
আকাশবার্তা ডেস্ক :
মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষকে হত্যা, শিরশ্ছেদ এবং পুড়িয়ে মারা তো চলছেই। শিশুদেরও রেহাই দিচ্ছে না দেশটির সামরিক বাহিনী, নিরাপত্তা বাহিনী ও তাদের মদদপুষ্ট কট্টর বৌদ্ধ মিলিশিয়ারা। ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের এ ঘটনার প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেছেন বিশ্ব নেতারা। জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার জেইদ রাদ আল হোসেন এই সামরিক অভিযানকে জাতিগত নিধনের আদর্শ উদাহরণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। আর এ ঘটনায় বিশ্বের নজর সু চির দিকে। তার বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা শুরু হলেও, গণহত্যার জন্য দায়ী আসল ব্যক্তিটির নাম সরকারি বিবৃতি বা মিডিয়ায় উচ্চারিত হচ্ছে না। মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং আসলে রোহিঙ্গা নিধনের সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছেন। বলা হচ্ছে, তিনিই চলমান এই গণহত্যার খলনায়ক।
এদিকে অনেক বিশেষজ্ঞের ধারণা, এই সেনাপ্রধান বিশ্বজুড়ে সু চির নিন্দাই দেখতে চান। তিনি জানেন, সু চির ওপর যত নজর আসবে, ততই তিনি নিজে বিশ্ব গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর এড়াতে পারবেন। তার পক্ষে সম্ভব হবে কোনো বাধাবিঘ্ন ছাড়াই রোহিঙ্গা গণহত্যা ও বিতাড়ন চালিয়ে যাওয়া। এরই মধ্যে দেশটির ১৭৬টি গ্রাম রোহিঙ্গাশূন্য হয়ে গেছে। তার পরও থামছে না সেনা নৃশংসতা।

কেউ কেউ বলছেন, মিয়ানমারে একজনই পারেন রোহিঙ্গা নিধন থামাতে, আর তিনি সু চি নন। তিনি হলেন, জেনারেল মিন অং হ্লাইং।
মিয়ানমারের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের দিকে নজর রাখলে, অং সান সু চির কর্মকাণ্ডে হতবাক হয়ে পড়বে যে কেউ। রাখাইন অঙ্গরাজ্যে সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে তার প্রতিক্রিয়া বিশ্বকে হতাশ করেছে। সেখানে যে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে, এই কথা তার অস্বীকার করা উচিত নয় বলে সমালোচনা করে আসছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। ১৩ নোবেলজয়ীসহ বিশ্বের কাছে শ্রদ্ধেয় অন্তত ৩০ জন ব্যক্তিত্ব একই কথা বলছেন। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদও সম্প্রতি একটি যৌথ বিবৃতিতে মিয়ানমারের প্রতি অবিলম্বে সেনা সহিংসতা বন্ধ এবং রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। জাতিগত নিধনের এই ঘৃণ্য সেনা অভিযানের সমালোচনা করেছেন মুসলিম বিশ্বের নেতারা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। কানাডার প্রেসিডেন্ট জাস্টিন ট্রুডো, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সবারই চাওয়া রোহিঙ্গাদের পক্ষে সরব হওয়া উচিত সু চির। কিন্তু তিনি নীরবতা ভাঙতে পারছেন না, রোহিঙ্গাদের নিয়ে কিছু বলছেন না বরং দেশটির সেনাবাহিনী ও মুসলিমবিদ্বেষী কট্টর বৌদ্ধদের সঙ্গেই গলা মেলাচ্ছেন। বলছেন সেখানে রোহিঙ্গাদের কাউকে নির্যাতন করা হচ্ছে না, সেনাবাহিনী কেবল জঙ্গিবিরোধী ক্লিয়ারেন্স অপারেশ চালাচ্ছে।
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী তাদের সর্বাধিনায়ক মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বে জঙ্গি নিধনের নামে বেসামরিক রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বড় আকারে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। প্রাণভয়ে এরই মধ্যে ৪ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। চলতি মাস নাগাদ এ সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা। রাখাইনের অভ্যন্তরেও লাখ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয়হীন হয়ে পড়ছে। এখনও সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। ঘরবাড়ি পুড়ি দিয়েছে। সাধারণ রোহিঙ্গাদেরও বাধ্য করছে নিজেদের ঘরে আগুন লাগিয়ে সেনাবাহিনীর নির্দেশমতো দেশ ছাড়তে। সেনাবাহিনী স্পষ্ট করেই বলছে, দেশ ছাড়ো, না হয় গুলিতে মরো। নারীদের গণহারে ধর্ষণ করে বাড়ির আশপাশে গলা কেটে ফেলে রাখছে সেনারা।
