আকাশবার্তা ডেস্ক :
মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান মেজবাহ উদ্দিন। আর মধ্যবর্তী পরিবারের সংকট, টানাপড়েন কেমন হতে পারে তা মোটামুটি সবারই জানা। টানাপড়েনের মধ্যেও লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম বালুরচরের এক মায়ের স্বপ্ন ছিলো তার ছেলেকে বানাবেন বিসিএস ক্যাডার। যে স্বপ্ন পূরণের জন্য হাঁস-মোরগ কিংবা ডিমসহ ধান বিক্রির টাকাও না খেয়ে পাঠিয়েছেন ছেলেকে।
নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ছেলেও স্নাতক শেষে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতোকোত্তর পড়ছিলেন ঢাকা কলেজে। এরই মধ্যে বছর দুয়েক হলো ছেলেকে একা রেখে বিসিএস ক্যাডার বানানোর স্বপ্নে বিভোর সেই মা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। ছেলেকে বিসিএস ক্যাডার বানিয়ে যেতে পারেননি তাতে কী হয়েছে, ওপার থেকে মা ঠিকই অপলক চেয়ে আছেন তার স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে ছেলের নিরন্তর ছুটে চলার দৃশ্য। স্বপ্ন পূরণের জন্য মায়ের ত্যাগ কখনো বৃথা যেতে পারে না— এমনটাই হয়তো ভাবছেন ওপারে থাকা মা। যে মা না খেয়ে জমানো অর্থ লক্ষ্মীপুর থেকে পাঠিয়েছেন ঢাকায়, ছেলে না খেয়ে থাকবে এমন শঙ্কায়।
মায়ের সেই স্বপ্ন পূরণ করাই হয়ে ওঠে ছেলে মেজবাহরও একমাত্র লক্ষ্য। মায়ের স্বপ্ন যে তাড়া দিচ্ছে মেজবাহকে দিন শেষে হয়তো তা বাস্তবেও রূপ নিতে পারতো। কিন্তু যেখানে রাজধানীর মগবাজারে অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ের মতো ভয়ংকর ক্রসিং রয়েছে সেখানে কখন যে কার স্বপ্ন কাটা পড়ে তা বলা মুশকিল। তেমনি আজ শনিবার বিকালে কাটা পড়ে ওপার থেকে অপলক চেয়ে থাকা মায়ের সেই স্বপ্নও। মেজবাহও তার মায়ের কাছে চলে গেলো পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিয়ে। রয়ে গেছে তার স্মৃতি ও মায়ের স্বপ্ন পূরণের অসমাপ্ত সে গল্প। যে গল্পের কথা বলতে গিয়েই অশ্রু যেনো বাধ মানছে না মেজবাহর সহপাঠীদের। তাদের মধ্যে একজন ঢাকা কলেজ সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মাহমুদুল হাসান।
মাহমুদুল হাসান বলেন, আমাদের ব্যাচের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রটিই ছিল মেজবাহ। গোটা ক্যাম্পাস মাতিয়ে রাখতো সবসময়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র মেজবাহর এমন মৃত্যু আমরা কখনোই আশা করিনি। মেজবাহ প্রথম এবং দ্বিতীয় বর্ষ এবং সম্মিলিত রেজাল্টেও ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট ছিলো।
সবশেষ র্যাগ ডে উদযাপনেরও আয়োজক ছিলো মেজবাহ। কবে না কবে দেখা হবে বন্ধুদের সঙ্গে এ জন্য প্রত্যেককেই সে ফোন করে র্যাগ ডে-তে থাকার জন্য। মেজবাহই আমাদের একমাত্র সহপাঠী যে করোনার মধ্যে নিজেই উদ্যোগ নিয়ে আমাদের সমস্যাগ্রস্ত বন্ধুদের জন্য ফান্ড গঠন করে এবং আমাকে (সভাপতি মাহমুদুল) ফোন করে ফান্ড গঠনের পরিকল্পনা করে। শেষ পর্যন্ত ১০-১৫ করোনার প্রভাবে সমস্যাগ্রস্ত বন্ধুকে আমরা সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত সহযোগিতাও করতে পেরেছিলাম। মেজবাহ নিয়মিত ক্লাসের জন্য সহপাঠীদের হাতে ধরে ক্লাস রুমে নিয়ে যেতো।
কমলাপুর রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিব উদ্দিন বলেন, মগবাজারে ট্রেনে কাটা পড়ে মেজবাহ উদ্দিনের (২৫) মৃত্যু হয়েছে। আজ বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে মগবাজার রেলক্রসিংয়ে কমলাপুরগামী একটি ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
পুলিশকে মেজবাহর পরিবারের সদস্যরা জানান, মেজবাহ ঢাকা কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে মাস্টার্সে পড়তেন। তাদের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার বালুরচর গ্রামে। তার বাবার নাম আব্দুল ওয়াদুদ। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।