আকাশবার্তা ডেস্ক :
কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকা কিশোরী, তরুণী এমনকি বিশোর্ধ নারীরা যৌন, মাদকপাচারসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে জানা গেছে। এদের অনেকেই জোরপূর্বক কিংবা জীবনের তাগিদে বাধ্য হয়েই এসবে জড়িয়ে পড়ছে। সম্প্রতি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এমন ঘটনা উল্লেখ করে বেশকিছু প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে।
এসব রোহিঙ্গা নারী, শিশু ও তরুণীরা যৌন হয়রানিকে ‘হয়রানি’ বলে মনেই করে না। তারা এটাকেই স্বাভাবিক জীবন মনে করছে। অনেকের এ নিয়ে নেই কোনো অভিযোগও। যে দু-চারটি যৌন হয়রানির ঘটনায় ভুক্তভোগীর অভিযোগ আসছে তা বাধ্যতামূলক যৌন হয়রানির ফলে শারীরিক অসুস্থতার কারণে। নিয়ন্ত্রণের অভাবে এসব নারী ও তরুণীদের অনেককেই কক্সবাজারসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা সদরে আবাসিক হোটেলগুলোতে যৌন পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ কাজে গড়ে উঠেছে বেশকিছু চক্রও।
সম্প্রতি সচিবালয় সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এসব রোহিঙ্গা নারীদের সচেতনতায় মনিটরিং কাজ করছে। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত এসব নারী ও শিশুদের মেন্টাল হেল্থ সার্ভিসিং কার্যক্রমের সাথে যুক্ত আছে বেশকিছু আন্তর্জাতিক ও জাতীয় মানবাধিকার সংস্থাও। মিয়ানমার থেকে আসা ১০ লাখ শরণার্থীর মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা প্রায় ৬ লাখের ওপর। এসব নারী ও শিশুরা এমনিতেই নানা দুর্যোগ মোকাবিলা করে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এর সাথে যুক্ত হয়েছে তাদের অভিভাবকহীনতা। নেই তাদের সঠিক গাইডলাইন দেওয়ার মতো নিকটতম কেউ। যখনই কোনো নারী বা তরুণী কারো পরামর্শ নিতে যাচ্ছে উল্টো তাদেরই খপ্পরে পড়ে যৌন হেনস্তাসহ বিভিন্ন হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। হঠাৎ করেই প্রায় ১০ লক্ষাধিক মানুষের আগমন ঘটলেও অপ্রীতিকর এসব ঘটনা দমনে আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি করা যায়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য সংখ্যা। ফলে এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কোনো ডাটা সংগ্রহ করতে পারছে না বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন সূত্র। একারণে এসব অপরাধবিরোধী পদক্ষেপ গ্রহণও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সরকারি ব্যবস্থাপনায় রিজোনাল ট্রমা কাউন্সিল ও মেন্টাল হেল্থ সার্ভিস সেন্টারে দীর্ঘদিন কাজ করেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট নাফিসা সুলতানা। এ বিষয়ে তিনি আমার সংবাদকে বলেন, সম্প্রতি এসব নারী ও শিশুদের যৌন নির্যাতনের চিত্র বেড়ে গেছে। অনেক নারী সেখানে স্বেচ্ছায় যৌনকর্মের সাথে যুক্ত হচ্ছে। আবার অনেকে জোরপূর্বক নির্যাতনের শিকার হয়। অনেক মেয়ে শিশু ও তরুণী আছে যারা এসব নির্যাতনকে স্বাভাবিক বলেই মনে করছে। ফলে যে কেউ তাদের এ ধরনের প্রলোভেন দিলে সহজেই মেনেও নিচ্ছে। এরপর যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে শারীরিক যন্ত্রণা বেড়ে গেলে আমাদের কাছে এসে অভিযোগ করে। এ সংখ্যা কম নয় বলে প্রতিবেদকের সাথে মুঠোফোনে এক আলাপচারিতায় উল্লেখ করেন এ সাইকোলজিস্ট।
‘তারা (রোহিঙ্গা নারী ও তরুণী) যে এ ধরনের অ্যাবিউজ (নির্যাতনের শিকার) হচ্ছে এ ব্যাপারে প্রথমে আমরা তাদের সচেতন করি। কারণ তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মনে করছে এটা তো নরমাল এক্টিভিটি। কীভাবে এমন অবস্থা থেকে বের হতে হবে এবং নির্যাতনের শিকার হলে কার কাছে অভিযোগ দেবে তা আমরা অ্যাডভাইস করি।’ ‘বাচ্চাদেরও সচেতন করতে হচ্ছে, তারা আদৌ ব্যাট টাস্ক (খারাপ কাজ) কোনটা এবং গুড টাস্ক (ভালো কাজ) কোনটা তা জানে না। কোনটা যৌন হয়রানি অর্থাৎ তরুণীদের সাথে কেউ ব্যাড টাস্ক করলে তারা কাকে জানাবে তাও তাদের বলে দিতে হচ্ছে, বলেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিষ্ট নাফিসা সুলতানা।
এমন যৌন হয়রানি বেড়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা মহিলা ও শিশু অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সাবিনা নাসরিন আমার সংবাদকে বলেন, তারা অনেকদিন ধরে সেখানে থেকে স্ট্যাবল পর্যায়ে আছে। বলতে গেলে তাদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া হচ্ছে। তাদের কোনো কাজ নেই। ফলে সেখানকার পুরুষরা অতিরিক্ত যৌনশক্তি অর্জন করছে। এজন্য তাদের ঘরে থাকা স্ত্রীদের টর্চার করছেÑ এমন ঘটনায় ডিভোর্সের ঘটনাও ঘটছে। পুরুষরা ক্যাম্পে থাকা অন্য নারীদের সাথে বাধ্যতামূলক যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে। ‘আমরা এ পর্যন্ত রোহিঙ্গা এসব নারীদের যৌনসহ নানা হয়রানির শিকার প্রায় ৯ হাজার নারী ও শিশুকে মেন্টাল থেরাপি দিয়েছি, যা মোট নারীর তুলনায় খুবই কম। যাদের অধিকাংশই স্বজনহারানো ও যৌন হয়রানির শিকার হয়ে হতাশ।
সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকা মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব লায়লা জেসমিন এ প্রতিবেদককে বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নারী ও শিশুদের কাউন্সিলিং ও মানসিক থেরাপি দিতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত ১০টি রিজোনাল ট্রমা কাউন্সিলিং সেন্টার স্থাপন করেছি। প্রতিটি সেন্টারে একজন করে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, সাইকো সোস্যাল কাউন্সিলর ও একজন ভলান্টিয়ার রাখা আছে। যদিও এটা মোট ভুক্তভোগীর তুলনায় খুবই কম।
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, হঠাৎ এক জায়গায় এত লোকের আগমন ঘটলে এ ধরনের সমস্যা হয়। তাছাড়া পুলিশের সংখ্যাও এতো বেশি নয়। তবে আমাদের বাহিনীগুলোকে বলা আছে বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে। এখন যেহেতু এসব বিষয়ে আপনারা (সাংবাদিক) কাজ করছেন এজন্য একটা পরিসংখ্যানতো নিতে হবে। এসব যৌন হয়রানির ঘটনায় কোনো মামলা বা কাউকে গ্রেপ্তার বিষয়ে।
এ পর্যন্ত রোহিঙ্গা নারী ও শিশু নির্যাতনের কোনো তথ্যচিত্র নেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। তারা বলছেন, এ বিষয়টি নিয়ে আমাদেরও আশঙ্কা আছে। একসাথে এত মানুষ থাকলে নানা অপরাধমূলক ঘটনা ঘটবে এটা স্বাভাবিক। প্রয়োজনে আমরা লোকাল থানাগুলো থেকে অপরাধসংক্রান্ত যে তথ্য গ্রহণ করি সেখানে রোহিঙ্গা সম্পর্কিত অপরাধের আলাদা একটি কলাম যুক্ত করবো। তথ্য পেলে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবো বলে জানান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের উপসচিব আবু হেনা মোস্তফা জামান।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ কর্মকর্তা বলেন, রোহিঙ্গা নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় এ পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য আমার কাছে আসেনি। তবে বড় কোনো ঘটনার তথ্য আপনাদের মাধ্যমে এলে লোকাল প্রশাসনকে চিঠি দিয়ে নির্দেশনা দেবো। অতিরিক্ত ১০ লাখ মানুষের বসবাসস্থলে বাড়তি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিয়োগ করা হয়েছে কিনাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেখুন আমাদের দেশের মোট জনবলের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংখ্যা খুবই কম। সেখানে কীভাবে এটা সম্ভব। তবে বর্ডারে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আমরা সতর্ক থাকতে বলেছি। ‘অপরাধপ্রবণ এসব নারী ও পুরুষ কিছুটা কৌশলীও বটে। শহর বা গ্রামে তারা যেভাবে চলাফেরা করে তাদের দেখে তো চেনা যায় না। তারা ভাষায় ও চেহারায় আমাদের দেশি মানুষের কাছাকাছি। ধরতে পারলেও আবার ক্যাম্পে ফেরত দেওয়া এটা একটা লম্বা প্রক্রিয়া।
এএইচ/আমার সংবাদ