আকাশবার্তা ডেস্ক :
সমৃদ্ধি কোনো একক বিষয় নয়। গোটা বসতি বা অঞ্চল সবদিক থেকে পরিপূর্ণ হওয়াই সমৃদ্ধি। শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থা নয়! অবকাঠোমা উন্নয়ন, শিল্প, জীবনমান, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, উন্নত জীবন— সবদিক থেকে প্রতিবন্ধকতা ছিল দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে।
শত প্রজন্মের অসহায়ের মতো দেখে আসা প্রতিবন্ধকতায় আবদ্ধ সেই দক্ষিণাঞ্চল একটি মাত্র সেতুর বদৌলতে সমৃদ্ধির ছোঁয়া লেগেছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের স্বপ্নের পদ্মা সেতু দ্বার উন্মোচন হচ্ছে আগামী ২৫ জুন। এদিন সেতুটির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এরমধ্য দিয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলা দক্ষিণাঞ্চলের সকল বাধা দূর হবে। সারা দেশের সাথে সড়কপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। বিশ্লেষকদের মতে, উন্মোচনের অপেক্ষায় পদ্মা সেতুর কারণে যত দ্রুত রঙিন উন্নত সমৃদ্ধ জীবনের স্বপ্ন বুনন করছে পদ্মা পাড়ের মানুষ। সেতু নির্মাণের পেছনের গল্পটা কিন্তু অতটা সহজ ছিল না। সেতু নির্মাণের পেছনের গল্পটি কঠিন বেদনাতুর ও অপমানের। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় প্রত্যয় আর সাহসী পদক্ষেপে সেতু নির্মাণ সম্ভব হয়েছে।
২০১১ সালে সরকার বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে ঋণ চুক্তিবদ্ধ হয়। ২০১২ সালে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হয়েছে এমন অভিযোগ তুলে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি বাতিল করে। বিশ্ব ব্যাংকের পাশাপাশি জাইকা, এডিবিসহ দাতা সংস্থাগুলোও সরে দাঁড়ায়। সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। তৎকালীন সড়ক ও সেতুমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়। সংশ্লিষ্ট সচিবসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অথচ মন্ত্রীসহ কারোর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই প্রমাণিত হয়নি। পরে কানাডার আদালতে কোনো দুর্নীতি হয়নি বলে রায় আসে।
এরপর নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পদ্মা সেতু এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব। সমগ্র বাংলাদেশের জন্য এটি এখন মর্যাদার সেতু। পদ্মায় চোখ পড়লেই সেতুর বিশাল অবকাঠামো বাংলাদেশকে নতুন দিবালোক স্বপ্নে বিভোর করে। পদ্মা সেতু বাংলাদেশকে এমন সক্ষমতা এনে দিয়েছে যে, এখন দাতা সংস্থাগুলো নিজেরাই বিনিয়োগে আগ্রহী দেখাচ্ছে।
গতকাল দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণে বাংলাদেশ সরকারের চলমান প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণের সুযোগ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকো। তিনি এমন এক সময় এ কথা বললেন, যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদৃষ্টি এবং রাজনৈতিক বিচক্ষণতার কারণে প্রথম পদ্মা সেতু নির্মিত হয়েছে।
ইতো নাওকো দূত বলেন, বর্তমানে জাপান সরকারের অবস্থান হচ্ছে ‘আমরা বাংলাদেশ সরকারের দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণে আমাদের সহযোগিতা প্রস্তাবের সুযোগ নেবো।’ তিনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত যে, এটি (পদ্মা সেতু) অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও সফল হবে। সুতরাং, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু হবে একটি বাস্তবতা।’
১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরের কথা স্মরণ করে নাওকি বলেন, তিনি পদ্মা সেতু ও রূপসা সেতু দুটি সেতুতে সহযোগিতার জন্য জাপানের কাছে অনুরোধ করেছিলেন।
রাষ্ট্রদূত অবশ্য বলেন, এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, জাইকা পদ্মা সেতুতে অর্থায়নের অংশ হতে পারেনি যদিও এটা জাপান সরকারের আগ্রহ ছিল। তনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের সাহসী সিদ্ধান্তের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং বলেন, এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ নিজে থেকে কতটা করতে সক্ষম। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা।
