আকাশবার্তা ডেস্ক :
বৈশ্বিক মহামারির কারণে তছনছ হয়ে গেছে শিক্ষাব্যবস্থা। অনেক জল্পনা-কল্পনা চলছিল এইচএসসি শিক্ষার্থীদের নিয়ে, হয়তো পরীক্ষা শেষ মুহূর্তে হবে। তবে সবদিক বিবেচনায় এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল করেছে সরকার।
ঘোষণা আসে জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের গড়ের মাধ্যমে এইচএসসির ফল নির্ধারণ করা হবে। তবে শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে।
তারা বলেছেন, মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়তে চাইলে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিতের মতো কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়ে ন্যূনতম গ্রেড প্রয়োজন হয়। আবার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিপরীক্ষার ফলও নির্ভর করে এই দুই পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলের ওপর। এ ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির মূল্যায়নে বিস্তর আলোচনা করার তাগিদ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিপরীক্ষায় পাওয়া মোট নম্বরের ৪০ ভাগ এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফলের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়ে থাকে। তাই এই নিয়মে ভর্তিপরীক্ষা হলে শিক্ষার্থীদের যথাযথ মূল্যায়ন হবে না।
১০ শতাংশ এসএসসি, ৩০ শতাংশ এইচএসসি ও ভর্তিপরীক্ষার ৬০ শতাংশ নম্বর নিয়ে পরীক্ষার ফলাফল নির্ধারণ করা হতো। কিন্তু এবার এইচএসসি পরীক্ষা না হওয়ায় ওই ৩০ শতাংশ আর থাকছে না।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক ড. মো. আবদুস সালাম আমার সংবাদকে বলেন, উচ্চশিক্ষার ওপর একটা সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে। এর ফলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ভর্তির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগবে।
উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক সিজিপিএ বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সিজিপিএ নির্ধারণ নিয়ে আমার ধারণা তাদের কিছুটা হিমশিম খেতে হবে।
অধ্যাপক আবদুস সালাম উদাহরণ টেনে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী যদি ক্যামেস্ট্রিতে ভর্তি হতে চায় তার এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষার ম্যাথমেটিকস ও ক্যামেস্ট্রি পরীক্ষার ন্যূনতম গ্রেড প্রয়োজন হয়।
এবার যেহেতু এইচএসসির বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষা হচ্ছে না সেক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একাডেমিক পর্যায়ে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা দরকার। কিভাবে এর মূল্যায়ন করা হবে।
মেডিকেল, বুয়েট এবং সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এবারের শিক্ষার্থীদের ভর্তিপরীক্ষা নিয়ে ভাবা দরকার বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এ অধ্যাপক।
পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্তে অনেকটা হতাশাগ্রস্ত এইচএসসি পরীক্ষার্থী সিয়াম আমার সংবাদকে জানান, প্রতিবছর দেখা যায় জেএসসি বা এসএসসিতে যেসব শিক্ষার্থী খারাপ করে তারা অনেকেই এইচএসসিতে ভালো ফল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। অনেক ভালো শিক্ষার্থী কিন্তু ঝরে পড়ে বিভিন্ন কারণে।
তার মতে, একজন পরীক্ষার্থীর প্রস্তুতি যেকোনো কারণে বদলে যেতে পারে এবং ভালো বা খারাপ যেকোনো কিছু হতে পারে। এ জন্য মূল্যায়নটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, অনেক সময় দেখা যায় টেস্টে একজন শিক্ষার্থীর রেজাল্ট খারাপ। পরবর্তীতে গাইড করে বর্তমানে যে অবস্থায় তাকে আনা হয়েছে সে অবস্থা ভালো। এক্ষেত্রে পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা আসায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবক উভয়েই মানসিকভাবে অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গেলো।
এটি এক পক্ষের জন্য যেমন সুবিধার তেমনি অপর পক্ষের জন্য অসুবিধার। এতে করে শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ালো। অনেক শিক্ষক বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও কোনো কোনো শিক্ষক দেখছেন নেতিবাচকভাবে।
তবে বেশির ভাগই বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্তটি সন্তোষজনক। একটা বড় ব্যাপার হলো শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা মানসিক চিন্তা থেকে মুক্তি পাবেন। ঘরে বসে থেকে যে সবাই পড়াশোনা করেছে ব্যাপারটা এমন নয়।
হ্যাঁ, কিছু শিক্ষার্থী হয়তো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তবে ভালোর দিকটাই বেশি। আমরা যদি অন্যান্য বছরের ফলাফলের হিসাব করি, তবে দেখা যায় গড় পাসের হার প্রায় ৮৫ ভাগ। এবার সেটা ১০০ ভাগে উন্নীত হতে পারে। আর উচ্চশিক্ষায় ভর্তির জন্য তাকে তো মূল্যায়নের মধ্য দিয়েই যেতে হবে।
এদিকে গত ৭ অক্টোবর শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি জানিয়েছিলেন জেএসসি ও এসএসসির ফলের ভিত্তিতে কীভাবে এইচএসসির ফল ঠিক করা হবে, তা নির্ধারণ করবে এই বিষয় সংক্রান্ত একটি পরামর্শক কমিটি।
এই পরামর্শক কমিটির একজন সদস্য ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক জিয়াউল হক জানান, ঠিক কোন নীতি অনুসরণ করে ফলাফল নির্ধারিত হবে সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া না হলেও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের কাজ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কীভাবে জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার বিষয়গুলো যুক্ত করে এইচএসসির বিষয়গুলোর সাথে সম্পৃক্ত করা যায়, তা নিয়ে পরামর্শক কমিটির পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব টেকনিক্যাল কমিটিও কাজ করছে।
তিনি জানান, এসএসসি থেকে এইচএসসিতে যেসব শিক্ষার্থী বিভাগ পরিবর্তন করেছে, তাদের বিষয়টিও পর্যালোচনা করছে কমিটি। শুধু বিজ্ঞান থেকে মানবিক বা ব্যবসা শিক্ষায় নয়, কারিগরি শিক্ষা বা মাদ্রাসা থেকে সাধারণ শিক্ষায় যোগ দেয় শিক্ষার্থীরা। আবার প্রাইভেট, মান উন্নয়ন শিক্ষার্থীও আছে। এই প্রতিটি ক্ষেত্রই আমরা শনাক্ত করেছি এবং একটার সাথে আরেকটাকে সম্পৃক্ত করতে যা করা দরকার তা নিয়ে কাজ করছি।