আকাশবার্তা ডেস্ক :
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে হাইব্রিড খ্যাত দলছুট নেতাদের দাপট। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা কম হয়নি। গত ১০ বছরে দলের ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলাপর্যায়ে হাইব্রিডদের জয়জয়কার। নতুন নতুন হাইব্রিড নেতাদের চাপে কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতারা।
দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা বারবার সতর্ক করার পরও কাজে আসেনি। যা নিয়ে তৃণমূল থেকে শুরু করে দলের নেতাদের মাঝে রয়েছে ক্ষোভ। দলীয় নেতাকর্মীদের ক্ষোভের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কঠোর নির্দেশনায় হাইব্রিডমুক্ত হচ্ছে আওয়ামী লীগ। সুদিন ফিরছে দুঃসময়ের কর্মীদের।
একাধিক সূত্র ও স্থানীয় প্রতিনিধি সূত্র মতে, টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এখন হাইব্রিড নেতাদের উর্বর ভূমি। গত দুই মেয়াদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ সহযোগী সংগঠনগুলোতে অনুপ্রবেশ ঘটেছে ভিন্ন মতের মানুষদের।
এদের অধিকাংশ বিগত সময়ে বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী ছিলেন। স্থানীয় সাংসদ ও দলীয় প্রভাবশালী নেতাদের হাত ধরে তাদের আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ ঘটেছে। মূলত দলীয় গ্রুপিংয়ে নিজের বলয়ে শক্তি বাড়াতে বিরোধী শিবিরের লোকজন ভেড়ান তারা।
অনেক ক্ষেত্রে ওইসব ব্যবসায়ী বা ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে দলে ঢুকানো হয়েছে। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগে এসেছেন এমন শিল্পপতিখ্যাত আওয়ামী লীগ নেতাদের দখলে এখন রাজনৈতিক মাঠ। এসব ব্যবসায়ী নেতারা এখন দলের জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদে আসীন।
স্থানীয় সাংসদ ওই ব্যবসায়ী নেতার অফিস ও বাসায় নিয়মিত যাতায়াত করে থাকেন। যার বদৌলতে ওইসব হাইব্রিড নেতারাই স্থানীয় আওয়ামী লীগের কর্তা-ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছে। সারা দেশের প্রায় প্রতিটি সংসদীয় আসনজুড়েই এমন অবস্থা বিরাজ করছে। বিগত সময়ে সরকারবিরোধী বিভিন্ন নাশকতা মামলাসহ আ.লীগ কর্মী হত্যামামলার আসামিও রয়েছে।
নব্য ও হাইব্রিড আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডে বারবার বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হয় সরকারকে। আওয়ামী লীগ থেকে সরে যাচ্ছে মূলধারার ত্যাগী নেতাকর্মীরা। যার কারণে ভবিষ্যতে বড় ধরনের মাসুল দিতে হতে পারে দলটিকে।
আওয়ামী লীগ সূত্র মতে, গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ২১তম জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে সম্মেলনের মাধ্যমে বিতর্কমুক্ত তৃণমূল গঠনের নির্দেশ দেন। যত দ্রুত সম্ভব ছদ্মবেশী ওইসব অনুপ্রবেশকারীদের সঙ্গ ত্যাগ করে নিজ দলের কর্মীদের মূল্যায়ন করতে দলীয় সাংসদ ও নেতাদের নির্দেশ দেন। সম্মেলনের পূর্বে ৩১ জেলা ও বেশকিছু উপজেলা কমিটির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হয়।
পরবর্তীতে সম্মেলন হওয়া অধিকাংশ জেলা কমিটি কেন্দ্রে পাঠানো পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে অনুপ্রবেশকারীদের স্থান দেয়ার অভিযোগ উঠে। যা নিয়ে ক্ষুব্ধ হন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। কমিটিগুলো পুনরায় গঠন করার জন্য ফেরত পাঠানো হয়।
গত ৩ অক্টোবার দলের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে হাইব্রিড, অনুপ্রবেশকারী ও দলের দায়িত্বশীল পদ-পদবিতে থেকে যারা নানামুখী অপরাধের সাথে যুক্ত তাদের বাদ নিয়ে শক্তিশালী তৃণমূল গঠনে কেন্দ্রীয় নেতাদের কঠোর নির্দেশনা দেন।
একই সাথে তৃণমূল পর্যায়ের ত্যাগী, পরিশ্রমী এবং দুর্দিনে বিরোধী শিবিরের আন্দোলন-সংগ্রামে যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছেন, নতুন কমিটিতে তাদের অন্তর্ভুক্তির নির্দেশনা দেন।
একই সঙ্গে যেসব জেলা-উপজেলায় মেয়াদোত্তীর্ণ সেগুলো সম্মেলনের মাধ্যমে মাইম্যানদের (ব্যক্তিবলয়) বাদ দিয়ে দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের স্থান দিতে কঠোর অবস্থানের কথা জানান।
পাশাপাশি করোনা সংকটে যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন তাদেরও দলে ঠাঁই দিতে বলেন। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে গঠন করা হয় বিভাগীয় সাংগঠনিক কমিটি।
সূত্র মতে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর গঠিত কমিটিগুলো তৃণমূল গঠনে কাজ শুরু করেছে। প্রতিনিয়ত জেলা-উপজেলা পর্যায়ে মোবাইল ফোন ও ভার্চুয়াল মাধ্যমে নির্দেশনা দিচ্ছেন। আগামী নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে তৃণমূল সফর শুরু করবেন। আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে সম্মেলন হওয়া জেলাগুলোর বিতর্কমুক্ত পরিচ্ছন্ন কমিটি গঠন সম্পন্ন করার টার্গেট নিয়েছেন সাংগঠনিক নেতারা।
সূত্র আর জানায়, প্রধানমন্ত্রীর কড়াকড়ি নির্দেশনার জেলাপর্যায়ের দুঃসময়ের নেতাকর্মীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ ও সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
খুলনা বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক বলেন, নেত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী সম্মেলন হওয়া জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের কাজ চলছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কমিটি জমা দেয়া হবে। এরপর যেসব জেলা-উপজেলায় মেয়াদ উত্তীর্ণ সেগুলো সম্মেলন করে শক্তিশালী তৃণমূল প্রতিষ্ঠা করা হবে।
চট্টগ্রাম বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন বলেন, ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের সমন্বয়ে তৃণমূল গঠনে কেন্দ্র সতর্ক। ইতোমধ্যে নেত্রী সবাইকে সতর্ক করেছেন। কোথাও ভিন্নপন্থিদের জায়গা হবে না, সেটা বাস্তবায়নে আমরা কাজ করছি।
সিলেট বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম শফিক বলেন, সিলেট বিভাগের সম্মেলন হওয়া জেলাগুলোর কমিটি শতভাগ বিতর্কমুক্ত করার জন্য আমরা কাজ করছি। যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে সফর শুরু করবো। দলের জন্য যারা নিবেদিত তাদের কমিটিতে স্থান দেয়া হবে।
আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রেসিডিয়াম সদস্য কর্নেল (অব.) ফারুক খান এমপি বলেন, তৃণমূলের সাংগঠনিক কার্যক্রম বৃদ্ধি করতে বিভাগীয় টিম কাজ করছে। দুর্দিনে যারা দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের দলে স্থান দেয়া হবে, এটা নেত্রীর বার্তা এবং সেটাই হবে।