পদ্মা সেতুর (মূল সেতু) দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। দুই প্রান্তের উড়ালপথ (ভায়াডাক্ট) ৩ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার। সব মিলিয়ে সেতুর দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়।
২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর মূল সেতু ও নদীশাসন কাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সক্ষমতা ও সাহসের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। একমাত্র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসিকতায় বিশ্বজয় করেছে বাঙালি। নিজস্ব অর্থায়ণে পদ্মা সেতুর প্রশংসা এখন বিশ্বজুড়ে।
তলাবিহীন ঝুড়ির আখ্যা পাওয়া বাংলাদেশ এখন আত্মনির্ভরশীল, এর উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত স্বপ্নের পদ্মা সেতু। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী বলেছেন, পদ্মা সেতু বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটান— বিবি আইএন কানেক্টিটিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। আঞ্চলিক কানেক্টিভিটিতে এই সেতু যে ভূমিকা রাখবে, এতে ভারত খুশি। এটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী সিদ্ধান্ত। ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিং বলেছেন, পদ্মা সেতু সাহসের প্রতীক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী সিদ্ধান্তের জন্যই এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে।
চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণ সিদ্ধান্তে প্রয়োজন ছিল সীমাহীন সাহস ও সুদৃঢ় রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে সেটা ছিল বলেই এই সেতু এখন বাস্তব। পদ্মা সেতু নিয়ে আমি যখন ভাবি, তখন শুধু তিনটি শব্দ আমার মনে আসে, সেটা হলো— সাহস, সংকল্প ও সমৃদ্ধি। পদ্মা সেতু একটি বহুমুখী সড়ক ও রেল সেতু। এর মাধ্যমে মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ের সাথে শরীয়তপুর ও মাদারীপুর যুক্ত হবে।
ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে উত্তর-পূর্ব অংশের সংযোগ ঘটবে। দুই স্তরবিশিষ্ট স্টিল ও কংক্রিট নির্মিত ট্রাস ব্রিজটির ওপরের স্তরে থাকবে চার লেনের সড়কপথ এবং নিচের স্তরটিতে একটি একক রেলপথ। খরস্রোতা পদ্মা নদীতে নির্মিত হয়েছে পদ্মা সেতু। পানি প্রবাহের বিবেচনায় বিশ্বে আমাজন নদীর পরই এর অবস্থান। মাটির ১২০ থেকে ১২৭ মিটার গভীরে গিয়ে পাইল বসানো হয়েছে এই সেতুতে। পৃথিবীর অন্য কোনো সেতু তৈরিতে এত গভীরে গিয়ে পাইল বসাতে হয়নি। যা পৃথিবীতে একটি অনন্য রেকর্ড সৃষ্টি করেছে।
আর মাত্র এক দিন পরই উদ্বোধন হতে যাচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত এ সেতু। শুধু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল নয়, সেতু উদ্বোধনের দিনক্ষণ গণনাসহ উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। পদ্মা সেতু প্রকল্প উদ্বোধনের মধ্যদিয়ে সারা দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন মাইলফলক সৃষ্টি হবে। দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ১ দশমিক ২৩ শতাংশ হারে বাড়বে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি বাড়বে ২ দশমিক ৩ শতাংশ।
