আকাশবার্তা ডেস্ক :
সুপ্রিম কোর্টের মামলা ব্যবস্থাপনায় চলছে নানা অনিয়ম। মামলা ফাইল করা, কার্যতালিকায় আসা, বেঞ্চে পাঠানো এবং আদেশের অনুলিপি পেতে ভোগান্তিতে পড়ছেন আইনজীবীরা। তদবির ছাড়া কোনো ফাইলই নড়ে না শাখাগুলোতে। আর তদবির মানে গুণতে হয় নগদ টাকা। এমনকি টাকা না দেয়া হলে ফাইল গায়েব হওয়ারও নজির রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের কোর্ট ম্যানেজমেন্ট (আদালত ব্যবস্থাপনা) উপ-কমিটির সরেজমিন পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে মিলেছে এমন তথ্য। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের কাছে গত ৫ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট বারের আদালত ব্যবস্থাপনা কমিটি প্রতিবেদনটি গত ৫ ফেব্রুয়ারি জমা দিয়েছে। সাত সদস্যের উপকমিটির আহবায়কের দায়িত্বে ছিলেন সুপ্রিম কোর্ট বারের সদ্য বিদায়ী সহ-সভাপতি ড. মো. গোলাম রহমান ভূঁইয়া।
গত বছর জুলাই মাসে এ কমিটির সদস্যরা সুপ্রিম কোর্টের মামলা ব্যবস্থাপনার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মিস সেকশন (শাখা), ডেসপাস শাখা ও ফাইলিং সেকশন সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করেন। তিনটি সেকশনের পৃথক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন জমা দেয়া হয় প্রধান বিচারপতির কাছে। গত বছরের ১০ জুলাই মিস শাখা, ২৪ জুলাই ডেসপাস (দ্রুত প্রেরণ) শাখা এবং ২৬ জুলাই ফাইলিং শাখার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন তারা। প্রতিবেদনে অনিয়ম, সমস্যা, আর্থিক লেনদেনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড তুলে ধরে সমস্যা থেকে উত্তরণে ১৩ দফা সুপারিশ করেছে কমিটি।
৫ জুলাই কমিটির সভায় সদস্য আইনজীবী শাহানা পারভীন অভিযোগ করেন, টাকা না দিলে বেঞ্চ কর্মকর্তারা ঝামেলা করেন। মামলা কার্যতালিকায় আসে না। আদেশ লেখা হয় না। মামলার ফাইল আসে না সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে। টাকা না দিলে হয়রানিতে পড়তে হয় তাদের। অনেক ক্ষেত্রে জুনিয়র আইনজীবীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হয়ে থাকে। সিনিয়র-জুনিয়র আইনজীবীদের মধ্যে বৈষম্যও করা হয়।
কমিটির অপর সদস্য মো. আহসান উল্লাহ অভিযোগ করেন, শাখা থেকে সময়মতো ফাইল পাঠানো হয় না। ফলে কার্যতালিকা আসে না। বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে দেওয়ানি মামলা অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে রাখে।সদস্য মোহাম্মদ মেহেদী হাসান বলেন, মিস শাখা থেকে ফাইল নিয়মিত আদালতে যায় না। টাকা না দিলে কোনো কাজ হয় না। অনেক ক্ষেত্রে টাকা দিয়ে হলেও ফাইল গায়েব হয়ে যায়। স্বাক্ষর ছাড়াই আদেশ পড়ে থাকে।
শাখার সংশ্লিষ্টদের খুশি করা না হলে ফাইল নথিভুক্ত হয় না এবং পাওয়া যায় না। মিস শাখার তিনজন সুপারিনটেন্ডেন্ট মো. মজিবুর রহমান, মো. তৌহিদুল ইসলাম ও মো. জামালউদ্দিনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— তাদের আচরণ সন্তোষজনক নয়। এ শাখার সমস্যার মধ্যে রয়েছে— আদালত থেকে রিকোজিশন (ফরমায়েশ) দেয়া হয় না। ফরমায়েশ দেয়া হলে শাখা থেকে কার্যতালিকা অনুযায়ী ফাইল পাঠানো যেত।
ফরমায়েশের পরও ফাইল পাঠানো না হলে সুপারিনটেন্ডেন্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা, বিভাগ অনুসারে শাখা চালু করা, ফাইল রাখার জন্য জনবল ও জায়গার অভাব, ফাইল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় র্যাকের ব্যবস্থা করা, আদেশের পর এক সপ্তাহেও ফাইল শাখায় যায় না। তদবির করলে তিনদিনে ফাইল পাওয়া যায়। এ জন্য আদেশের তিনদিনের মধ্যে ফাইল নামার ব্যবস্থা করতে হবে।
এ শাখায় টাইপিস্টসংকট রয়েছে। কাজের অতিরিক্ত চাপ ও প্রিন্টার সমস্যার কারণে দ্রুত সরবরাহ করা যাচ্ছে না। কম্পেয়ার শাখায় জনবলের অভাব রয়েছে। বিচারপ্রার্থীদের সুবিধার্থে ওয়েবসাইটে স্মারক (মেমো) নম্বর দিতে হবে। যাতে বিচারপ্রার্থীরা স্মারক দেখে মামলার অবস্থা জানতে পারেন। তথ্য প্রযুক্তি শাখায় উপযুক্ত জনবলের অভাব রয়েছে।
ডেসপাস শাখার পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে— প্রতিদিনের আদেশ প্রতিদিন যায় না। যে আগে তদবির করবে তার আদেশ যাবে। শাখাতে ফাইলগুলো এলামেলো পড়ে ছিলো। আলাদা ডেস্ক করা প্রয়োজন। এ শাখায় ৩০ জন জনবল থাকলেও পরিদর্শনের দিন ২১ জনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। আদেশ নথিভুক্ত করতে অপেক্ষমাণ আইনজীবী সহকারীদের (ক্লার্ক) কাছ থেকে ১০০ টাকা করে নেয়া হচ্ছে।
এ টাকা না দেয়া হলে আদেশ নথিভুক্ত হয় না এবং পাওয়া যায় না। টাকা কেন নেয়া হচ্ছে— প্রশ্ন করা হলে তারা টাকাও নেবে না আবার আদেশও নথিভুক্ত করবে না। এতে দিনের পর দিন আদেশ পড়ে থাকবে। আদেশের স্মারক নম্বর সহজে পাওয়া যায় না। ডাকে আদেশের অনুলিপি পাঠানোর নম্বর (জিপি) পেতে ভোগান্তি পোহাতে হয়।
জিপি নম্বর না পড়লে রাজধানীর বাইরে ১৫ দিনেও আদেশের অনুলিপি পৌঁছে না। ফলে একজন বন্দিকে বেশিদিন কারাগারে থাকতে হয়। ডেসপাসের দেওয়ানি শাখায় স্ট্যাম্পসংকট রয়েছে। প্রতি মাসে নিয়মিত স্ট্যাম্প পাঠানো ও এক মাসের অতিরিক্ত স্টাম্প রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
উপ-কমিটির আহবায়ক ড. মো. গোলাম রহমান ভূঁইয়া বলেছেন, অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়গুলো চিহ্নিত করেছে কমিটি। সেকশনগুলোতে যত্রতত্র ফাইল পড়ে থাকে, জায়গার অভাব রয়েছে, ফাইল খুঁজে পাওয়া যায় না। ফৌজদারি মিস সেকশন গুরুত্বপূর্ণ বিধায় এখানে বিভাগ অনুসারে শাখার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। প্রধান বিচারপতি আমাদের এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
বারের নতুন কমিটি অনিয়ম বন্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করি।ফাইলিং শাখার পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে— টাকা না দিলে ফাইলিং দ্রুত সম্পন্ন হয় না। প্রতি মামলা দাখিল করতে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে ২ থেকে ৩ দিন ফাইল পড়ে থাকে। সিল মারা থেকে প্রতিটি কাজে টাকা দিতে হয়। ক্রমিক অনুসারে ফাইল জমা নেয়া হয় না। সবই চলে তাদের ইচ্ছা মতো। সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল অফিসার মোহাম্মদ সাইফুর রহমান বলেছেন, অনিয়ম আগের চেয়ে কমেছে। প্রধান বিচারপতি সেকশনগুলো পরিদর্শন করেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়েছি। অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নেয়া হয়েছে প্রশাসনিক ব্যবস্থা। সাময়িক বরখাস্ত ও বদলি করা হয়েছে কয়েকজনকে।
কমিটির ১৩ দফা সুপারিশ :
টেন্ডার অনুসারে মামলা কার্যতালিকায় আসা, ক্রমিক অনুসারে আদেশ লেখা, স্বাক্ষর করা আবার আদালত থেকে ফেরত পাঠানো। বেঞ্চ কর্মকর্তাদের অনৈতিক লেনদেন বন্ধ করতে প্রতিদিনের ফাইল ক্রমিক অনুসারে প্রতিদিন শাখায় পাঠানো প্রয়োজন। আদেশের পর ডেসপাস শাখা হয়ে দ্রুত অনলাইনে দেয়া ও জিপি নম্বর টানানো, এফিডেভিট (হলফনামা) কমিশনার বাড়ানো আইনজীবী কর্তৃক মক্কেলকে সনাক্ত করার পর পুনরায় উপস্থিত না করা।
আগাম জামিনের জন্য বেঞ্চ বাড়ানো। আইনজীবীর অনুপস্থিতিতে মামলা কার্যতালিকা থেকে বাদ না দিয়ে তালিকার নিচের দিকে রাখা। আদালতের এখতিয়ার পরিবর্তন হলেও ক্রমিকে রাখা। বিচারিক আদালতের নথি (এলসিআর) এক সপ্তাহের মধ্যে ডেসপাস থেকে শাখায় পাঠানো বা আইনজীবীর উদ্যোগে পাওয়া গেলে হাইকোর্টের নথির সঙ্গে যুক্ত করা। মিস শাখার জায়গা বাড়ানো। এ শাখায় ফাইল খুঁজতে ১০০ থেকে ২০০ টাকা দিতে হয়।
প্রতিদিনের মামলা ক্রমিক অনুসারে আদালতে পাঠানো না হলে কারণ দর্শানোর ব্যবস্থা রাখা। সুপারিনটেন্ডেন্টদের আচরণ পরিবর্তন করা। আইনজীবীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ এবং ফাইল গায়েব করে টাকা আদায় বন্ধ করা। বেঞ্চ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব প্রধান বিচারপতির কাছে দেয়া এবং নজরদারিতে রাখতে সিসিটিভির ব্যবস্থা করা। টেন্ডার অনুসারে আদেশে স্বাক্ষরের ব্যবস্থা করা।