শনিবার ১৪ই মার্চ, ২০২৬ ইং ৩০শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সিস্টার হেলেনা নামা!

আকাশবার্তা ডেস্ক : 

হেলেনা জাহাঙ্গীর নামটি রাতারাতি পরিচিতি পেয়েছে দেশ বিদেশে। কখনো সাংবাদিক বা উপস্থাপক, কণ্ঠশিল্পী কখনো ব্যবসায়ী আবার কখনো রজনৈতিক দলের নেতা। উত্থানটা ব্যবসা দিয়ে শুরু হলেও তার পতন হয়েছে অপরাজনীতির মধ্য দিয়ে। পতনের শুরুটা সামাজিক মাধ্যমের পোষ্টকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশ আওয়ামী চকরিজীবী লীগ নামে একটি  অনিবন্ধীত সংগঠনের নামে দেশ বিদেশে কমিটি ও পদ  বিক্রির প্রচারণার পরই শুরু তার পতন। 

প্রথমে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করায় আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য পদ থেকে হেলেনা জাহাঙ্গীরকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে ছবি প্রকাশের পর আগুনে ঘি ডালে নেটিজেনরা।

হেলেনা জাহাঙ্গীরের জন্ম ১৯৭৪ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার তেজগাঁওয়ে। উইকি ফ্যাক্টসাইডার নামের একটি ওয়েবসাইটে তার পেশা হিসেবে অ্যাংকর বা উপস্থাপক উল্লেখ করা হয়েছে। হেলেনার স্বামী জাহাঙ্গীর আলম একজন ব্যবসায়ী। ১৯৯০ সালে তারা বিয়ে করেন। তিনি তিন সন্তানের জননী।

হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাবা মরহুম আবদুল হক শরীফ ছিলেন জাহাজের ক্যাপ্টেন। সেই সূত্রে জন্ম কুমিল্লায় হলেও হেলেনা জাহাঙ্গীরের বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামের হালিশহরের মাদারবাড়ী, সদরঘাট এলাকায়। পড়াশোনা স্থানীয় কৃষ্ণচূড়া স্কুলে।

এফবিসিসিআই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একাধিক গণমাধ্যমকে হেলেনা জাহাঙ্গীরের দেয়া সাক্ষাৎকার সূত্রে জানা যায়, বিয়ের সময় স্বামী জাহাঙ্গীর আলম নারায়ণগঞ্জের একটি প্রতিষ্ঠিত পোশাক কারখানার জিএম পদে চাকরি করতেন। পাশাপাশি সিএন্ডএফ এজেন্ট ব্যবসার সঙ্গেও সংশ্লিষ্টতা ছিল।

তবে গৃহিণী হিসেবে বসে না থেকে পড়াশোনা শেষ করে হেলেনা জাহাঙ্গীর শুরুতে চাকরির চেষ্টা করেন। বিভিন্ন জায়গায় চাকরির জন্য ইন্টারভিউও দিয়েছেন তিনি। একদিন চাকরি খোঁজার সূত্র ধরে চলে যান স্বামী জাহাঙ্গীর আলমের অফিসে। সেখানে স্বামীর অফিস কক্ষ দেখে তিনি ঠিক করেন নিজেই উদ্যোক্তা হওয়ার। স্ত্রীর প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান স্বামী জাহাঙ্গীর আলম।

বিয়ের ছয় বছর পর ১৯৯৬ সালে রাজধানীর মিরপুর ১১ তে একটি ভবনের দুটি ফ্লোর নিয়ে তিনি শুরু করেন প্রিন্টিং ও অ্যামব্রয়ডারি ব্যবসা।

ফেসবুকে বেশ সক্রিয় হেলেনা জাহাঙ্গীর মূলত একজন নারী উদ্যোক্তা হলেও কিছুদিন ধরে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মনোনয়ন পাননি। সম্প্রতি কুমিল্লা-৫ আসনের উপনির্বাচনেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন কিন্তু মনোনয়ন পাননি।

কুমিল্লার মেয়ে হেলেনা জাহাঙ্গীরে ব্যবসায়ী হিসেবে উত্থান খুব বেশিদিন আগের নয়। অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় বিয়ে হয়ে যায় তার। হেলেনার নামের সঙ্গে যুক্ত হয় জাহাঙ্গীর। বিয়ের পর শেষ করেন স্নাতকোত্তর। এরপর উদ্যোক্তা হিসেবে পথ চলা শুরু।

জানা গেছে, হেলেনা জাহঙ্গীর প্রিন্টিং, অ্যামব্রয়ডারি, প্যাকেজিং, স্টিকার এবং ওভেন গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। জয়যাত্রা গ্রুপের আওতায় এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি। সব মিলিয়ে ১০ হাজারেও বেশি কর্মী আছে তার এসব প্রতিষ্ঠানে।

হেলেনা জাহাঙ্গীর ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সদস্য ও নির্বাচিত পরিচালক। এ ছাড়া তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএরও সক্রিয় সদস্য তিনি। ‘জয়যাত্রা’ নামে একটি অবৈধ আইপি টিভির মালিক তিনি।

হেলেনা জাহাঙ্গীরের প্রায় ডজনখানেক ক্লাবে আসা যাওয়া ছিল। তিনি সবগুলো ক্লাবের সদস্য না হয়েও ক্লাবের সদস্যদের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রে সেখানে যেতেন। সেখানে তিনি অবৈধভাবে মদ পান করতেন।

ক্লাবগুলো হলো, কুমিল্লা ক্লাব, গুলশান অল কমিউনিটি ক্লাব, বিজিএমইএ অ্যাপারেল ক্লাব, বোট ক্লাব, গুলশান লেডিস ক্লাব, উত্তরা লেডিস ক্লাব, গুলশান ক্লাব, গুলশান সোসাইটি, বনানী সোসাইটি, গুলশান হেলথ ক্লাব, গুলশান নর্থ ক্লাব ও বারিধারা ক্লাব।

সাংবাদিকদের অভিযোগ ছিল, আইপি টিভি জয়যাত্রাতে কাজ করতে হলে টাকা দিয়ে আইডি কার্ড নিতে হতো। এতে সংবাদ প্রচার করতে হলেও টাকা গুনতে হতো সাংবাদিকদের।

দলীয় নেতা কর্মীদের অনেকেই বলেছেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় হেলেনা জাহাঙ্গীর সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি আন্দোলনকারীদের খাবার সরবরাহসহ নানা তৎপরতায় যুক্ত ছিলেন।

দল থেকে বিহিস্কারের পর সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক লাইভে এসে অনেকের নামে আপত্তিজনক কথা বলার পর আবারও আলোচনার ঝড় তুলেন হেলেনা। এই ঘটনার পর বৃহস্পতিবার (২৯ জুলাই) রাত ৮টার পর হেলেনা জাহাঙ্গীরের গুলশানের বাসভবনে অভিযান শুরু করে র‌্যাব সদস্যরা। এ সময় তার বাসা থেকে ক্যাসিনো খেলার সরঞ্জাম, বিপুল পরিমাণ মাদক, একটি হরিণের চামড়া, একটি বন্য পশুর চামড়া, ১০ ধরনের বিদেশি চাকু, বিপুল সংখ্যক বিদেশি মুদ্রা, দুটি ওয়াকিটকি ও একটি লাল রঙের লাগেজ ভর্তি অবৈধ জিনিস উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় রাতেই তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। পরে গভীর রাতে তার জয়যাত্রা আইপি টিভি ও জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন ভবনেও অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে অবৈধ আইপি টিভির সরাঞ্জামসহ বেশ কিছু নথি উদ্ধার করে র‌্যাব সদস্যরা।

র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেছেন, সম্প্রতি আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য পদ থেকে অব্যাহতি পাওয়া হেলেনা জাহাঙ্গীর জয়যাত্রা টেলিভিশনে কর্মী/সাংবাদিক নিয়োগের নামে চাঁদাবাজি ও প্রতারণা করতেন। এ ধরনের একটি চাঁদাবাজি সংক্রান্ত ফোনালাপ ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন আইনে পাঁচটি মামলার প্রস্তিতি নিচ্ছে প্রশাসন। ইতোমধ্যে রাজধানীর গুলশান থানায় দায়ের করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় শুক্রবার (৩০ জুলাই) পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে হেলেনাকে আদালতে হাজির করা হলে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে র‌্যাব।

রাজনীতির পবিত্র জায়গাকে হেলেনা, পাপিয়া ও শাহেদেরমতো মুখোশধারীরা প্রতিনিয়ত রাজনীতির আশ্রয় নিয়ে নান অপকর্ম করে দেশ ও দলকে প্রশ্নবৃদ্ধ করে। এদর মতো মুখোশধারীরা রাজনীতিতে আসেই কেবল রাজনীতিকে ব্যবহার করতে। রাজনৈতিক দলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা মনে করেন এরা রাজনীতিতে আসে রাজনীতিকে ধর্ষণ করতে।

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

মার্চ ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« ফেব্রুয়ারি    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১