শনিবার ২১শে মার্চ, ২০২৬ ইং ৭ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আলোচনায় কূটনৈতিক শিষ্টাচার

আকাশবার্তা ডেস্ক : 

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে গত কিছুদিন ধরে বিদেশি কূটনীতিকদের বিতর্কিত মন্তব্যে দেশে নানামুখী আলোচনায় চলছে। সম্প্রতি ঢাকায় জাপানের রাষ্ট্রদূতের এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তোলপাড় শুরু হয়। এরপরে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এক বাড়িতে যাওয়ার পর ঘটে যাওয়া কর্মকাণ্ড নিয়ে কূটনীতিকদের শিষ্টাচারের প্রসঙ্গটি সামনে চলে আসে। শুধু নির্বাচনই নয়, বরং দেশে কোনো রাজনৈতিক সংকট এলেই তৎপর হতে দেখা যায় বিদেশি কূটনীতিকদের। সম্প্রতি কূটনীতিকদের এমন বক্তব্যের পর বিরোধী দল বিএনপি খুশি হলেও শাসক দল আওয়ামী লীগ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।

জানতে চাইলে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমসের মবিন চৌধুরী ভোরের কাগজকে বলেন, কূটনীতিকদের এমন মন্তব্য আমাদের দেশের জন্য নতুন কিছু নয়। বহু আগে থেকেই এসব মন্তব্য আমরা মেনে এসেছি। তবে এখন সময় এসেছে এসব বিষয় থেকে বেরিয়ে আসার।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ১৯৯০ সালের আগে দীর্ঘদিন দেশে সামরিক শাসন ছিল এবং সে সময়কার নির্বাচনগুলো নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে। কয়েকটি নির্বাচন প্রধান দলগুলো বর্জন করেছে। এরপর জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের পর ১৯৯১-এ অনুষ্ঠিত নির্বাচনটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত হয়। তবে এর কয়েক বছরের মধ্যেই নির্বাচন নিয়ে সংকট তৈরি হয়। দেখা দেয় রাজনৈতিক সংকট। আর তখনই বিদেশিদের নাক গলানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিদেশিদের ওই তৎপরতায় ক্ষমতার বাইরের রাজনৈতিক দলগুলোরও সায় ছিল।

বাস্তবতা হলো মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, পরবর্তী সময়ে একাধিক সামরিক শাসন, ১৯৯০ সালে রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জেনারেল এরশাদের পতন, এমনকি ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা পাওয়ার পরেও প্রতিটি রাজনৈতিক সংকটে এবং কম বেশি সব নির্বাচনকে ঘিরে প্রকাশ্যে কিংবা অপ্রকাশ্যে বিদেশি কূটনীতিকদের

তৎপরতা আলোচনায় এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে কোনো কোনো দল বা দলীয় নেতাকেও বিদেশি রাষ্ট্র যেমন চীনপন্থি কিংবা রাশিয়াপন্থি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফলে বাংলাদেশেও এসব দেশগুলোর প্রতিনিধি হিসেবে কূটনৈতিক দায়িত্ব নিয়ে যারা আসেন তারা শেষ পর্যন্ত আর শুধু এই দায়িত্বেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেন না। সবমিলিয়ে কূটনীতিকদের এমন মন্তব্যে দেশে শুরু হয় ‘বাহাস’।

জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, যারা এ দেশে রাষ্ট্রদূত আছেন তারা কোড অব কন্ডাক্ট সম্পর্কে জানেন। সে অনুযায়ী তারা চলবেন। তবে দুঃখের বিষয়, বিভিন্ন লোকজন অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে বিদেশিদের মতামত চান। যদিও তারা আমাদের অতিথি। দেশ সম্পর্কে বাংলাদেশিদের চেয়ে তাদের জ্ঞান কম। তারপরেও তাদের কাছে যাচ্ছেন। এ সংস্কৃতি পরিবর্তন করা দরকার। সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনা করে সমস্যা সমাধানে অদক্ষতা কিংবা অনাগ্রহ এবং দেশে নির্বাচন নিয়ে সংকটের কারণেই বিদেশি কূটনীতিকরা কথা বলার সুযোগ পান।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধের পর বিরোধী দল হিসেবে জাসদ গঠন, ১৫ আগস্টের ঘটনা এবং এরপর ধারাবাহিকভাবে যত ঘটনা ঘটেছে সব কিছুর সঙ্গেই ঢাকায় কর্মরত কূটনীতিকদের ভূমিকা সম্পর্কে নানা তথ্য উঠে এসেছে। ভবিষ্যতে হয়তো আরো আসবে। ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র ফিরে এলেও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা হয়নি। ফলে সংকট যেমন অনিবার্য হয়ে ওঠে তেমনি সংকটের পথ ধরে তাদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়। আর আমাদের রাজনীতিবিদরাই এ সুযোগ তৈরি করে দেয়। আবার যেসব দেশ বেশি সহায়তা দেয় তারা কোনো ইস্যুতে কথা বলার সুযোগও বেশি পায়।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শান্তনু মজুমদার ভোরের কাগজকে বলেন, দুটো বাস্তবতার কারণে কূটনীতিকরা কথা বলার সুযোগ পান। তবে যে বাস্তবতায়ই থাকুক না কেন বর্তমানে অর্থনীতি যেভাবে গতিশীল রয়েছে সেটি যদি অব্যাহত থাকে তাহলে কূটনীতিকদের এমন কথাবার্তা আপনাআপনিই বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেই শক্তিশালী দেশগুলো আমাদের তোয়াজ করতে শুরু করবে, হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। তবে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন বলেন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের মতো ইস্যুগুলোতে সুযোগ থাকলে কথা সবাই বলবে এবং এসব কারণেই বিদেশি কূটনীতিকদের রাজনৈতিক ইস্যুতে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না বাংলাদেশ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০০৬ সালের শেষ দিকে এবং ২০০৭ সালের প্রথম দিকে ঢাকায় নিযুক্ত পশ্চিমা দেশের কয়েকজন কূটনীতিক ছিলেন বেশ তৎপর। উইকিলিকসে প্রকাশিত মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রেসিয়া বিউটেনিসের গোপন তারবার্তা থেকে জানা যায়, ঢাকাস্থ পশ্চিমা কূটনীতিকরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য নিজেদের মধ্যে নিয়মিত বৈঠক করতেন। যার নাম দেয়া হয়েছিল ‘কফি গ্রুপ’। এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি এবং জাতিসংঘের প্রতিনিধি। এই গ্রুপে জাপানকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে বরাবরই বিরোধী দলগুলোকে নানা ঘটনায় কূটনীতিকদের দ্বারস্থ হতে দেখা যায়। এসব দলই আবার ক্ষমতায় গেলে কূটনীতিকদের সবসময় কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে চলার পরামর্শ দিয়ে থাকে। তবে ভালো খারাপ যাই হোক, তুমুল রাজনৈতিক সংকটের জের ধরে বিদেশি কূটনীতিকদের আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতার ইতিহাসও আছে বাংলাদেশে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে ঢাকায় এসেছিলেন তখনকার কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান স্টেফান। ২০১৩ সালে জাতিসংঘ মহাসচিবের দূত হয়ে ঢাকায় এসে দুপক্ষকে এক জায়গায় আনার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন অস্কার ফার্নান্দেজ-তারানকো। পরে ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি। আবার ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগেও নানা ধরনের তৎপরতায় সম্পৃক্ত হয়েছিলেন বিদেশি কূটনীতিকদের অনেকে। এর মধ্যে ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ঢাকায় এসে ব্যস্ত সময় পার করেছিলেন ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল বিশেষ করে বিরোধী দলগুলোকে কেন বিদেশি কূটনীতিকদের দ্বারস্থ হতে হয় এমন প্রশ্নের জবাবে সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বাংলাদেশ তো বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। সে কারণেই গণতন্ত্রের সমস্যা হলে গণতান্ত্রিক বিশ্ব কথা বলে। অর্থাৎ এখানে একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তারা দেখতে চায়। আমরাও গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছি। সেজন্য যারাই গণতন্ত্র দেখতে চায় তাদের আমরা স্বাগত জানাই।

এর বিপরীতে ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ ও দেশীয় ষড়যন্ত্রে সাংবিধানিক চর্চা ও নির্বাচনী সংস্কৃতি থেকে ঢাকাকে বিচ্যুত করা যাবে না’ বলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছেন সরকারের তিন মন্ত্রী। গত ১১ ডিসেম্বর আইনমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে। কোনো ধরনের দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র প্রধানমন্ত্রীকে সাংবিধানিক দায়িত্ব, গণতন্ত্র ও মানুষের স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব পালন থেকে দমিয়ে রাখতে পারবে না। কেননা, এই সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার, জনগণ যা চাইবে তাই হবে। বাইরের কোনো শক্তি বা অভ্যন্তরীণ কোনো ষড়যন্ত্রে কাজ হবে না। সরকার এই মাটিতে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় লড়াই করে যাবে। পশ্চিমা দেশের অযাচিত চাপের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। আশা করব, বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি কূটনীতিকরা শিষ্টাচার মেনে চলবেন, যেমনটি তাদের দেশগুলোতে অন্য দেশের কূটনীতিকরা মেনে চলেন।

সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, কিছু দেশ যখন কোনো সরকারকে চাপে রাখার চেষ্টা করে তখন তারা সংশ্লিষ্ট দেশে মানবাধিকারের ধোয়া তুলে। অথচ তাদের নিজ দেশেই চরমভাবে মানবাধিকার লংঘিত হয়। বিদেশী কূটনীতিকদের ভিয়েনা কনভেনশন মেনে চলা উচিত। তারা ভিয়েনা কনভেনশন মেনে চললেই অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে পারবে না।

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

মার্চ ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« ফেব্রুয়ারি    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১