আকাশবার্তা ডেস্ক :
২ সেপ্টেম্বর ১০ জিলহজ্ব বিশ্ব মুসলিম উম্মার দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় অনুষ্ঠান পবিত্র ঈদ-উল আযহা বা কোরবানির ঈদ। ‘কোরবানি’ শব্দটি আরবি ‘কুরব’ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ নৈকট্য বা সান্নিধ্য। আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে আত্মোৎসর্গ করাই হলো কোরবানি। আল্লাহর বিধান অনুযায়ী আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি লাভের আশায় জিলহজ্ব মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত হালাল পশু (উট, দুম্বা, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া) জবাই করাই হলো কোরবানি।
উল্লেখ্য কোরবানি দেয়া পশু হতে হবে নিখুঁত এবং ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী যে পরিমাণ মাল থাকলে যাকাত দেয়া ফরজ ঈদুল আযহার দিনে সেই পরিমাণ মাল থাকলে প্রতি নরনারীকে কোরবানি দেয়া ওয়াজেব।
হজরত আদম (আ.) থেকে সর্বশেষ নবী ও রাসুল হযরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সব নবী-রাসুল ও তাঁদের অনুসারীরা কোরবানি করেছেন। ইতিহাসে বর্ণিত হযরত আদম (আ.) এর দুই পুত্র হাবিল-কাবিলের মাধমে প্রথম কোরবানির সূত্রপাত হয়। ইরশাদ হয়েছে “আদমের পুত্রদ্বয়ের (হাবিল-কাবিলের) বৃত্তান্ত তুমি তাদের যথাযথভাবে শুনাও। তাঁদের একজন বললেন, ‘আমি তোমাকে হত্যা করবই’। অপরজন বললেন, ‘আল্লাহ মুত্তাকিদের কোরবানি কবুল করেন।” (সূরা আল মায়িদা, আয়াত-২৭)। তারপর আল্লাহর নবী হজরত নূহ (আঃ) হজরত ইয়াকুব (আ.), হজরত মূসা (আ.) এর সময়ও কোরবানির প্রচলন ছিল।
তবে হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর সময়ে আল্লাহর নির্দেশে কোরবানি দেয়ার ঘটনা মুসলিম সমাজে সমধিক পরিচিত। আজ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে কোরবানি দেয়ার জন্য একরাতে স্বপ্নে আদিষ্ট হন। তিনি পরপর তিনদিন দৈনিক ১০০ করে ৩০০ উট কোরবানি করেন। কিন্তু তাঁর কোরবানি আল্লাহর দরবারে কবুল হলো না। তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন। আল্লাহ আবার একইভাবে তাঁর প্রিয় বস্তুকে কোরবানি দিতে আদেশ করলেন।
সবশেষে তাঁর প্রিয় শিশু পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) কে আল্লাহর রাহে কোরবানি দিতে মনস্থির করলেন। বিষয়টি তিনি তাঁর পুত্র এবং স্ত্রী হযরত হাজেরা (আ.) কে বললেন। পরদিন তাঁর স্ত্রী শিশু পুত্র হযরত ইসমাইলকে (আ.) সাজিয়ে হযরত ইব্রাহিম (আ.)এর সাথে দিলেন। হযরত ইব্রাহিম (আ.) পুত্র ইসমাইল (আ.) কে মিনা প্রান্তরে নিয়ে তপ্ত বালুতে শুইয়ে পুত্রের গলায় তীক্ষ্ম ছুরি চালালেন চোখ বন্ধ করে। অল্পক্ষণ পর চোখ খুলে হযরত ইব্রাহিম (আ.) দেখেন তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন শিশুপুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) আর জবাই হয়ে আছে একটি দুম্বা। আল্লাহর পরীক্ষায় হযরত ইব্রাহিম (আ.) উত্তীর্ণ হন। সেই থেকে আল্লাহ পাকের নির্দেশে বিশ্বের তাবৎ সামর্থবান মুসলমান হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর সুন্নত হিসেবে কোরবানি পালন করে আসছেন।
হযরত ইসমাইল (আ.) নিজের প্রাণকে আল্লাহ রাহে উৎসর্গ এবং হযরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার এ ঘটনা আল্লাহর প্রেমে নিজেদের উৎসর্গ করা সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ কোরবানি। আল্লাহ পাকের বিধান অনুযায়ী কোরবানির গোশত তিনভাগ করে এক ভাগ নিজেদের জন্য একভাগ আত্মীয় স্বজনের এবং একভাগ গরীব দুঃখী মানুষ ও মিস্কিনদের মধ্যে বণ্টন করতে হয়।
স্মরণ রাখতে হবে কোরবানিরপশু আল্লাহর কাছে পৌঁছে না। এ বিষয়ে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন “আল্লাহর কাছে পৌঁছে না তাদের কোরবানির পশুর গোশত এবং রক্ত বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া। এভাবে তিনি এদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর।” (সূরা আল-হজ্ব, আয়াত- ৩৭)। মনে রাখতে হবে কোরবানির মধ্যে নিহিত রয়েছে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকা ঈমানের অঙ্গ।
তাই সকল কোরবানি দাতাদের প্রতি অনুরোধ কোরবানি দেয়া পশুর রক্ত ও বর্জ্য পানি দিয়ে ভাল করে পরিস্কার করে দেবেন। এই পবিত্র দিনে দেশ ও মানবজাতির শান্তি কামনায় আসুন সবাই আল্লাহ পাকের দরবারে মোনাজাত করি। আমিন।