আকাশবার্তা ডেস্ক :
নাসরিন জাহান তিথি তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে দেড় বছরের বাচ্চা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন স্বামীর খোঁজে। তার স্বামী ইসমাঈল হোসেন বাতেন পেশায় একজন কাঠমিস্ত্রী ছিলেন। নাসরিন জাহানের অভিযোগ, ১৯ জুন ২০১৯ সালে দুপুরের খাবার গ্রহণের জন্য তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে রওনা হয় তার স্বামী, পথিমধ্যে র্যাবের রাসেল আহমেদ কবিরের (কমিউনিকেশন এন্ড সিগনাল অফিসার ) নির্দেশে মেজর নাঈমের নেতৃত্বে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
তিনি বলেন, নিখোঁজের পর থানায় মামলা করতে গেলে থানা থেকে বলা হয় এটা র্যাবের বিষয়। আপনি র্যাব হেড কোয়ার্টারে যোগাযোগ করুন। র্যাবের কাছে গেলে র্যাব পুলিশের কাছে যেতে বলেন। ডিবি অফিস থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আবার কখনো নৌবাহিনী কার্যালয় থেকে র্যাব হেডকোয়ার্টারে। বাদ যায়নি মানবাধিকার সংগঠনের কাছে যাওয়াও। এই তিন বছরে কেউ আমার স্বামীর সন্ধান দিতে পারেরনি। আজ ‘কাঁদবো না বিচার চাইবো, প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাবদিহি চাইবো।’
নিখোঁজে হওয়া শতাধিক পরিবারের সদস্যরা স্বজনদের সন্ধানের দাবিতে শনিবার (২০ আগষ্ট) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ‘মায়ের ডাকের’ আহ্বানে সমাবেশে উপস্থিত হয়।
সমাবেশে বাতেনের স্ত্রী আরোও বলেন, আমার স্বামীর অপরাধ কী ছিলো? আমাদের আয়নাঘরে নিয়ে যান , আমরা স্বামীর সাথে আয়নাঘরে বন্দি থাকতে চাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার স্বামীকে ফেরত দিন। আমরা জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে থাকতে চাই না। এই অবুঝ শিশুদের দোষ কোথায়?
বাংলাদেশ পুলিশ প্রধান বেনজির আহমেদকে উদ্দেশ্য করে নাসরিন জাহান তিথি বলেন, আপনার আমলেই আমার স্বামী গুম হয়েছে। আপনারা আরাম আয়েশে থেকে আমাদের কষ্ট দিচ্ছেন। একদিন এর বিচার হবে। আপনারা কেউ পার পাবেন না।
২০১৩ সালে ঘুম হওয়া সাজিদুল ইসলাম সুমনের মেয়ে হাফসা ইসলাম রাইসা বাবার সন্ধান চেয়ে বলেন, গত বছরও ঠিক একই জায়গায় একই কথা বলে গিয়েছিলাম। বাবার মতো আমাকেও গুম করে দিন তাহলে বাবার সাথে দেখা করতে পারবো। গত ১০ বছরে যেহেতু প্রধানমন্ত্রীর কানে আমাদের কান্না ডুকেনি, তাই বলতে চাই আমাদের বাবাদের যদি মেরে ফেলেন তাহলে লাশটা একটু দেখতে দিন।
মায়ের ডাকের আহবানে সংহতি জানিয়ে সমাবেশে আরো উপস্থিত ছিলেন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফর উল্যাহ চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যর মাহমুদুর রহমান মান্না , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ নজরুল, গণ সংহতির জোনায়েদ সাকি, ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর ।
ভিপি নুরুল হক বলেন, বাংলাদেশের আকাশ বাতাস ভারী হয়ে গেছে। এই জগদ্দল পাথর সরাতে না পারলে আমরাও এর থেকে মুক্তি পাবো না। আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খানের আমলেও এমন জুলুম ছিলো না। আজ এমন অত্যাচার নির্যাতনের মাঝেও যারা প্রতিবাদ জানিয়ে যাচ্ছেন আমাদের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো।
এখানে অনেক পরিবার এসেছে, যাদের কথাগুলো আমরা কয়েকদিন পরপরই শুনি। কীভাবে তাদের স্বজনদের গুম করা হয়েছিলো। স্পষ্টতই পুলিশ, ডিবি, র্যাব ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে। তাদের কারো লাশ পাওয়া গিয়েছে, কাউকে মামলা দিয়ে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, কারো হদিস আজও পাওয়া যায়নি।
সম্প্রতি নেত্র নিউজের প্রতিবেদনে আয়নাঘরের বন্দীদের কথা উঠে এসেছে । আমাদের ধারণা সরকারি গোয়েন্দা বাহিনীর হেফাজতেই তারা বন্দি রয়েছে। যদি মায়ের ডাক আয়নাঘর ঘেরাও করার ডাক দেয়, আপনারা সেখানে শামিল হবেন। আর যদি কেউ ডাক না দেয় আমি ডাক দিবো। আয়নাঘর থেকে বন্দিদের মুক্ত করতে চাই।

তিনি বলেন, সাধারণ নাগরিকদের হয়রানি করা, মিথ্যা মামলা দেয়া, আয়না ঘরে বন্দি রাখা এসবের পেছনে সরকারের বড় কুশীলবরাই দায়ী। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তারেক সিদ্দীকি আয়নাঘরের অন্যতম হোতা। বাংলাদেশের গণ মাধ্যমের সাহস নেই এই ধরনের মাফিয়াদের বিরুদ্ধে নিউজ করার।
নুর বলেন- ঘুম, খুনের অভিযোগে বাংলাদেশের পুলিশের প্রধানকে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। আয়নাঘরের অনেক দায়িত্বরত অফিসারকে হিন্দি ভাষায় কথা বলতে শোনা যায়। অনেককে গুম করে সীমান্তে ওপারে ফেলে দেয়া হয়েছে। স্পষ্টতই আমরা বলতে পারি, শেখ হাসিনার এই ঘুম খুনের সাথে ওপারেরও কেউ কেউ জড়িত।
মাওলানা ভাসানী যে কথা বলেছিলেন, স্বাধীনতা অর্জন করেছি দিল্লির গোলামি করার জন্য নয়। শেখ হাসিনা যদি ক্ষমতায় থাকার জন্য দিল্লি শৃংখলে আবদ্ধ হতে চায়, তাহলে এর ফল ভালো হবে না। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের পতন না ঘটাতে পারলে আমরা কেউ এর থেকে মুক্ত হতে পারবো না।
সমাবেশে নিখোঁজে হওয়া পরিবারগুলোর স্বজনদের মাঝে আরো উপস্থিত ছিলেন- ব্যারিষ্টার আরমানের মা, ব্রিগেডিয়ার আব্দুল্লা আমান আযমীর স্ত্রী- সন্তান সহ শতাধিক পরিবারের সদস্যরা।
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ।