শুক্রবার ২০শে মার্চ, ২০২৬ ইং ৬ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মনুষ্যসৃষ্ট এক নরককুণ্ড!

আকাশবার্তা ডেস্ক :

এখনো টিভি স্কিনে চোখ! ৪৬ ঘণ্টা পার হলেও জ্বলছে বিএম কনটেইনার ডিপো। দাউ দাউ করে উঠছে ধোঁয়া। কেমিক্যালের ভয়ে সতর্ক সেনা ও ফায়ারকর্মীরা। ভয়াবহ এক বিভীষিকাময় চিত্র দেখছে দেশবাসী। জ্বলে-পুড়ে অঙ্গার হয়ে নরককুণ্ডে পরিণত হয়েছে।

আকাশে-বাতাসে লাশের গন্ধ! চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভয়াবহতা। নিকটবর্তী এলাকায় বয়স্ক ও শিশুরাও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। গতকাল সোমবার রাত ৯টায়ও ডিপোর আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ভয়ঙ্কর দৃশ্যপটের সাক্ষী শত শত পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আশপাশের বাড়িঘর ও স্থাপনা। ভেঙে গেছে বাড়ি-ঘরের জানালার গ্লাস।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাসায়নিক পদার্থের কারণে আরো বেশ কিছু বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। এটি মানুষের ত্বককে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে, মানুষের চামড়ার কোষগুলোকে জ্বালিয়ে নষ্ট করে দেয়। বাতাসে পদার্থটি পেটের ভেতরে চলে গেলে ফুসফুস-পাকস্থলীর কোষগুলো জ্বলে যায়। এটি যেহেতু দীর্ঘ এলাকাজুড়ে ছড়িয়েছে তাতে শিশু-বৃদ্ধসহ কিছু লোকের ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে।

এদিকে এখনো হাসপাতালে পড়ে আছে অঙ্গার লাশ। যাচ্ছে না চেনা। গণমাধ্যমের খবর বলছে, বাবার লাশ নিতে ছয় বছরের শিশু ডিএনএ টেস্ট দিয়েছে। অন্যদিকে ছেলের লাশ নিতে এসেছেন বৃদ্ধ বাবা! তিনিও দিয়েছেন ডিএনএ টেস্ট। ছবি নিয়ে স্বজনদের জন্য অপেক্ষা বহু মানুষের। মৃত্যুর সাথে লড়ছে প্রায় দেড়শ মানুষ।

জানা যায়, চট্টগ্রাম নগরী থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পূর্বপাশে ২৪ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত এ ডিপোতে বিস্ফোরণের শব্দ চার কিলোমিটার দূর থেকেও শুনেছেন অনেকে। বিস্ফোরণে কম্পনের আওয়াজ এতটাই তীব্র ছিল যে, আশেপাশের এক কিলোমিটার এলাকার শতাধিক বাড়ি-ঘর, অফিস, মসজিদের কাচের গ্লাস ভেঙে খসে পড়ে।

বিস্ফোরণের কম্পনে সোনাইছড়ি এলাকার দুলাল ও নুর মোহাম্মদ তারাকি গণমাধ্যমকে জানান, তাদের বিল্ডিংঘরের কাচের জানালা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, এ ছাড়া মাল্লাপাড়ার কাসেম জুট মিলস সংলগ্ন মসজিদটির চারিদিকের জানালার গ্লাস ভেঙে পড়ে।

কনটেইনার বিস্ফোরণের শব্দ এত বেশি প্রকট ছিল, মনে হচ্ছিল আকাশটা ফেটে বোধ হয় জমিনে পতিত হচ্ছে, শব্দ ও কম্পনের ব্যাপকতা চার-পাঁচ কিলোমিটারের কম হবে না— কথাগুলো বলছিলেন বারো আউলিয়া নিবাসী সোনাইছড়ির আলাউদ্দিন। এ ছাড়া মীর মামুন জানান, ঘটনাস্থল থেকে তার বাড়ি চার কিলোমিটার পর্যন্ত শব্দ শোনা গেছে।

এ ঘটনায় ওইদিন চমেক হাসপাতালে আহতদের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে, আগতদের কারও কারও নাম এন্ট্রিও করা হয়নি। আঘাত অনুসারে তাদের বিভিন্ন ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। তাই নিহত ও আহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাওয়া যায়নি। রাত থেকে সকাল পর্যন্ত অ্যাম্বুলেন্স, প্রাইভেটকার, মাক্রোবাস, হিউম্যান হলার, সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে গুরুতর আহতদের আনা হয় চমেক হাসপাতালে। তাৎক্ষণিক রক্ত দিতে ছুটে আসে শত শত মানুষ। এ ঘটনায় আশপাশের বহু মানুষও রাসায়নিকের ঘ্রাণে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। অনেকেই বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ঘটনাস্থলে কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিটের সদস্যরা গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। কিন্তু কী ধরনের পণ্যবোঝাই কনটেইনারে আগুনে লেগেছে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য ফায়ার সার্ভিসের কাছে ছিল না। বিএম কনটেইনার ডিপোর মালিকপক্ষের কেউ ফায়ার সার্ভিসকে কেমিক্যাল থাকার বিষয়টি জানাননি।