গতকাল বুধবার সেতুর প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পদ্মার দুপাড়েই সাজ সাজ রব। ঢাকা-মাওয়া হাইওয়ে সড়কজুড়ে শোভা পাচ্ছে রঙিন বিলবোর্ডসহ নানা আয়োজন। পদ্মার উভয় পাড়েই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এছাড়া জাজিরা প্রান্তে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় অংশ নেবেন তিনি। সেখানে ১৫ লাখের বেশি জনসমাগম ঘটানোর প্রস্তুতি নিয়েছে দলটি। এ জন্য সব ধরনের প্রস্তুতিও শেষ পর্যায়ে আনা হয়েছে। সেতুর উভয় পাড়ে সেতু মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে ফলক উন্মোচন ও সুধী সমাবেশের আয়োজন করা হবে। ইতোমধ্যে আমন্ত্রিত অতিথিদের দাওয়াত কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। সেখানে বিদেশি কূটনৈতিক, দাতা সংস্থা, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, সংসদ সদস্য, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিরাসহ বিশিষ্ঠজনরা অংশ নেবেন।
আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বিএনপি ও জাতীয় পাার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকেও। পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান একযোগে সারা দেশে দেখানো হবে। জেলায় জেলায় উৎসব করেও এই ক্ষণ উদ্যাপন করা হবে। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। ঢাকার হাতিরঝিলে লেজার শোর আয়োজন করা হবে। ২৫ জুন থেকে ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুরসহ কয়েকটি জেলায় পাঁচ দিন পর্যন্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠান চলবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ঘিরে সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সেনাবাহিনী, এসএসএফ, পুলিশ, র্যাব ও আনসার বাহিনী দায়িত্বে থাকবেন। গতকাল র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, পদ্মা সেতুর উদ্বোধনকে ঘিরে জনসভাস্থলসহ পুরো এলাকা নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা থাকবে।
তিনি বলেন, আকাশে হেলিকপ্টার, সেতুর দুই প্রান্তে স্পেশাল কমান্ডো টিমসহ উদ্বোধনস্থল এবং আশপাশের এলাকাজুড়ে থাকবে র্যাবের কড়া পাহারা। সেতু বিভাগ সূত্র মতে, পদ্মা সেতুর কারণে বদলে যেতে শুরু করেছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। সেতুটির কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে।
এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নতুন গতি পেয়েছে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠতে শুরু করেছে শিল্পকারখানা, স্কুল-কলেজ, পর্যটন কেন্দ্র। কৃষি ও মৎস্য-নির্ভর শিল্পকারখানা গড়ে উঠতে শুরু করেছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের প্রিয় ভ্রমণ ও অবকাশকেন্দ্র হয়ে উঠেছে পদ্মার পাড়।
সেতুর অবকাঠামো তৈরি হওয়ার পর থেকেই পর্যটকদের পথচারণা বাড়ছে। ইতোমধ্যে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্ত এলাকা পর্যটকদের আকর্ষনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হলে মংলা বন্দরের কর্মচাঞ্চল্য অনেক গুণ বেড়ে যাবে। ফরিদপুর, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ, খুলনা, নড়াইল, বাগেরহাট, সাতক্ষিরা, মংলা, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও মুন্সীগঞ্জসহ ২১ জেলায় নতুন শিল্পায়ন শুরু হয়েছে।
ইতোমধ্যে সড়ক পথে বিশাল পরিবর্তন এসেছে। ৩৮টি রুটে সরাসরি বাস যোগাযোগ শুরু হবে, চলবে বিআরটিসি বাসও। দেশের বড় বড় ব্যসায়ী প্রতিষ্ঠানসহ অনেক নতুন উদ্যোক্তা শিল্প-কারখানা গড়ার পরিকল্পনা নিয়েছেন। সব মিলিয়ে পদ্মার তীর ঘেঁষে হাতছানি দিচ্ছে সমৃদ্ধির দক্ষিণাঞ্চলরে।
ইতোমধ্যে জাজিরা প্রান্তে ক্যান্টনমেন্ট এবং স্কুল-কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান রিপোর্ট, হোটেল গড়ার কাজ হাতে নিয়েছেন। পদ্মারপাড়ে শরীয়তপুর ও মাদারীপুরের একটি অংশ নিয়ে প্রতিষ্ঠা করার হচ্ছে ‘শেখ হাসিনা তাঁতপল্লী’। যার মাধ্যমে দুই জেলার কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
এছাড়া ইতোমধ্যে এ অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায়, বিশেষ করে মহাসড়কের পাশে বিভিন্ন রকম শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কয়েকগুণ বেড়ে গেছে আশপাশের জমির দাম। কলকাতা-আগরতলা রেল যোগাযোগ আরও সহজ হবে। সেতুর উভয় পাশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড উৎসাহিত করতে বিসিক শিল্পনগরীগুলো চালু ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (বেজা) মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সমপ্রসারণসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শিল্প স্থাপনের সহায়ক নীতি গ্রহণ, মাশুল আদায়ে স্বয়ংক্রিয় ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রবাহে ফাইভার অপটিক ক্যাবল স্থাপন, মাস্টার প্ল্যানের আওতায় সেতুর উভয় পাশে উন্নয়নের ব্যবস্থা, পৃথক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন, নদীর উভয় পাশে ইকোপার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদুপর ও রাজবাড়িতে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে বাসা-বাড়িতে। যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় গ্রামেই দৃষ্টিনন্দন বাড়িঘর করার চেষ্টা করছেন অনেকেই। যার কারণে পাল্টে যেতে শুরু করেছে গ্রামীণ জীবনমান। হাট-বাজারগুলোতে বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানির শোরুম গড়ে উঠছে। পোশাক কারখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন অনেকে। এতে রাজধানীর ওপর বসতি চাপ অনেকটা কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শরীয়তপুর জাজিরা, মাদারীপুরের শিবচরসহ দুই জেলার যেকোনো প্রান্ত থেকে দূরত্ব ভেদে ৫০ মিনিট থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে ঢাকায় আসার প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা।
খুলনা প্রতিনিধির দেয়া তথ্য মতে, স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালু হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শিল্প স্থাপন শুরু হবে যেখানে এই অঞ্চলে বসবাসকারী হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার দুই কোটি মানুষের আঞ্চলিক বৈষম্য কমিয়ে আনবে।
সামাজিক উন্নয়ন ঘটবে, নতুন কল-কারখানা গড়ে উঠবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে এবং মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরের গুরুত্ব বাড়বে। ভোমরা, দর্শনা ও বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ এখন আরও সহজ হবে। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত, ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন এবং হজরত খান জাহান আলী রহ.-এর মাজার এবং বাগেরহাটে অবস্থিত ষাট গম্বুজ মসজিদ ঘিরে পর্যটনের ব্যাপক প্রসার ঘটবে।
উচ্চ শিক্ষা, কর্মসংস্থান, পর্যটন, পরিবহন, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, ফলমূল, শাকসবজি খাতের ব্যাপক প্রসারে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার স্বপ্নে বিভোর পিরোজপুর জেলার ১৮ লক্ষাধিক নর-নারী। পদ্মা সেতুর কারণে ঝালকাঠি থেকে ঢাকার দূরত্ব কমছে প্রায় ১০০ কিলোমিটার। শুধু যাতায়াতে সুবিধা নয়, ঝালকাঠি জেলার মানুষ অর্থনৈতিকভাবে অনেক লাভবান হবেন। পদ্মা সেতুর কারণে এ জেলায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে।
জায়গা জমির মূল্য বৃদ্ধি পাবে। বেকারত্ব কমবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পৌরসভার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে। আগে বিভিন্ন প্রকল্পের কর্মকর্তা বিশেষ করে বিদেশিরা পৌরসভা পরিদর্শনে আসতে ভয় পেতেন নদী পাড়ি দেয়ার কারণে। এখন তারা সড়কপথে নিজস্ব গাড়িতে প্রকল্প পরিদর্শনে এসে আবার দিনে দিনে ফিরে যেতে পারবে বলে জানান প্রতিনিধি।
শরীয়তপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ি, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনসহ পাল্টে যাবে জীবনমান। এসব জেলার নিজ ক্ষেত্রে উৎপাদিত পণ্য কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে রাজধানীর যেকোনো বাজারে বেচা-কেনা করতে পারবেন চাষিরা। অসুস্থ স্বজন নিয়ে পদ্মার পাড়ে আর অপেক্ষা করতে হবে না কাউকে, এ যেন শত প্রজন্মের গগনবিদারী আহাজারি সমাপ্ত হওয়ার পরশ তৃপ্তি।