এদিকে দেশটির ক্ষমতাকাঠামোর দিকে তাকালেও স্পষ্ট হয়ে উঠে সু চির সরকার নয়, দেশটিতে সে তুলনায় অনেক বেশি ক্ষমতাশালী সেনাবাহিনী এবং এর প্রধান মিন অং হ্লাইং। সেনাবাহিনীই মিয়ানমারের সংবিধানের খসড়া করেছে। এই সংবিধান অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর ওপর সু চির কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। গণতান্ত্রিকভাবে আংশিক নির্বাচিত সু চি ও তার দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি আসলে সেনানির্ভরশীল হয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছে। আর সেনাবাহিনীই রয়ে গেছে স্বেচ্ছাচারী ও রাজনৈতিকভাবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী একটি অভিজাত গোষ্ঠী হিসেবে। তারাই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয় এবং সু চি সরকার কিংবা সু চির পছন্দের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তা নিয়ে পরামর্শ করারও প্রয়োজন বোধ করে না এই বর্বর সেনাবাহিনী। শুধু তাই নয়, দেশটির পুলিশ, নিরাপত্তা বাহিনী, কারাগার ও সীমান্ত-সংশ্লিষ্ট বিষয়ও সেনা নিয়ন্ত্রণে। এ ছাড়া সেনাবাহিনীর জন্য পার্লামেন্টে ২৫ শতাংশ আসন সংরক্ষিত। যেহেতু সংবিধান সংশোধনের জন্য ৭৫ শতাংশ এমপির সমর্থন প্রয়োজন, সেই হিসাবে এক ধরনের ভেটো ক্ষমতাই ভোগ করছে সেনাবাহিনী। তাই শেষ পর্যন্ত মিয়ানমার চালায় আসলে সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং এবং তার নেতৃত্বাধীন একটি অঘোষিত দ্বিতীয় এক সরকার। এই সরকার হলো সশস্ত্র সরকার। অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন, জাতিগত নিধনের নেপথ্যে থাকা এই খলনায়কের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা উচিত এখনই। কারণ তার নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনীর গায়ে এখন রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চালানো জাতিগত নিধনের কলঙ্ক লেগে আছে।
সাম্প্রতিক এই সামরিক অভিযানের আগেও, মিয়ানমার সেনাবাহিনী সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে জাতিসংঘের তদন্তাধীন ছিল।
সর্বশেষ রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ শুরু আগেই জাতিগত নিধনের জন্য মিন অং হ্লাইংকে দায়ী করে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জাতিসংঘে তদন্ত চলছে। মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সংস্কারের পথে প্রধান বাধা তিনি। কিন্তু এর পরও তাকে কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক চাপ সহ্য করতে হচ্ছে না।
অনেকেই একমত যে, মিন অং হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সচেষ্ট হতে হবে। মিয়ানমারের সঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা বন্ধ করতে হবে। তার বিদেশ ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে। জাতিসংঘের বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগে বড় দেশগুলোর উচিত মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সামরিক অবরোধ আরোপ করা। সামরিক বাহিনীর মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যেতে পারে। নিরাপত্তা পরিষদ চাইলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতেরও দ্বারস্থ হতে পারে।
আরও অনেকভাবে মিন অং হ্লাইংকে চাপ দেওয়ার মাধ্যমেই রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চলমান জাতিগত গণহত্যা বন্ধ করার পথ উন্মুক্ত হতে পারে। হাফিংটন পোস্ট ও ইরাবতি অবলম্বনে।
সূত্র : দৈনিক সমকাল।