এতে করে আগুন নেভানোর জন্য ব্যাপক হারে পানি ছিটানো হচ্ছিল। হাইড্রোজেন-পার অক্সাইডে আগুন ও পানির যোগ হওয়ায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে আগুন নেভানোর কাজে থাকা ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরাই প্রথমে উড়ে যান।

কনটেইনারে আগুন লাগার পর অনেকে সেলফি তুলছিলেন, ছবি তুলছিলেন। বিস্ফোরণে যারা কনটেইনারের সাথে উড়ে যান, তাদের অনেকের হাত-পা বিচ্ছিন্ন হয়ে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানান, হাইড্রোজেন-পার-অক্সাইড পানি দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইসমাঈল হোসেন বলেন, ‘এসব রাসায়নিক পদার্থ নেভানোর জন্য এক ধরনের স্প্রে ব্যবহার করতে হয়। মেটাল পাউডার সম্বলিত সেসব স্প্রে আগুন নিয়ন্ত্রণে ব্যবহূত হয়। কিন্তু এসব কনটেইনারে যে হাইড্রোজেন-পার-অক্সাইড ছিল তা ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের আগে থেকে জানানো হয়নি। যার ফলে এত বড় দুর্ঘটনা। ফায়ার কর্মীরাও তথ্য না জানার কারণে উড়ে যান।’

চট্টগ্রাম কলেজের রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. অজয় দত্ত বলেন, ‘যেহেতু এই রাসায়নিক উচ্চমাত্রার দাহ্য ও বিস্ফোরকজাতীয় পদার্থ, তাই এটিকে খুব সাবধানতার সাথে সংরক্ষণ করতে হয়।

অন্যথায় উচ্চ তাপ বা অন্য কোনো মৌলের সাথে বিক্রিয়া করে এটি বিস্ফোরণ ঘটাবে। বিএম কনটেইনার ডিপোর যেখানে এটিকে রাখা হয়েছে সেখানে উপযুক্ত জায়গায় এটিকে রাখা হয়নি। এ ছাড়াও সেখানে ভেজাল হাইড্রোজেন-পার-অক্সাইড থাকতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। পিউর হাইড্রোজেন-পার-অক্সাইড হলে এত বেশি ক্ষতি করত না। ওখানে নিশ্চয় অন্য কোনো রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত ছিল। তাই এর বিস্ফোরণের মাত্রা এত ভয়াবহ হয়েছে।

এই রাসায়নিকের দ্বারা মানুষের কেমন ক্ষতি হতে পারে জানতে চাইলে ড. অজয় দত্ত জানান, ক্ষারীয় সব রাসায়নিকই কমবেশি ক্ষতি করে। তবে এই রাসায়নিক পদার্থটি মানুষের ত্বককে বিশেষভাবে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে, মানুষের চামড়ার কোষগুলোকে জ্বালিয়ে নষ্ট করে দেয়। এ ছাড়াও কেউ যদি এই পদার্থটি খেয়ে ফেলে বা বাতাসের মাধ্যমে ফুসফুসে যায় তবে সাথে সাথে পাকস্থলী ও ফুসফুসের কোষগুলো জ্বলে যায়।

তাই যেসব ক্ষেত্রে এই রাসায়নিক ব্যবহূত হয় সেখানে অতি সাবধানতার সাথে এটিকে হ্যান্ডেল করা হয়।’ এছাড়াও ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডের সময় পানি ব্যবহারের ফলে এই রাসায়নিকের বিস্ফোরণের মাত্রা আরো বেড়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন রসায়নের এই গবেষক।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিস্ফোরক পরিদপ্তরের পরিদর্শক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘বিপজ্জনক পণ্য মজুত করার কোনো লাইসেন্স ও অনুমোদন নেই বিএম ডিপোর। এ ধরনের পণ্য সংরক্ষণ করার জন্য বিশেষ অবকাঠামোর দরকার হয়। এ ঘটনায় তিনটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সুপারিশ সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমরা জেনেছি, অনুমোদন ছাড়াই ডিপোর কনটেইনারগুলো ভর্তি ছিল আল রাজি কেমিক্যাল কমপ্লেক্স কোম্পানির হাইড্রোজেন-পার-অক্সাইডে। প্রতিটি জারে ছিল ৩০ কেজি ওজনের এই ভয়ঙ্কর রাসায়নিক।

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

মার্চ ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« ফেব্রুয়ারি    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১