
মো. আলাউদ্দিন, বিশেষ প্রতিনিধি :
মিয়ানমার থেকে গণহত্যা ও নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে সাময়িকভাবে কক্সবাজারের বিভিন্নস্থানে আশ্রয় দেওয়া হলেও তাদেরকে স্থায়ীভাবে পুনর্বাসনের কথা ভাবছে সরকার। নোয়াখালীর অদূরে জেগে ওঠা ‘ভাসান চরে’ তাদেরকে পুনর্বাসন করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওয়াশিংটনে সফররত প্রধানমন্ত্রী ভয়েস অব আমেরিকার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে একথা জানান। তিনি জানিয়েছেন, চরটি জালিয়ার চর, ঠেঙ্গার চর নামে পরিচিত হলেও ‘ভাসান চর’ নামটা তাঁর পছন্দ। এ নামেই চরটির নামকরণ করা হবে এবং সেখানেই অসহায় রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের বিষয়টি এখন অনেকটাই চূড়ান্ত। ইতোমধ্যে চরটিতে কাজ শুরু করেছে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার লোকেরা। চরটি বসবাসের উপযোগী করে তোলার পর সেখানে নেওয়া হতে পারে রোহিঙ্গাদের। গত কয়েকদিনে নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে এসেছে প্রায় সাড়ে চার লাখ রোহিঙ্গা। এরআগেও প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে আসে এবং কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্পে অবস্থান করছে। ‘ভাসান চরে’ তাদের সবার পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। হাতিয়া উপজেলার মূলভূখন্ড থেকে ২০ কিলোমিটার পূর্বে মেঘনা নদীপথ পার হলে ভাসান চরের অবস্থান। বর্তমানে ওই চরটির আয়তন প্রায় ৩৩০ বর্গকিলোমিটার অর্থাৎ হাতিয়া মূল ভূখন্ডের আয়তনের প্রায় সমান। এছাড়া দ্বীপটির চতুর্দিকে প্রতিবছর গড়ে ৩৫/৪০ বর্গকিলোমিটার ভূমি জেগে উঠছে।
স্থানীয়রা জানায়, ১৯৯০ সালের দিকে স্থানীয় জেলেরা এখানে একটি ডুবোচরের অস্থিত্ব খুঁজে পায়। পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে ডুবোচরটির আয়তন বৃদ্ধির পাশাপাশি একই সময় দক্ষিণে আরও একটি নতুন চর জেগে ওঠে। স্থানীয় জেলেদের কাছে এটি ‘গাঙ্গুরিয়ার চর’ নামে পরিচিত। ভাসান চর (ঠেঙ্গারচর) এর তিন কিলোমিটার পশ্চিমে অর্থাৎ হাতিয়া মূল ভূখন্ডের পূর্ব দিকে ‘ইসলাম চর’ নামক একটি চর তিন দশক পূর্বে জেগে উঠে। ৪০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ওই চরটি বিলীন হয়ে বর্তমানে ১৫ বর্গকিলোমিটারে এসে ঠেকেছে। ভাসান চরের পূর্বদিকে সন্দ¦ীপ উপজেলা এবং উত্তরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর (রিচার্জ সেন্টার) প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্বর্ণদ্বীপের অবস্থান। বিশেষ করে এর দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব এবং উত্তর দিকে প্রচুর ভূমি জাগছে। বিশাল চরটিতে মহিষের কয়েকটি বাথান রয়েছে।
এছাড়া বঙ্গোপসাগরের মৎস শিকারীরা এখানে সাময়িক বিশ্রাম নেয়। হাতিয়া মূল ভূখন্ড থেকে ট্রলার যোগে ভাসান চর যেতে সময় লাগে প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা। কয়েক বছর আগে স্থানীয় বনবিভাগ এখানে বনায়ন শুরু করে। ফলে ভাসান চরে বিভিন্ন অংশে গাছ-গাছালিতে ভরে গেছে। একসময় এই চরসহ পুরো উপকূলীয় অঞ্চল জলদস্যু ও বনদস্যু অধ্যুষিত থাকলেও এখন দৃশ্যপট পাল্টেছে। বিশেষ করে হাতিয়ার ‘জাহাইজ্যার চর’ বর্তমান স্বর্ণদ্বীপে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পাশাপাশি নৌ-বাহিনী ও কোস্টগার্ডের তৎপরতার সুবাদে আইন-শৃঙ্খলা সহনীয় অবস্থায় রয়েছে। গত কয়েক মাস আগে প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন, হাতিয়ার সাবেক এমপি ও আওয়ামীলীগ নেতা মোহাম্মদ আলী, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, ইউএনও, পৌর মেয়র ও ওসিসহ কর্মকর্তারা ভাসান চর পরিদর্শন করেন।
এ সময় তারা ভাসান চরের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন। ইতিমধ্যে চরটির অভ্যন্তরে হেলিপ্যাড ও অভ্যন্তরীণ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে এবং সেখানে নৌ-বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। এ চরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের পদক্ষেপ হিসেবে চরের চতুর্দিকে বেড়িবাঁধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পরবর্তী সময়ে এখানে সড়ক ও অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।
হাতিয়া আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আয়েশা ফেরেদৌস বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পুনর্বাসনে সরকারের মহতি উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। এজন্য আমার পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’ ভাসান চরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হাতিয়ার সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা মানবিক দিক বিবেচনা করে অসহায় রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে যে মহতি উদ্যোগ নিয়েছেন সেটা ইতিহাস হয়ে থাকবে।’
সাবেক সাংসদ বলেন, ‘স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ আমরা প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। একই সাথে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে আমরা প্রস্তুত।’ তিনি জানান, ভাসান চরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের জন্য পর্যাপ্ত ভূমি রয়েছে। আগামী দুই বছরে এখানে অন্তত ১০ লাখ রোহিঙ্গা পুনর্বাসন সম্ভব হবে।