আকাশবার্তা ডেস্ক :
মো. শাহ পরাণ। তিনি একজন সাবেক আইনজীবী। কাজ করতেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ে। তবে ২০২০ সালের ৩ ডিসেম্বর কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী পাবলিক বাসে এক নারী আইনজীবীকে শ্লীলতাহানি ও যৌন হেনস্তার অভিযোগে পুলিশের হাতে আটক হন তিনি।
পরে ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারায় মামলা নেয় পুলিশ। লোহাগাড়া থানা মামলা নং ০৪/২০। গ্রেপ্তারের পাঁচ দিন পর চট্টগ্রাম আদালত থেকে জামিনে মুক্তিও পান তিনি।
এদিকে ওই মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া শেষে ১৬১ ধারায় সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আসামি শাহ পরাণকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে লোহাগাড়া থানা পুলিশ। বর্তমানে মামলাটি চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এ দীর্ঘদিন ধরে চার্জগঠন পর্যায়ে রয়েছে। বিপত্তি ঘটে ওখানেই।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের চার্জশিটভুক্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও গত ২৫ নভেম্বর শাহ পরাণকে ১৩তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) সরকারি গেজেটের মাধ্যমে সহকারী জজ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পদায়ন করা হয়েছে নেত্রকোনার সহকারী জজ হিসেবে।
ফলে চার্জশিটভুক্ত আসামির বিচারক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ায় এতে আইন ও বিচার সংশ্লিষ্ট অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। কেউ কেউ এটিকে নজিরবিহীন ঘটনা বলেও আখ্যা দিয়েছেন। তারা বলছেন, আইন ভঙ্গকারীকে বিচারকরা বিচার করে আইনের শাসন সমুন্নত করবেন, কিন্তু তিনি যদি নিজেই আইন ভঙ্গ করেন বা অপরাধ করেন তবে আইনের শাসন তাকে ক্ষমা করবে না। আইনের মানদণ্ডে তারও বিচার হবে। বিশ্বের সব গণতান্ত্রিক দেশে একই বিধান।
এদিকে আইনজীবীরা বলছেন, একজন শ্লীলতাহানিকারী যদি বিচারক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন, তিনি কিভাবে আরেকজন নারীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন— সেটা বড় প্রশ্ন। তারা বলছেন, স্বাভাবিকভাবে বিসিএস বা বিজেএসে মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে চাকরিতে নিয়োগের পুলিশ ভেরিফিকেশন পর্যায়ে তাদের বাদ দেয়া হলেও, ওই ব্যক্তি কোনো প্রকার বাধার সম্মুখীন না হয়েই সহজে পার পেয়ে যাওয়ায় বিস্মিত হয়েছেন তারা।
জানা গেছে, ভুক্তভোগী নারীর লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত করে প্রমাণ মেলায় চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সহকারী পরিচালক (আইন) পদ থেকে শাহ পরাণকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। মামলার পিসিপিআর ডিজিটাল হওয়ায় কারো বিরুদ্ধে কোনো মামলা থাকলে সহজেই তা ট্র্যাক করা যায়। পুলিশ ভেরফিকেশন রিপোর্টে মামলা আছে মর্মে পুলিশ কর্তৃক রিপোর্ট দেয়া হলে, কর্তৃপক্ষ মামলা ও অপরাধের ধরন, অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রস্বার্থ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
তবে কোনো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ থাকলে এবং পুলিশি তদন্ত বা চার্জশিটে প্রমাণিত হলে এরূপ ত্রুটিপূর্ণ প্রার্থী নিয়োগে অনীহা প্রকাশ করে। শুধু পুলিশ ভেরিফিকেশন হয় তা নয়, অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাও তদন্ত করে সেগুলোতে তিনি কিভাবে পার করে এলেন এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
মামলার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তদন্ত কর্মকর্তা লোহাগাড়া থানার পুলিশ পরিদর্শক মো. রফিকুল ইসলাম জামান বলেন, শাহ পরাণের মামলাটি অনেক আগেই তদন্ত প্রক্রিয়া শেষে হয়েছে। এমনকি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করাও হয়ে গেছে। ওই মামলার সাক্ষীদের জবানবন্দিতে ঘটনার সত্যতা মিলেছে। সেই অনুযায়ীই আমরা অভিযোগপত্র দিয়েছি।
ঘটনার সত্যতা জানতে চেয়ে অভিযুক্ত শাহ পরাণের মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেন। পরে সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার পরই তিনি ফোনটি কেটে দেন। পরবর্তিতে চেষ্টা করা হলে দেখা যায়, প্রতিবেদকের নম্বরটি তিনি ব্লক লিস্টে ফেলে রেখেছেন।নারী নির্যাতন মামলার চার্জশিটভুক্ত কেউ সহকারী জজ হিসেবে নিয়োগ পেতে পারেন কি-না, জুডিশিয়ারি ও আইন কি বলে?
