আকাশবার্তা ডেস্ক :
তিন রোগে আক্রান্ত বিএনপি! আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগেই তা সারতে হবে। চিকিৎসা ব্যতীত আবারো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে বিএনপিকে দীর্ঘস্থায়ী ঝুঁকিতে পড়তে হবে। দুই দফায় ছয় দিনের সিরিজ বৈঠকে এমন দাবি উঠে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মুখোমুখি হয়ে দলটির শীর্ষ নেতারা বলেন, আগামী নির্বাচন কার অধীনে হবে; কার নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা হবে তা আগেই ঠিক করতে হবে। মাঠের নেতাদের কাছে ম্যাসেজ দিতে হবে। করণীয় জানিয়ে দিতে হবে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কোনোভাবেই নির্বাচনে যাওয়া যাবে না। নির্বাচনের আগেই বিএনপিকে জনগণের কাছে যোগ্যতার পরীক্ষা দিতে হবে। যদি আবারো আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচন হয় তাহলে সেই নির্বাচনে কোনোভাবেই অংশগ্রহণ করা যাবে না। বরং তার আগেই ঠিক করতে হবে শেখ হাসিনার অধীনে যদি নির্বাচন হয় তাহলে বিএনপির আন্দোলনের রূপরেখা কী হবে। জনগণের চাহিদা বিএনপি কীভাবে পূরণ করবে।
গতবারের মতো নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনে যাওয়া এবং মাত্র সাতজন সংসদ সদস্যকে সংসদে পাঠানোর মাধ্যমে দেশের বড় একটি অংশ থেকে বিএনপি অনেক দূরে সরে গেছে। তাই এবার মানুষের চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে হবে, দলের লোকের দিকে খেয়াল রাখতে হবে যাতে ব্যক্তির কারণে বৃহৎ দলের ব্যানারের কোনো ক্ষতি না হয়। অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে আগে দল পরে ব্যক্তির চাহিদা।
দ্বিতীয়ত, জামায়াত নিয়ে এখনই বিএনপিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জামায়াতের কারণে বিশেষ কয়েকটি দেশের কাছে বিএনপি প্রশ্নবিদ্ধ। কূটনৈতিক মিশনে জামায়াতের কারণে বিএনপির গুড লিস্টে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। জামায়াতের বিষয়ে বিএনপির সিদ্ধান্ত কী তা এখনই ঠিক করতে হবে। জামায়াতের সাথে মনোমালিন্য ও কূটনৈতিক মিশন ঠিক করতে নির্বাচনের আগে বিএনপিকে অনেক সময় পার করতে হয়। কখনো আন্দোলন নিয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে আসতে পারে না। আবার কখনো আসন ভাগাভাগি নিয়েও জটিলতা সৃষ্টি হয়।
প্রতি বছরই দলীয় জোটের পক্ষ থেকে ১৭০ থেকে ১৮০টি আসন দাবি করে বসে, যা পূরণ করা বিএনপির পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তাদের খুশি করা বিএনপির পক্ষে সম্ভব হয় না। জামায়াতকে নিয়ে বিএনপির সংসারে সবসময় অশান্তি লেগেই আছে। তাই প্রয়োজনে জামায়াতকে এখনই ত্যাগ করতে দলের বিশেষ একটি অংশ তারেক রহমানের কাছে দাবি জানায়। জামায়াতকে নিয়েই কী বিএনপি নির্বাচনে যাবে নাকি জামায়াত ত্যাগ করে দলকে গুরুত্ব দিয়ে স্বচ্ছতায় নির্বাচনে যাবে?
তৃতীয়ত, আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের আরেকটি অভিযোগ ছিলো ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাওয়া। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে গতবার ড. কামাল হোসেনের কারণে বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতারা কোনো বার্তাই পাননি। সমাবেশগুলো থেকে ড. কামাল হোসেন শেখ মুজিবের গুণগান গেয়েছেন, স্মৃতিচারণ করেছেন। কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষক, জিয়াউর রহমান, বন্দি খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে নিয়ে কিছুই বলেননি। নির্বাচনের আগ থেকে পর পর্যন্ত রহস্যজনক ভূমিকা ছিলো ড. কামালের।
তাই এবার আগেই ঠিক করতে হবে নির্বাচনের আগে-পরে কে বেশি অগ্রাধিকার পাবেন— দলের কেউ নাকি অন্য দল থেকে এসে বিএনপিকে এবারও নির্বাচনি নির্দেশনা দেবে। দল থেকে কাউকে প্রধান ব্যতীত যদি অন্য কাউকে নেতা মেনে নির্বাচনের চিন্তা করে বিএনপি তাহলে তা হবে আত্মঘাতী। তাই বিএনপিকে আগেই নেতা ঠিক করতে হবে। কে দেবে নির্বাচনের আগে-পরে প্রধান নির্দেশনা। দলকে এবং দলীয় জোট অগ্রাধিকার দিয়েই মাঠের ছক আঁকা এ মুহূর্তে জরুরি।
জানা গেছে, ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে দুই দফায় তিন দিন করে ছয় দিনের বৈঠকে প্রায় ৩৫ ঘণ্টা আলোচনা হয়। রুদ্ধদ্বার ওই বৈঠকে ২৮১ জন নেতা বক্তব্য দেন। প্রথম দফায় ১৪ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, দ্বিতীয় দফায় ২১ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর ধারাবাহিকভাবে। এসব বৈঠকে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যসহ দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ৫৮৪ জন সদস্যের মধ্যে ৫২৫ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
এরমধ্যে ৪৫৭ জন বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বক্তব্য রাখেন ২৮১ জন। বৈঠকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এখন ফের আগামী ৮ অক্টোবর বিভিন্ন পেশার নেতাদের সাথে মতবিনিময় করবেন তারেক রহমান। গতকাল রোববার বিকেলে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির ভার্চুয়াল সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, সমপ্রতি অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলো থেকে সব দাবি ও চাওয়া বিচার-বিশ্লেষণ চলছে। সর্বাধিক মতকে অগ্রাধিকার দিয়ে দল থেকে যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে তা নেতাকর্মীদের জানিয়ে দেয়া হবে।
চলমান বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজউদ্দিন আহমেদ আমার সংবাদকে বলেন, “বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়া বোকামি। ছয় বারের এমপি হয়ে আমি নির্বাচনের সময় ঘর থেকে বের হতে পারিনি। ঘোষণা দিতে হবে, হাসিনার অধীনে ‘নো’ নির্বাচন। সংসদ বহাল রেখেও নির্বাচন হবে না।”
তিনি আরও বলেন, ‘জোট ঠিক আছে কিন্তু নির্বাচনি জোটের নেতৃত্বে বিএনপিকে থাকতে হবে। আমাদের কূটনীতি দুর্বল। কেন নির্বাচনে যাবো না— তা বিদেশিদের বোঝাতে হবে।’
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘এই বৈঠক দলে বেশ সাড়া ফেলেছে এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে একটি ইতিবাচক ধারা সৃষ্টি হয়েছে। বৈঠকে নেতারা মূলত বিএনপির চেয়ারপারসনের মুক্তি, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়ে মতামত ও পরামর্শ দিয়েছেন। এখন নীতিনির্ধারণী পর্ষদে বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেয়া হবে। আমাদের আরো কিছু বৈঠকে হবে। সেখান থেকে একটা সিদ্ধান্ত অবশ্যই নেতাকর্মীরা জানতে পারবে। আমাদের আন্দোলন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। আন্দোলনের জন্য অবশ্যই প্রস্তুতি নিতে হবে। এই দানব সরকারকে সরাতে হবে মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য, গণতন্ত্র ও সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য।’
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ।