চন্দ্রগঞ্জ, (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি :
লক্ষ্মীপুরের দক্ষিণ খাগুড়িয়া গ্রামে বৃদ্ধ মিলন হোসেনের খুনের ঘটনার রহস্য উদঘাটিত হয়েছে। রোববার (২৪ এপ্রিল) দুপুর আড়াইটার দিকে লক্ষ্মীপুর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট-চন্দ্রগঞ্জ আমলী আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন স্ত্রী জাহানারা বেগম (৫০)। এরআগে শনিবার সকালে বৃদ্ধ মিলনের মরদেহ উদ্ধারের পর নিহতের ছোট ছেলে মো. সাফায়েত হোসেন প্রকাশ মাহবুব (২০) বাদি হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এরপর ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আটক স্ত্রী জাহানারাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেন।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, গত ২২ এপ্রিল শুক্রবার দিবাগত রাত ১টার দিকে দক্ষিণ খাগুড়িয়া গ্রামের আনোয়ার মিয়ার বাড়ির মিলন হোসেনের স্ত্রী জাহানারা বেগম প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বসতঘর থেকে বের হন। কিছুক্ষণ পরে স্বামী মিলন হোসেনও ঘর থেকে বের হন। জাহানারা বেগম বাথরুম থেকে বের হয়ে বসতঘরে ঢুকতে চাইলে স্বামী মিলন তাকে আগলে ধরে স্ত্রীর সাথে শারিরীক মেলামেশার জন্য বলেন।
এসময় স্ত্রী জাহানারা কোনো কথা না বলে গৃহপালিত গরু দেখার জন্য গোয়ালঘরে যান। স্বামী মিলনও তার পিছনে পিছনে গোয়ালঘরে যান এবং সেখানে আবারো স্ত্রীর সাথে মেলামেশার জন্য চাপসৃষ্টি করেন। একপর্যায়ে গোয়ালঘর সংলগ্ন সুপারী বাগানে স্বামী মিলনকে ডেকে নিয়ে যান স্ত্রী। সেখানে স্বামীকে অপেক্ষায় রেখে গোয়ালঘরে দড়ি আনতে যান জাহানারা। এরপর কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সুপারী গাছের সাথে পিছমোড়া করে স্বামীর দুই হাত বেঁধে ফেলেন তিনি। কিন্তু স্বামী মিলন স্ত্রী দুষ্টামী করছে মনে করে তাকে কোনো বাঁধাও দেননি। হাত বাঁধার পরে জাহানারা বেগম স্বামী মিলনের গলায় দড়ি বেঁধে গাছের সাথে স্বজোরে টান দিলে ঘটনাস্থলেই মারা যান বৃদ্ধ মিলন।
এঘটনায় পরদিন শনিবার সকালে প্রতিবেশিদের মাধ্যমে খবর পেয়ে চন্দ্রগঞ্জ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গাছের সাথে হাত বাঁধা এবং গলায় রশি লাগানো অর্ধ ঝুলন্ত অবস্থান স্বামী মিলনের মরদেহ উদ্ধার করে। হত্যাকান্ডের সময় ছোট মেয়ে নিপু আক্তার (২২ঘ বসতঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। একই সময়ে মামলার বাদি ও নিহতের ছোট ছেলে সাফায়েত হোসেন মাহবুব আত্মীয়ের বাড়িতে ছিলেন।

আদালতে জাহানারা বেগম হত্যার দায় স্বীকার করে আরো জানায়, নানা কারণে পারিবারিক কলহের মধ্যেই ৩৫ বছরের সংসার জীবনে তাদের ৩ ছেলে ও ২ মেয়ে সন্তানের জনক-জননী হন তারা। বড় মেয়ে শিমু আক্তারকে বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়ে নিপু আক্তার এখনো অবিবাহিত। বড় ছেলে মোশারফ রাজমেস্ত্রীর কাজ করেন। মেজো ছেলে শাহাদাত প্রবাসে থাকেন এবং ছোট ছেলে মাহবুবও বাড়িতে থাকেন। স্বামী মিলন প্রায়ই ঠুনকো কারণে স্ত্রী জাহানারাকে গাল-মন্দসহ নানাভাবে নির্যাতন করতেন। জাহানারা জানান, স্বামী মিলনের একগোঁড়ামী ও বদমেজাজ স্বভাব ছিল। জাহানারা বসতঘরে মেয়েকে নিয়ে আলাদাকক্ষে ঘুমাতেন। মিলনও আলাদাকক্ষে ঘুমাতেন। কিন্তু প্রায়ই স্ত্রী ও মেয়ের কক্ষে গিয়ে রাতে জাহানারার সাথে মেয়ের সামনেই শারিরীক সম্পর্ক করার জন্য জোর-জবরদস্তি করতেন স্বামী মিলন। এতে তাদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। এর জেরধরে ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে জাহানারা বেগম স্বামীকে হত্যা করেছেন বলে দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চন্দ্রগঞ্জ থানার এসআই মো. আবদুল আউয়াল জানিয়েছেন, হত্যা মামলা দায়েরের পর স্ত্রীর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। এরপর তাকে আদালত জেলহাজতে প্রেরণের আদেশ দেয়। তিনি বলেন, তদন্তের মাধ্যমে জানা যাবে এই হত্যাকান্ডের সাথে আর কেউ জড়িত আছে কীনা। তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
এ ব্যাপারে চন্দ্রগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে বৃদ্ধ মিলনকে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে হত্যার রহস্য উদঘাটিত হয়েছে। স্ত্রী জাহানারা বেগম দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।