আকাশবার্তা ডেস্ক :
তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগের প্রাণ! ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বর্তমানে দলে দলে বিভক্তি! এমপি-মন্ত্রী ও প্রভাবশালী নেতাদের স্বার্থরক্ষায় খুনোখুনির শিকার হচ্ছেন কর্মীরা! বিএনপিবিহীন নির্বাচনে নৌকার প্রতিপক্ষ এখন আওয়ামী লীগ! পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিদ্রোহীদের বহিষ্কার করা হচ্ছে। অনেক স্থানে সাংসদরা সরাসরি নৌকার বিরোধিতা করছেন!
তৃণমূলের নেতারা বলছেন, ভোটের মাঠে বিদ্রোহী আওয়ামী লীগের দুর্বলতার প্রকাশ। বিদ্রোহী থাকা দলের নীতি-আদর্শের ওপর আঘাত। ঐক্যবদ্ধ তৃণমূল ভাঙনসৃষ্টির অপচেষ্টা। তৃণমূল আওয়ামী লীগের এই বিভক্তি ক্রমেই প্রকট আকার ধারণ করছে। যা আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন তৃণমূল আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা।
খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতায় নেতায় বিভক্ত হয়ে পড়েছেন তৃণমূল আওয়ামী লীগ অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ, খুনোখুনি, হামলা-পাল্টা হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর হচ্ছে। মামলা হচ্ছে নৌকার কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে।
তৃণমূলের নেতারা বলছেন, ভোটের মাঠে বিদ্রোহী আওয়ামী লীগের দুর্বলতার প্রকাশ। বিদ্রোহী থাকা দলের নীতি-আদর্শের ওপর আঘাত। ঐক্যবদ্ধ তৃণমূল ভাঙন সৃষ্টির অপচেষ্টা। বিদ্রোহী দমনে তৃণমূলের দায়িত্বশীল নেতাদের উদ্যোগ কাজে আসছে না।
তারা আরও বলছেন, দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অবস্থান একদিনে তৈরি হয়নি। স্বাধীনতার আগে-পরে নানামুখী আন্দোলন-সংগ্রাম, জেল-জুলুম, বিরোধীদের অত্যাচার-নির্যাতন ও কর্মীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ আজকের অবস্থানে এসেছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়ন একদিনে হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব আজকের উন্নয়নশীল বাংলাদেশ।
এমন অবস্থানে দাঁড়িয়ে তৃণমূলে বিএনপি-জামায়াতের অনুপ্রবেশ, হাইব্রিড, কাউয়া ও সুবিধাভোগীদের দাপট বাড়ছে। ত্যাগীদের বাদ রেখে সুবিধাভোগীদের নৌকা দেয়া হচ্ছে। অনেক স্থানে সাংসদরা সরাসরি নৌকার বিরোধিতা করছেন। নিজ পরিবারের সদস্যদের দিয়ে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে সাংসদরা রাজনীতির ত্রাণকর্তা হয়ে উঠছেন।
ফলে তৃণমূলের ত্যাগী-পরিশ্রমী ও দুর্দিনের কর্মী-সমর্থকরা ক্রমেই বিভক্ত হয়ে পড়ছেন। এমন অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে দায়িত্বশীল নেতাদের আরও সতর্ক ও সচেতন হবে বলে মনে করছে দলটির তৃণমূল।
তারা বলছেন, বিদ্রোহী দমনে কঠোর নির্দেশনা শুধু নয়, নির্দেশনা বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় নেতাদের ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে হবে। নইলে চলমান ইউপি ভোটের দ্বন্দ্ব আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারেন বলে মনে করছেন তারা।
মানিকগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম আমার সংবাদকে বলেন, ‘বিদ্রোহী দমনে নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু কোনো উদ্যোগই কাজে আসছে না। বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর নির্দেশনা নয়— মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অবস্থান একদিনে তৈরি হয়নি। স্বাধীনতার আগে-পরে নানামুখী আন্দোলন-সংগ্রাম, জেল-জুলুম, বিরোধীদের অত্যাচার-নির্যাতন ও কর্মীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ আজকের অবস্থানে এসেছে। কষ্টে অর্জিত অবস্থানটি কোনোভাবেই নষ্ট করা যাবে না।’
ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাড. সুবল চন্দ্র সাহা আমার সংবাদকে বলেন, ‘বিএনপি দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে না এলেও ভোটের অংশ নিচ্ছে। তাদের মাঝে কোনো হানাহানি নেই। কিন্তু কিছু কিছু স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নিজেরা নিজেরা হানাহানি করছেন। মারামারি করছেন। দলের অভ্যন্তরে ভিন্নপন্থিরা অনেকেই অনুপ্রবেশ করে আওয়ামী লীগ সেজে আছে। সৃষ্ট সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধান করতে হবে।’
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবুর রহমান মজনু আমার সংবাদকে বলেন, ‘যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় এবার ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচনে আমাদের (আ.লীগ) নেতাকর্মীদের মাঝে সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তৃণমূলের সবাই মনে করেন, দল ক্ষমতায় রয়েছে। নির্বাচনে নৌকার মনোনয়ন পেলেই বিজয় নিশ্চিত। এমন ধারণা থেকে মনোয়নের জন্য দলীয় নেতাদের মাঝে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় সরকার ও জাতীয় নির্বাচনের মধ্যে পার্থক্য অনেক। আশা করি, চলমান প্রতিযোগিতা জাতীয় নির্বাচনে তেমন প্রভাব ফেলবে না। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক দল।’
আ.লীগের শীর্ষ নেতারা বলছেন, চলমান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তৃণমূল আওয়ামী লীগে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, মুখোমুখি সংঘর্ষ, খুনোখুনি, হামলা-পাল্টা হামলা ও বাড়িঘর ভাঙচুর হলেও দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে দল ও দলের সহযোগী সংগঠনগুলোর সকল ইউনিটির নেতাকর্মী ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে। এ জন্য নির্বাচনকেন্দ্রিক সৃষ্ট সমস্যা চিহ্নিত করার পাশাপাশি তা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিচ্ছে দলটি। বিশেষ করে বিদ্রোহীদের দল থেকে বহিষ্কার করা, দলের শীর্ষ পদে না রাখা, মনোনয়ন না দেয়া। একজন রাজনৈতিক কর্মী বা নেতার জন্য এটিই বড় শাস্তি বলে মনে করছেন দলটির দায়িত্বশীল নেতারা। মূলত দলটির চাওয়া- বিএনপিবিহীন নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হোক। কিন্তু নির্বাচনের নামে দলীয় নেতাদের লাশ ও রক্তের চিহ্ন দেখতে চায় না ক্ষমতাসীন দলটি।
তাদের দাবি, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে উপমহাদেশের সব দেশেই সহিংসতা হয়। এই নির্বাচনকেন্দ্রিক আধিপত্য বিস্তার বাংলাদেশের স্থানীয় পর্যায়ে ঘটে। আগেও ঘটেছে, এখনো ঘটছে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে এমন এমন ঘটনা কাম্য নয়।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এক যুগের বেশি সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের তৃণমূলে অনুপ্রবেশকারী ও হাইব্রিডদের জয়জয়কার। নানামুখী সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে আশা এসব অনুপ্রবেশকারী জেলা-উপজেলার শীর্ষ পদ-পদবিতে দায়িত্ব নিয়েছেন। স্থানী এমপি-মন্ত্রী ও দলের প্রভাবশালীদের হাত ধরে বাগিয়ে নিচ্ছেন নৌকার মনোনয়ন। আদর্শবিরোধীরা দলে প্রবেশ করায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছে দুর্দিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিতরা। যদিও অনুপ্রবেশকারী, হাইব্রিড, বিএনপি-জামায়াতপন্থিদের দল থেকে ছেঁটে ফেলার জন্য কঠোর বার্তা দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। দলটির দায়িত্বশীল নেতারা এমন উক্তি করলেও বাস্তবে মাঠের চিত্র একেবারে ভিন্ন। সর্বশেষ তৃতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অনুপ্রবেশকারীদের নৌকার মনোনয়ন দিয়েছে আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, ‘দলগতভাবে আমরা (আ.লীগ) নৌকার মনোনয়ন দিয়েছি। আমাদের (আ.লীগ) চাওয়া স্থানীয় সরকারের নির্বাচনটি অবাধা, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হোক।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনে যে ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটছে— এটি আমরা কখনোই কামনা করি না। সুষ্ঠু ভোট গ্রহণে দেশের আইনশৃঙ্খলাবাহিনী, নির্বাচন কমিশন ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সহযোগিতা সব সময় আছে।
বিএনপিবিহীন স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব জাতীয় নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলবে কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুর রহমান বলেন, ‘একটি ভিন্ন উৎসবের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যারা বিদ্রোহী হয়েছেন, তারা আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান, যারা নৌকার নির্বাচন করছেন, তারাও আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান। জাতীয় নির্বাচনের এলেই সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে কাজ করছেন এবং শেখ হাসিনাকে বিজয় উপর দেবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্রোহীদের আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। আগামীতে তারা আর কোনো পদ-পদবি পাবে না। একজন রাজনৈতিক কর্মী বা নেতার জন্য এর থেকে বড় শাস্তি হতে পারে না।’