিং, লোকজনকে জিম্মি করে টাকা আদায়, এমনকি ধর্ষণে সহায়তার অভিযোগও উঠছে তার বিরুদ্ধে। প্রদীপের দানবীয় কর্মকান্ড থেকে রক্ষা পায়নি বোনের জায়গাও!
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ।