মনিরুল ইসলাম :
বর্তমান সরকার মাদক বন্ধের তাকিদে সারাদেশ ব্যাপী কঠোরভাবে বিভিন্ন বাহিনী দ্বারা সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে মাদক বন্ধ করার ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রেখেছেন। কিন্তু থেমে নেই মাদক ব্যাবসা ও মাদক সেবনের প্রবণতা। যাতে করে ধ্বংসের পথে নিমজ্জিত হচ্ছে এই সোনার বাংলার তরুণ ও যুব প্রজন্ম। কোনভাবেই যেন তাদের ফিরিয়ে আনা যাচ্ছেনা মাদকের করাল গ্রাসের ছত্রছায়া থেকে। এতে করে অন্ধকারের করাল ছোবলের মুখে পতিত হতে পারে দেশ-জাতি ও সমাজ।
মাদকের প্রথম ভাগটা কিন্তু শুরু হয় শখ দিয়ে! বন্ধু-বান্ধবের পাল্লায় পড়ে প্রথমত শখের বসে দু-একবার সেবন, হতে পারে সেটা অনিচ্ছা সত্বেও। এভাবে বেশ কিছুদিন চলতে থাকার পর এই শখ রূপান্তরিত হয় নেশায় অতপর সেটা একসময় গিয়ে দাঁড়ায় পেশাতে।
যুক্তিগত দিক থেকে দেখতে গেলে একজন মাদকসেবী মাদক সেবনে অভ্যস্ত হবার পর আস্তে-ধীরে চিনতে থাকে মাদকের আখড়াগুলো। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশি নিলে কিছুটা হাল্কা মূল্যো পায় আর পেশার সূত্রটা এখানেই গিয়ে থমকে দাঁড়ায়। এক সময় সেই শখ করে দু-একবার সেবনকারী ছেলে/মেয়েটাও হয়ে উঠে মাদক ব্যাবসায়ী। পাইকারী দরে কিনে এনে কিছু লাভের আশায় ধ্বংস করে এলাকার তরুণ-যুব প্রজন্মকে। এতে তার লাভের অংশের বিবেচনা করতে গেলে যুক্তিটা এভাবে আসে যে, তার মজুদকৃত পুঁজি দিয়ে যে মাদক পাইকারীতে কিনে আনে তা খুচরা মূল্যে বিক্রয় করার পর লভ্যাংশের অর্থ দিয়ে সেই মাদক সেবীর মাদক সেবনের একটা উৎকৃষ্ট ব্যবস্থা হয়ে যায়। নিজে শখের বশে শখ থেকে নেশা পরবর্তীতে পেশা হিসেবে নিয়ে নিজের ধ্বংসের সাথে ধ্বংস করে যাচ্ছে এলাকার তরুণ-যুব প্রজন্মকে! শুধু কি তাই? না, এতে তারা ক্ষান্ত না হয়ে ধ্বংসের মূখে পতীত করছে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের। এরা সমাজের এক প্রকার ছোঁয়াছে ভাইরাস বললেও মনে হয় ভুল হবেনা।
একটু লক্ষ্য করলে দেখা যায়, একজন শিক্ষার্থীর কাছে মাদক সেবনের মত অর্থ কোন ভাবেই মজুদ থাকেনা। কিন্তু যখন এই মাদক সেবন শখ থেকে নেশয় পরিণত হয়, তখন বাবা-মা’র কাছ থেকে বই-খাতা কিনার ছলে টাকা নিয়ে সেবন করে আত্মঘাতী প্রাণনাশক মাদক! আর প্রতিনিয়ত পরিবারের সাথে বই-খাতা কেনার নাটক চালাতেই থাকে তারা। এক সময় যখন বাবা-মা অর্থ ব্যায় করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যায়, তখন সেই সোনার ছেলেটা বাড়ির ছোট-খাটো জিনিস চুরি করে বেঁচে মাদক সেবনের অর্থ সংগ্রহ করে। পরবর্তীতে ওই ছেলেটাই আবার নিজ বাড়ি ছেড়ে আরেক বাড়ির জিনিস, বন্ধু-বান্ধবের মোবাইল ফোন চুরি, ছিনতাই, বিভিন্ন দাদা ভাইয়ের নাম বলে চাঁদাবজি ইত্যাদি অপকর্মের সাথে জড়িয়ে পড়ে। এখানে যুক্তিগত ভাবে দেখতে গেলে একজন মাদকসেবী শুধুমাত্র মাদকসেবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনা। এক সময় তার আরেকটা পদবী যোগ হয় আর সেটা হতে পারে চোর, ছিনতাইকারী, পকেটমার ইত্যাদি! জরিপে জানা যায় এইসব মাদকসেবীর সংখ্যা ৭৮ শতাংশ’র বেশি তরুণ ও যুবক।
জরিপে আরো জানা যায়, কোন দোকানদার তার সৎ ছেলেটাকে দোকানে বসিয়ে ব্যক্তিগত কাজে একটু বাইরে গেলেই কোন না কোন পন্য দোকান থেকে লা-পাত্তা! হায়রে সোনার ছেলে যাকে বিশ্বাস করে কত ভালোবেসে তার বাবা-ভাই বা আত্মীয় তাকে প্রতিষ্ঠানে বসিয়ে দিলো সেখানেও চুরি!বর্তমানে এমন কিছু বখাটে তরুণ মাদক রোগে এতটাই আক্রান্ত হয়েছে যে, হয়তবা সে নিজেই নিজেকে চিনতে পারেনা এমনটাই দশা! যে সময় কিনা তার স্কুল-কলেজে গিয়ে শিক্ষার্জনের কথা, ঠিক সেই সময়টাতে কোন মাদক দ্রব্যের কি নাম তা মুখস্ত করা নিয়ে ব্যস্ত সেই দেশের হবু ভবিষ্যৎ ছেলেটা! যারা কিনা ভবিষ্যতে এই দেশ মাতৃকার কর্ণধার!
এই সব মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে সরকার যে চুড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহন করেছেন তা শতভাগ প্রসংশনীয়। সরকারের সাথে হাত মিলিয়ে এসব দেশদ্রোহীদের বিরুদ্ধে আমরা সাধারণ জনগন যদি আরো সচেতন হই তাহলে হয়তবা এ সোনার বাংলাকে মাদক মুক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
তাই আসুন, জাতি-ধর্ম-গোত্র নির্বিশেষে সকলে এক হয়ে মাদকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই। মাদক হতে নিজে সচেতন হই এবং অপরকে সচেতন করতে সহায়তা করি।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট