তথ্য প্রযুক্তি ডেস্ক :
সরকারি সেবা প্রদানের প্রচলিত দৃশ্যপট বদলে সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের দোরগোড়ায় সস্তায়, সহজে, দ্রুত, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত সেবা পৌঁছে দেয়াই ডিজিটাল বাংলাদেশের মূল উদ্দেশ্য। যে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার ইউনিয়ন থেকে শুরু করে উপজেলা-জেলা, বিভাগ ও মন্ত্রণালয় পর্যন্ত সর্বত্রই গড়ে তুলেছে সমন্বিত ই-সেবা কাঠামো।
জনগণ যেকোনো জায়গা থেকে যেকোনো সময় তার প্রয়োজনীয় সকল সেবা গ্রহণ করতে পারছে। এতে সাধারণ মানুষের সময়, ভোগান্তি কমেছে, স্বাচ্ছন্দ্য বেড়েছে এবং জনজীবন হয়েছে সহজ। মানুষের কর্মসময়ও বৃদ্ধি পেয়েছে।
উন্নয়নের ধারাকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য সামনে রেখেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পরিচালিত একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পের মাধ্যমেই এটা সম্ভব হয়েছে। গোটা দেশব্যাপীই বিস্তৃত এ প্রকল্পের কার্যপরিধি। যার কারিগরি সহায়তায় রয়েছে ইউএনডিপি।
এ প্রকল্পের অধীনে প্রথম ধাপে সহজে বাস্তবায়নযোগ্য উদ্যোগের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে প্রায় সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধিদপ্তরও নিজস্ব উদ্যোগে বৃহৎ পরিসরে ই-সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এটুআই প্রকল্পের কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি নাগরিক কোনো না কোনো ই-সেবা উপভোগ করছে। ডিজিটাল প্রজেকশন, ডিজিটাল আইন, ডিজিটাল সমাজ, ডিজিটাল যুগ, ডিজিটাল বিপ্লবী, ডিজিটাল পদ্ধতি, ডিজিটাল ক্যামেরা সর্বত্রই আজ ডিজিটালের ছড়াছড়ি।
জনসেবা সুনিশ্চিতের লক্ষ্যে স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব অনুধাবন করে ২০০৬-২০১১ মেয়াদে ইউএনডিপি কর্তৃক প্রথম এটুআই (access to information) কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (পিএমও) ই-গভর্নমেন্ট সেল তা বাস্তবায়ন করে। এর আওতায় জেলায় জেলায় ই-সেবাকেন্দ্র স্থাপিত হয়। ই-সেবার ধারণাগুলো জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়ার প্রয়াস চলে।
বদলে যায় নাগরিকের কাছে সেবা পৌঁছে দেয়ার পদ্ধতি। একই স্থান থেকে মুঠোফোনের মাধ্যমে ভোক্তারা যাবতীয় বিল প্রদান করতে সক্ষম হয়। চাষিদের কাছে জনপ্রিয়তা পায় ই-ক্রয় আদেশ।
সর্বোপরি, ই-সেবার উদ্যোগগুলো বেশ ফলপ্রসূ হয়। সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি যে একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে এবং সরকারি সেবার ব্যয় কমিয়ে গুণগতমান, স্বচ্ছতা ও উন্নয়ন ঘটাতে পারে এটুআইয়ের প্রথমপর্যায়ের কার্যক্রমে তা প্রতিফলিত হয়। যার ফলে ২০১২ সালে ‘এটুআই ও ই-সার্ভিস ডেলিভারি ফর ট্রান্সপারেন্সি অ্যান্ড রেসপনসিভ প্রোগ্রাম (সাপোর্ট টু ডিজিটাল বাংলাদেশ)’ প্রকল্পও নেয়া হয়।
এটুআই প্রকল্পের অন্যতম সফলতা ডিজিটাল সেন্টার। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা নিশ্চিত করতে ২০১০ সালের ১১ নভেম্বর দেশজুড়ে চার হাজার ৫০১টি ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্র (ইউআইএসসি) স্থাপন করা হয়।
পরবর্তী সময়ে যার নামকরণ করা হয় ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি)। এসব ডিজিটাল সেন্টার এখন কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সরকারি-বেসরকারি-বাণিজ্যিক তথ্য এবং সেবাপ্রাপ্তির অনন্য কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
সারা দেশে ইউনিয়ন পরিষদসহ পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন এবং শিল্পাঞ্চল এলাকায় পাঁচ হাজার ৮৬৫টি ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে সেবা প্রদান করা হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে পরিচালিত ডিজিটাল সেন্টার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এটুআই ই-সেবার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছে।
আর সেটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে হাজার হাজার নারী ও পুরুষ উদ্যোক্তা। স্থানীয় সরকারের অন্যতম কেন্দ্র ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা। ডিজিটাল সেন্টার স্থাপনের কারণে এই কেন্দ্রগুলোর ভূমিকা বেড়েছে। কর্মরত সচিবদের দায়িত্ব বেড়েছে। বেড়েছে সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতাও।
ইউনিয়ন পরিষদের সচিবরা বলছেন, সেবাকেন্দ্রে কম্পিউটার কম্পোজ থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি সংক্রান্ত তথ্য, ভর্তি ফরম পূরণ, জন্মনিবন্ধন, বিমা, মোবাইল ব্যাংকিং, কৃষিকাজের জন্য মাটি পরীক্ষা ও সারের সুপারিশ, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ, ডাক্তারি পরামর্শসহ নানাবিধ সেবা এখন সহজেই পাওয়া যাচ্ছে।
জেলা প্রশাসক সেবাগুলো নিয়মিত তদারকি করছেন। মোটকথা সেবায় এক নবদিগন্তের সূচনা করেছে ডিজিটাল সেন্টার। এছাড়াও এটুআই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন, ইনোভেশন ফান্ড, শিক্ষায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, মুক্তপাঠ ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম, আই-ল্যাব, একশপ, কৃষি বাতায়ন, বিচার বিভাগ-সংক্রান্ত বাতায়নসহ ই-নথির মাধ্যমে ডিজিটাল তথ্যসেবায় প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে এটুআই।
South-South Network for Public Service Innovation : বাংলাদেশের সফল উদ্যোগ যেমন ডিজিটাল সেন্টার এবং সেবা প্রক্রিয়া সহজীকরণ ২০১৫ সালে মালদ্বীপ এবং ২০১৬ সালে ভুটানের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে প্রদান করা হয়। বাংলাদেশের সফল উদ্যোগসমূহ এখন পেরু, প্যারাগুয়ে, সোমালিয়া, ফিজি, ফিলিপাইন এবং উগান্ডায় South-South Network for Public Service Innovation–এর সহযোগিতার মাধ্যমে প্রদান করা হচ্ছে।
জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে সাউথ-সাউথ সহযোগিতায় অনন্য ভূমিকা রাখার জন্য স্বীকৃতি দিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সাউথ- সাউথ নেতৃত্ব সম্মাননা-২০১৩, সাউথ- সাউথ স্বপ্নদর্শী সম্মাননা-২০১৪ এবং জাতিসংঘ সাউথ-সাউথ সহযোগিতা পুরস্কার-২০১৮।
সফল এটুআই প্রকল্পটি ইউএনডিপির সহযোগিতায় ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে বাস্তবায়নাধীন থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীনে হস্তান্তর করা হয়।
বর্তমানে প্রকল্পটি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং ইউএনডিপির অধীনে ডিসেম্বর ২০২৩ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সর্বশেষ টানা সপ্তমবারের মতো তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার ‘ওয়ার্ল্ড সামিট অন ইনফরমেশন সোসাইটি (ডব্লিউএসআইএস) পুরস্কার-২০২০’ অর্জন করেছে সেবা খাতে নবদিগন্তের উন্মোচন ঘটানো এটুআই প্রকল্পের দুটি উদ্যোগ।
ই-বিজনেস ক্যাটেগরিতে ‘একশপ’ এবং ই-এমপ্লয়মেন্ট ক্যাটাগরিতে ‘দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও এন্টারপ্রেনারশিপবিষয়ক সমন্বিত ইন্টেলিজেন্স প্ল্যাটফর্ম’ (skills.gov. bd) চ্যাম্পিয়ন পুরস্কার অর্জন করে।
শতাধিক দেশ থেকে প্রাপ্ত আবেদন বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বাছাই ও অনলাইন ভোটিং শেষে অনলাইনে চূড়ান্ত বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। ১৮টি ক্যাটাগরিতে আবেদন গ্রহণ করা হয়, যেখানে মোট ৭৬২ সাবমিশন থেকে ৩৫৪টি প্রকল্পকে অনুমোদন দেয়া হয়।
এর মধ্যে ৭২টি প্রকল্প চ্যাম্পিয়ন এবং ১৮টি প্রকল্প উইনার হয়, যার মধ্যে বাংলাদেশের দুটি প্রকল্প চ্যাম্পিয়ন এবং একটি প্রকল্প উইনার হওয়ার গৌরব অর্জন করে।
উল্লেখ্য, বর্তমান সংকটকালীন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের এটুআই টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল বিষয় নিয়ে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে এবং প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের ডিজিটাল বাংলাদেশে গড়ে তোলার লক্ষ্যেও ভার্চুয়াল ক্লাস চালু করে বলে সম্প্রতি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায় এটুআই কর্তৃপক্ষ।