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সাতক্ষীরা জেলা দায়রা জজ শেখ মফিজুর রহমান বলেন, ‘সরকারের আইন যা জুডিশিয়ারি আইন সেটি। এটি প্রথমে পুলিশ ভেরিফিকেশন হবে, তারপর নিয়োগ পাবে। মামলা থাকলে পুলিশ রিপোর্ট ভালো আসার কথা নয়, আর নিয়োগও পাওয়ার কথা নয়। তবে যদি ভুলক্রমে নিয়োগ হয়েও থাকে তাহলে ওই চাকরি কনফার্ম হবে না। সংশ্লিষ্টদের জানালে ওই ছেলে বাদ পড়ে যাবে। আসলে কারো বিরুদ্ধে যদি মামলা মোকদ্দমা থাকে তাহলে নিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা একটু স্লথ হই এবং মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নিই।’
আইনগতভাবে তিনি কি নিয়োগ পেতে পারেন কি-না? জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবো না। এটি যেই অথরিটি তাকে নিয়োগ দিয়েছে তারাই ভালো বলতে পারবে। আসলে এমন ঘটনাও খুবই কম ঘটে।’
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জামিউল হক ফয়সাল বলেন, ‘যে লোক নৈতিকভাবে ফিট নয়, তিনি কিভাবে বিচারকের পদে আসিন হন এটি আমার বোধগম্য নয়। তার কাছ থেকে ন্যায়বিচার আশা করা যায় না। একজন আসামি প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণিত হয়ে পুলিশের চার্জশিটভূক্ত হয়েছেন। এমন একজন লোক সহকারী জজের মতো সেনসিটিভ পদে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ নেই। ভেরিভিকেশনেই এই নিয়োগ স্থগিত হওয়ার কথা। মামলা নিষ্পত্তি হয়ে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তার নিয়োগ স্থগিত থাকা উচিত।’
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বলেন, ‘এমন ঘটনা অতিতে ঘটেছে বলে মনে হয় না। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ার আগে যাচাই-বাছাই করা উচিত ছিলো। যেহেতু নিয়োগ হয়ে গেছে তাই উচিত হবে আপাতত তার নিয়োগ স্থগিত রাখা। মামলা নিষ্পত্তি হলে তিনি যদি নির্দোষ প্রমাণিত হন তবে তাকে স্বপদে বহাল করা যেতে পারে। তবে কোনো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ থাকলে এবং পুলিশি তদন্ত বা চার্জশিটে প্রমাণিত হলে এরূপ ত্রুটিপূর্ণ প্রার্থী নিয়োগে বিজেএস অনীহা প্রকাশ করে বলে জানি।’
মামলার বাদি ভুক্তভোগী নারী অভিযোগ করে বলেন, ‘ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে মামলার বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করছেন তিনি। এমনকি মামলাটি চার্জগঠন পর্যায়েই শেষ করতে চাপ সৃষ্টি করেছেন। এমনটি প্রভাব খাটিয়ে একের পর এক শুনানির তারিখ পরিবর্তন করছেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘জামিনে বের হয়ে তিনি আমার দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার করতে চাপ দেন। এ জন্য বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে আমি ও আমার পরিবারকে বিভিন্ন হুমকিসহ সামাজিক মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছেন। আমি চরম নিরাপত্তাহীতায় ভুগছিলাম। তখন আমি আমার চাকরিস্থল উখিয়া থানায় জিডি করতে বাধ্য হই। শাহ পরাণ তার কর্মক্ষেত্র এবং তার সাবেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে আমাকে এবং আমার পরিবারকে বিভিন্ন নম্বর থেকে কল দিয়ে এবং বিভিন্ন লোক মারফত সামাজিকভাবে হয়রানি করছেন।’
কি আছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারায় : যদি কোনো ব্যক্তি অবৈধভাবে তার যৌন কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশে তার শরীরের যেকোনো অঙ্গ বা কোনো বস্তু দ্বারা কোনো নারী বা শিশুর যৌন অঙ্গ বা অন্য কোনো অঙ্গ স্পর্শ করেন বা কোনো নারীর শ্লীলতাহানি করেন তা হলে তার ওই কাজ হবে যৌনপীড়ন এবং এর জন্য ওই ব্যক্তি অনধিক ১০ বছর কিন্তু অন্যূন তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবেন।
বিচারকের আচরণবিধি : বিচারক উন্নত চরিত্রের অধিকারী হবেন। একজন বিচারক অন্য কারো ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য তার নিজের পরিচয় এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন না। বিচারককে আইনজীবী এবং বিচারপ্রার্থী জনগণের প্রতি ধৈর্যশীল হবেন এবং সম্মানজনক আচরণ করবেন। মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০২০ সালের ৩ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১০টায় বাদিনী কক্সবাজারের ডলফিন মোড় থেকে সেন্টমার্টিন পরিবহনের (ঢাকা-ব ১৫-১৩-৫০) আমার সিট নম্বর ডি-২ তে ঢাকার উদ্দেশ্য রওনা দেন। বাদিনী যথাসময়ে বাসে আরোহণ করে এবং তার আসন গ্রহণ করে। কিন্তু গাড়ি ছাড়ার ৩০-৪০ মিনিট পর বাদিনীর পাশের সিট ডি-১ এ বসে থাকা মো. শাহ পরাণ, পিতা মৃত রমজান আলী, জলিরপাড়, পো কলাদিয়া, থানা পাকুন্দিয়া, জেলা কিশোরগঞ্জ হাত-পা নাড়াচাড়ার অজুহাতে বাদিনীর শরীরের বিভিন্ন ষ্পর্শকাতর স্থানে একের অধিকবার স্পর্শ করতে থাকেন।
পরোক্ষণে বাদিনী সিট থেকে একটু সরে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করেন যে লোকটি ইচ্ছাকৃতভাবে স্পর্শ করছেন কি-না। পরে উভয়ের মাঝে দূরত্ব বজায় রাখতে বাদিনী সিটের মাঝ বরাবর তার বহনকৃত ব্যাগ রাখেন। পরবর্তীতে ঘুম ঘুম অনুভূত হলে বাদিনী যখন চোখ বন্ধ করেন ঠিক তখনই আসামি শাহ পরাণ বাদিনীর উরুতে অপত্তিকরভাবে দুইবার স্পর্শ করে এবং বুকের বা পাশে হাতের কনুই দিয়ে আঘাত করে কম্বলের নিচে মুখ লুকিয়ে ফেলে। ঘুম থেকে জেগে বাদিনী অভিযুক্তকে (শাহ পরাণ) জিজ্ঞাসা করলে আসামি তা অস্বীকার করেন এবং উচ্চস্বরে চেঁচামেচি করতে থাকেন।
কথাবার্তার একপর্যায়ে বাদিনী তাকে তার কৃতকর্মের জন্য ‘সরি’ বলতে বললে আসামি নিজেকে আইনজীবী পরিচয় দিয়ে উল্টো বাদিনীকে হেনস্তার চেষ্টা করেন এবং বারবার অশালীন আচরণ করতে থাকেন। এ অবস্থায় বাসের অন্য যাত্রীরা আসামিকে ‘সরি’ বলতে বলেন এবং পেছনের সিটে গিয়ে বসতে বলেন। কিন্তু তিনি সরি বলবেন না এবং পেছনের সিটে যাবেন না বলে আবারো চেঁচামেচি করতে থাকেন।
এ অবস্থায় আসামি জোরপূর্বক ওই সিটেই বসতে গেলে বাদিনী তাকে বাধা দিলে তিনি বাদিনীকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন এবং গায়ে হাত তুলেন। আসামি বাদিনী ডান হাতের কনিষ্ঠ আঙ্গুল মোচড়িয়ে দেন এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। এমন অবস্থায় বাসের যাত্রীরা তাকে নিবৃত করতে না পেরে গণপিটুনি দেন। পরে যখন অবস্থা বেগতিক হয়ে যাচ্ছিল, তখন বাসের অন্য যাত্রীরা তাকে থামায় এবং বাসের পেছনের দিকে পাঠিয়ে দেয়।
এর কিছুক্ষণ পরে বাস যাত্রা বিরতি করে চুনতি মিডওয়ে ইন রেস্টুরেন্টে। তখন বাদিনী নিরুপায় হয়ে জাতীয় জরুরি সেবা-৯৯৯ কল করে বাদিনীর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা পুলিশকে অবহিত করে। ৯৯৯ নম্বর থেকে লোহাগড়া থানার পুলিশের সাথে যোগাযোগ করে ওই স্থানে পুলিশ আসে এবং উপস্থিত যাত্রী, বাসের চালক এবং হেয়ারসহ সবার উপস্থিতিতে পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে যায়।
সে অবস্থায় বাদিনীও লোহাগাড়া থানায় গিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারায় লিখিত অভিযোগ করেন। থানায় পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার সত্যতা মেলায় মামলা রজু করে অভিযুক্ত শাহ পরাণকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে তাকে আদালতে পাঠানো হয়। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বাদিনী সেখান থেকে ওই গাড়িতে করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন।