আকাশবার্তা ডেস্ক :
মুক্তিযুদ্ধের সময় যেসব দেশ প্রথমদিকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে চিঠি দিয়েছিল, ইসরায়েল তার মধ্যে অন্যতম। সে সময়ে ভুটান, ভারতের স্বীকৃতি গ্রহণ করা হলেও ইসরায়েলকে প্রত্যাখ্যান করে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার। ইসরায়েল মূলত প্রথম ১৯৭১ সালে ২৮ এপ্রিল এক চিঠি পাঠিয়ে বাংলাদেশকে সমর্থন করে অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করতে চেয়েছিলো। কিন্তু মুজিবনগর সরকার তা গ্রহণ না করে ফিরিয়ে দেয়।
এরপর ১৯৭২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার প্রস্তাব করেছিল। তখন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার লিখিতভাবে ইসরায়েলের স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যান করে।
এখানে ইসরায়েলের অবস্থানটা ছিল ডাবল স্ট্যান্ডার্ড। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়; কিন্তু ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা স্বীকার করে না। বঙ্গবন্ধু তা মেনে নেননি। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খোন্দকার মোশতাক আহমেদ ইসরায়েলকে জানিয়ে দেন, বাংলাদেশ ইসরায়েলের স্বীকৃতি গ্রহণ করবে না।
সে সময়ে বাংলাদেশ ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে দৃঢ় সমর্থন দিয়ে আসছিল। ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ফিলিস্তিনকে সমর্থন করে মেডিকেল টিম ও ত্রাণ সহায়তা পাঠিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সহায়তা করে বাংলাদেশ।
১৯৮০ সালে বাংলাদেশ একটি স্মারক ডাকটিকিট উন্মোচন করে, যেখানে একজন ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাকে দেখা যায়, যার পেছনে রয়েছে কাঁটাতারে ঘেরা আল-আকসা মসজিদ। সেখানে আরবি ও ইংরেজিতে ফিলিস্তিনি যোদ্ধার সাহসিকতার কথা বলা হয়েছে।
মনে করা হয়, মুক্তিযুদ্ধের প্রথমদিকে বাংলাদেশকে ইসরায়েলের সমর্থন করার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল ছয়দিনের যুদ্ধে ফিলিস্তিনের পক্ষে পাকিস্তানের ভূমিকা। তখন বাংলাদেশও ছিল পাকিস্তানের অংশ। সেই যুদ্ধে বাংলাদেশি বৈমানিক সাইফুল আজম ইসরায়েলের সর্বোচ্চ সংখ্যক জঙ্গিবিমান ভূপাতিত করে বিশ্বরেকর্ড তৈরি করেন।
বাংলাদেশ হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র রাষ্ট্র, যার সঙ্গে ইসরায়েলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ- সব ধরনের বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা আছে। অথচ এই দুই দেশই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ নৈতিকভাবে ইসরায়েল রাষ্ট্রকে স্বীকার করে না। এইজন্য কোনও কূটনৈতিক সম্পর্কও নেই।
জাতিসংঘের যে কয়টি সদস্য দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের কোনও কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, বাংলাদেশ তার একটি। ওই দেশটিতে ভ্রমণের ব্যাপারেও বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা আছে। ২০০৩ সালে সালেহ আহমেদ নামের এক বাংলাদেশি সাংবাদিক ইসরায়েলে প্রবেশের চেষ্টা করলে তাকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।
বাংলাদেশ মূলত একটি সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র দাবি করে এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অবৈধ দখলদারিত্বের অবসান চায়। এমনকি বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে সম্প্রতি ফিলিস্তিনের হেবরনে বঙ্গবন্ধুর নামে একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে। ইসরায়েল অবশ্য বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী।
২০১১ সালে জেরুজালেম পোস্টকে ইসরায়েল সরকারের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের কোনও সংঘাত নেই। আমরা আলোচনা চাই। বাংলাদেশের ধর্মীয় মনোভাবসম্পন্ন নাগরিকদের পবিত্র ভূমি জেরুজালেম ভ্রমণের আহ্বান জানাই।’ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর জবাবটা দিয়েছেন ২০১৪ সালে। তিনি বলে দেন, ‘আমরা সব সময়ই ফিলিস্তিনিদের পক্ষে আমাদের সমর্থন অব্যাহত রেখেছি। তাদের ভূমিতে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।’
এছাড়া ২০০৬ সালে লেবাননের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীকে সহায়তার জন্য সেনাবাহিনীর একটি ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটেলিয়ন পাঠানোর প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু ইসরায়েল তা প্রত্যাখ্যান করে, যেহেতু বাংলাদেশ তাদের স্বীকৃতি দেয়নি। অবশ্য শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলকে উপেক্ষা করেই দক্ষিণ লেবাননে সেনা পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ।