আকাশবার্তা ডেস্ক :
বাবাকে ছাড়া দুই বছর পার করে ফেলেছে নয় বছরের আনিশা। ঠিক দুই বছর আগে তার বাবা কাঠ ব্যবসায়ী ইসমাঈল হোসেনকে অজ্ঞাত পরিচয়ধারী কয়েকজন তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ নেই।
বাবার কথা স্মরণ করে আনিশা বলছিল, ‘আমার ভাই তখন আরও ছোট ছিল। ও ঘুমাতে পারত না। আম্মু সারাদিন কান্নাকাটি করত। রাতে ভাই না ঘুমালে আম্মু বলত ঘুমিয়ে যাও। বাবা আসবে। দেখবা কলিং বেল বাজাচ্ছে।’
কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে আনিশা। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করে সে বলে, ‘আপনি একবার দেখেন। আমরা কেউ মিথ্যা বলিনি। আমার আব্বুকে ফিরিয়ে দেন। আব্বু ছাড়া আমরা কীভাবে থাকব।’
আনিশা আরও বলে, ‘আব্বু হারিয়ে যাবার পর ছোট ভাই দুইমাস ঘুমাতে পারে নাই। আম্মু কিছু বলতে পারত না। শুধু বলতো, ঘুমাও আব্বু এসে কলিং বেল বাজাবে। এভাবে তো দুই বছর পার হয়ে গেছে কিন্তু আব্বু তো কলিং বেল বাজায় না।’
শুধু আনিশা নয়, একই আকুতি সাথিকারও। সে-ও এসেছে বাবাকে ফিরে পাওয়ার দাবি জানাতে। প্রথম শ্রেণিতে পড়া সাথিকার বাবা মো. সোহেল ৮ বছর আগে গুম হয়েছেন। এখনো তার খোঁজ পায়নি পরিবার।
সাথিকা বলে, ‘আমি তো জানিই না আব্বু কীভাবে হারিয়ে গেছে। আমি অনেক ছোট ছিলাম। আম্মু বলত আব্বু বিদেশ গেছেন। আমার জন্য অনেক খেলনা নিয়ে আসবেন। কিন্তু আব্বু এখনো খেলনা আনে নাই। কথাও বলিনি আব্বুর সঙ্গে। আম্মু কিছু আর বলে না।’
বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর ছেলে আবরার ইলিয়াস বলেন, টিপাইমুখ বাঁধের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে আমার বাবা ও তার গাড়িচালক গুম হন। এখন পর্যন্ত তাদের খোঁজ পাওয়া যায়নি। এ অন্যায়ের প্রতিকার পেতে হলে সরকারের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
তারা সবাই এ কথাগুলো বলছিল শুক্রবার (২৮ মে) জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গুম হওয়া ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত আন্তর্জাতিক গুম সপ্তাহ উপলক্ষে সমাবেশে।
অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, যারা গুম হয়, তারাই জানে এর কী কষ্ট। যারা ক্ষমতায় আছে তারা সেটি অনুমান করতে পারবেন না। যতবারই এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে ততবারই আমি এসেছি। প্রত্যেকবারই হৃদয় বিদারক দৃশ্য দেখতে হয়েছে। প্রতিবছরই বুক চাপড়ে গুম হওয়াদের ফিরে পাওয়ার আর্জি জানিয়েছেন স্বজনরা। তারা প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, আমরা আমাদের স্বজনদের খবর জানতে চাই।
তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে যখন গুম নিয়ে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি বলেন আমাদের দেশে গুম, খুন বলে কিছু নেই। আমাদের দেশের কিছু মানুষ জমিজমা নিয়ে বিরোধ, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায়। এগুলো নিয়েই সবাই কথাবার্তা বলে। তার এ বক্তব্যের ধিক্কার জানাই আমরা। এ সরকার মানবিক সরকার নয়। মানুষ মরে যায় রাস্তায় গাড়ি চাপা পড়ে কোনো রকম দুঃখ প্রকাশ করে না। এখানে প্রস্তাব রাখতে চাই, একদিন কোথাও কয়েক ঘণ্টা অবস্থান নিন। ঢাকাবাসীকে বলেন, আমাদের হারানো স্বজনদের ফিরে পেতে একাত্মতা ঘোষণা করেন। সরকারকে এভাবে চাপ দিতে না পারলে কোনো কাজে আসবে না।
সমাবেশে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, এখানে অনেকে আমাদের সঙ্গে রয়েছে, যারা জানে না তাদের স্বজনরা কোথায়। নিখোঁজদের খোঁজে বের করার কোনো উদ্যোগ নেই। যে মানুষের মাঝে এ ধরনের শূন্যতা রয়েছে, তা কীভাবে সরকার পূর্ণ করবে?
ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, এটা আমাদের দুর্ভাগ্য যে স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসেও নিখোঁজদের ছবি নিয়ে রাস্তায় দাঁড়াতে হয়েছে। শুধুমাত্র ভিন্নমত ও রাজনীতির কারণে তাদের গুম করা হয়েছে। বিরোধীদলের মনোভাব ভেঙে দিতে এমন করা হয়েছে। শুধু গুম, খুনেই শেষ নয়, তাদের ধরে নিয়ে রিমান্ড দিয়ে ‘আর রাজনীতি করবি না বলে স্বীকারোক্তি নিচ্ছে’। ‘এবার কম দিয়েছি এরপর এলে আরও বেশি দেবো’ এ রকম কথাও বলা হয়।
তথ্য সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ।