বিনোদন ডেস্ক :
২০০০ সালে একটি ফ্যাশন ম্যাগাজিনে দেখা গেলো মিষ্টি এক নবাগত মেয়ের ছবি। কেউ কেউ তাকে ভারতীয় অভিনয় শিল্পী ঐশ্বরিয়ার সঙ্গেও তুলনা করতো। দুচোখে বিশ্ব জয়ের স্বপ্ন নিয়ে সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। সৈয়দা তানিয়া মাহবুব তিন্নি, আলো ঝলমলে দুনিয়ায় তিন্নি নামেই পরিচিত ছিলেন তিনি।
তিন্নির জনপ্রিয়তা যখন তুঙ্গে, সেই সময় তিনি বিবাহবন্ধনে আবব্ধ হন শাফকাত হোসেন পিয়ালের সাথে। মিডিয়া স্বীকার না করলেও কন্যা সন্তানের মাও হন তিনি। কিন্তু তিন্নির সংসারে ঝড় হয়ে আসে পিয়ালের বন্ধু সাবেক ছাত্রনেতা তৎকালীন এমপি মো. গোলাম ফারুক অভি।
তিন্নির সঙ্গে অভির পরিচয় হওয়ার পরই তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি হয়। তারা দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ান। অভির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তিন্নির সঙ্গে স্বামী শাফকাত হোসেন পিয়ালের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ২০০২ সালের ৬ নভেম্বর অভি নিজে তিন্নি ও তার স্বামী পিয়ালের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটান। এমনকি তিন্নির দেড় বছরের শিশুকন্যাসহ পিয়ালকে বাসা থেকে বের করে দেন অভি। অভি ওই বাসায়ই অবস্থান নেন। এ সময় তিন্নি বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকেন অভিকে। অভি তাকে বিয়ে করবেন বলে আশ্বাস দিতে থাকেন ঠিকই কিন্তু কবে করবেন, তা স্পষ্ট ভাবে কখনো তিন্নিকে বলেননি। পিয়ালের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি ও তিন্নির সঙ্গে অভির সম্পর্কের বিষয়টি জানাজানি হতে থাকে। এ সময় তিন্নির সঙ্গে অভির সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে। বিয়ে নিয়ে তাদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ হতে থাকে। অভির কথা মিডিয়াকে জানিয়ে দেবে বলে তিন্নি হুমকি দেয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে অভি। এরপরই হত্যার পরিকল্পনা।
পুলিশের তদন্ত থেকে জানা যায়, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী অভি ২০০২ সালের ১০ নভেম্বর সন্ধ্যার পর তিন্নিকে মাথায় আঘাত করে হত্যা করেন। লাশ গুম করার জন্য গাড়িতে করে নিয়ে বুড়িগঙ্গা সেতু থেকে ফেলে দেন। তখন লাশটি পিলারের উঁচু জায়গায় পড়ে থাকে।
১১ নভেম্বর, ২০০২ সাল। সকাল ৮টা। বুড়িগঙ্গা নদীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর নিচে পিলারের উঁচু জায়গায় অজ্ঞাতনামা এক তরুণীর লাশ দেখতে সেখানে মানুষের ভিড় বাড়ছে।পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। সুরতহাল রিপোর্ট তৈরির সময় পুলিশ লাশের শরীরের বিভিন্ন অংশে থেঁতলানো জখম দেখতে পায়। মাথার খুলিতে ভোঁতা অস্ত্রের আঘাত ছিল। আঘাতের চিহ্ন দেখে পুলিশ নিশ্চিত হয়, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
কেরানীগঞ্জ থানার এএসআই শফিউদ্দিন ওইদিন দুপুরে একটি হত্যা মামলা করেন। তবে সে মামলায় কাউকে আসামি করা হয়নি। মামলায় বলা হয়, আগের দিন রাতের আঁধারে অজ্ঞাতনামা তরুণীকে হত্যা করে লাশ গোপন করার জন্য বুড়িগঙ্গা সেতুর নিচে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
ময়নাতদন্ত শেষে দাবিদার না থাকায় মর্গেই পড়ে থাকে লাশটি। ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত কোনো দাবিদার না আসায় লাশটি আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেই দিনই লাশটি দাফন হয়ে যায়।
এদিকে ১০ নভেম্বর থেকে তিন্নি নিখোঁজ হলে তার আত্মীয়স্বজনরা খোঁজখবর নিতে থাকে। এরই মধ্যে দুবার পত্রিকায় লাশ উদ্ধার ও দাফনের সংবাদ প্রকাশ হয়। পত্রিকায় ছবি দেখে তিন্নির চাচা সৈয়দ রেজাউল করিম লাশটি শনাক্ত করেন। পরে ২১ নভেম্বর লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে ফের ময়নাতদন্ত করা হয়।
অন্যদিকে, পত্রিকায় তিন্নির ছবি প্রকাশের পরই অভি গা ঢাকা দেন। তার আগ পর্যন্ত অভি ছিলেন প্রকাশ্যেই।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, আলোচিত তিন্নি হত্যা মামলার তদন্ত করতে যেয়ে পুলিশ ও গোয়েন্দারা বিভিন্ন স্থানে গিয়েছেন। তিন্নিদের বাসায় প্রতিদিনের আড্ডায় যারা আসতেন তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশ জেলখানায় আটক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের সঙ্গেও কথা বলেছে। ইমন এই ঘটনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয় পুলিশকে।
তবে এক সময়ের আলোচিত-সমালোচিত ছাত্রনেতা গোলাম ফারুক অভি এখন কোথায়?
দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় আগে দেশত্যাগ করা সাবেক এই এমপিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কোনো খবরেই। দেখাও মিলছে না কোথাও। মামলার অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, অভি এখন কানাডায় রয়েছেন। রাজধানীর রমনা থানায় দায়ের করা ১৯৯২ সালে একটি অস্ত্র মামলার ১৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ডের রায়ের পর হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে তিনি দেশ থেকে পালিয়ে যান। ২০০৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলার ঘটনায় রেড অ্যালার্ট নোটিস জারি করা হয়। ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাকে দেশে আনার চেষ্টাও করা হয়।
২০০২ সালের ১০ই নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডটি একটা বড় সময় ধরেই দেশে আলোচনার শীর্ষে ছিল। ঘটনাটির খুঁটিনাটিও ছিল টক অব দা কান্ট্রি। লাপাত্তা অভি কিংবা মামলাটি এখনও বারবার আলোচনায় ওঠে আসছে। ১৯ বছর পেরিয়ে গেলেও চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের বিচার আজও সম্পন্ন হয়নি।
১৯ বছর আবারও আলোচনায় এসেছে তিন্নি হত্যাকাণ্ড। বলা হচ্ছে, মুক্তির অপেক্ষায় থাকা শিহাব শাহিনের সিরিজ মরীচিকায় দেখা যাবে তিন্নি হত্যা রহস্যের আদ্যোপান্ত। যদিও এই বিষয়ে কিছু নিশ্চিত করেননি সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি ঢাকাই সিনেমার জনপ্রিয় নায়িকা পরীমনির ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টা ঘটনা সামনে আসার পর মডেল তিন্নির ঘটনা আবারও আলোচনায় এসেছে। অনেকে বলছেন পরীমনি সোচ্চার না হলে তার অবস্থাও তিন্নির মতোই হতো।
আলো আর খ্যাতির দুনিয়ায় শত শত তারকা তৈরি হন আবার প্রতিদিন ঝড়েও পড়েন। কেউ কেউ আবার ক্ষমতা আর অর্থের বলি হয়ে অকালেই প্রাণ হারান। কোনো গল্প আমরা জানতে পারি, কোনোটা অজানাই থেকে যায়। একসময় যারা দর্শকদের মুখে হাসি ফোটান, আনন্দ দেন, তারাই একদিন দুভাগ্যের পরিহাসে হারিয়ে যান চিরতরে। তেমন ভাবেই হারিয়ে গেছেন মডেল তিন্নি। আজ এতো তারার মাঝে অনেকের কাছেই হয়তো নামটি অজানা। কিন্তু নব্বই দশকের অনেক দর্শকের স্মৃতিতেই গেঁথে আছে তিন্নির সেই মিষ্টী হাসি।