শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ ইং ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ:
লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে অস্ত্রসহ দুই যুবক আটক চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভবনের স্থান পুনর্বিবেচনার দাবিতে মানববন্ধন সেনবাগে ইয়াবাসহ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার লক্ষ্মীপুরে ১২শ’ পরিবারের মাঝে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা ঘোষণা : কফিল উদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে আনন্দ মিছিল চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা অনুমোদন : লক্ষ্মীপুরে আনন্দ মিছিল চন্দ্রগঞ্জে খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন চন্দ্রগঞ্জে যুবদলের কর্মী সম্মেলনে নুর হোসেন হারুন সভাপতি পদে এগিয়ে চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়ন যুবদলের কর্মী সম্মেলন কাল : সাধারণ সম্পাদক পদে লড়ছেন রিপন চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়ন কৃষকদলের ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা
জনতার মাঝে শেখ হাসিনা

রাজনীতির পরশপাথর

শ্যামল দত্ত >>

সেই এক অন্ধকার সময়। সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যার পর কালো অন্ধকারে ছেয়ে আছে পুরো বাংলাদেশে। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে যে স্বপ্নের বাংলাদেশের যাত্রা শুরু, সেই বাংলাদেশ মুখ থুবড়ে পড়ে আছে ঘাতকের বন্দুকের নলের সামনে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নয়, যেন ঘাতকের বুলেটে ক্ষতবিক্ষত হয়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের সিঁড়িতে লুটিয়ে ছিল পুরো বাংলাদেশ। স্বাধীনতার সাড়ে ৩ বছরের মাথায় ভূলুণ্ঠিত স্বাধীনতার স্বপ্ন। বদলে ফেলা হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বদলে গেল স্বাধীনতার মৌল আকাঙ্ক্ষা। স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধারা লাঞ্ছিত। পরাজিত পাকিস্তানের প্রেতাত্মা আবার ক্ষমতায়। এক জগদ্দল পাথর যেন চেপে বসল সবার ওপর, দেশের ওপর। হত্যা, ষড়যন্ত্র, ক্যু আর পাল্টা ক্যুতে রক্তাক্ত রাজনীতি। জাতিকে দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্য যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দরকার তাদের কেউ মৃত, কেউ কারাগারে অথবা কেউ বিভ্রান্ত।

এমন অবস্থায় কালো অন্ধকারে ছেয়ে থাকা দেশকে আলো দেখাতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে হাজির হলেন একজন, যার রক্তে রয়েছে জাতির পিতার রক্ত, স্বপ্ন, দ্রোহ আর বেদনা। দেশের মানুষের মুক্তির স্বপ্নের মূর্ত প্রতীক হয়ে ঘুমন্ত, ক্লান্ত, বিপর্যস্ত জাতিকে আবার স্বপ্ন দেখাতে উপস্থিত হলেন জাতির পিতার কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। ১৯৮১ সালের ১৭ মে এক অপরাহ্ণে দীর্ঘ ৫ বছরের শরণার্থী জীবন শেষে তিনি যখন ঢাকার কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে নামলেন, দেশের অনাচার, পাপ আর অন্ধকার সময় ধুয়ে-মুছে ফেলার জন্য প্রবল বর্ষণে সিক্ত হলো পুরো দেশ।

চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান বাবু ও এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে এক বিশাল বহরে তরুণ একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমারও ঢাকায় আসার সুযোগ হয়েছিল। সঙ্গে ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন, চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতা জামশেদুল আলাম চৌধুরী এবং আমার অগ্রজ এক ভাই শ্যামল দত্ত (যার নাম আর আমার নাম একই)। সেটা ছিল আমার জীবনের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হওয়ার এক অপূর্ব সুযোগ। বাংলাদেশ দেখল এক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার মাটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে পাল্টে যাচ্ছে সবকিছু। ঘাতকের বুলেটে রঞ্জিত রক্তাক্ত বাংলাদেশ জাতির পিতার কন্যা আসার সঙ্গে সঙ্গে আস্তে আস্তে জেগে উঠতে লাগল মানুষের স্বপ্ন, মানুষ আবার বাঁচার স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। যেন এক পরশপাথরের ছোঁয়ায় জেগে উঠল পুরো জাতি, বঙ্গবন্ধুর কন্যার আগমন রাজনীতির কপালে লাগল এক জাদুর কাঠির স্পর্শ। দিশাহীন জাতি খুঁজে পেল দিকনির্দেশনা। রূপকথার মতোই পরশপাথরের ছোঁয়ায় বাংলাদেশ আবার যাত্রা শুরু করল স্বপ্নের পথে। সেই স্বপ্ন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন, দেশের অগণিত মানুষের ভ‚লুণ্ঠিত গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন।

১৯৮১ সালের ১৭ মে বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অনন্য দিন। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা দেশের মাটিতে পা রাখলেন এটা জেনেই যে, বঙ্গবন্ধুর ঘাতকরা ক্ষমতায়, বুলেট তাকে তাড়া করবে, ষড়যন্ত্র তার পিছু নেবে, অদৃশ্য আততায়ী ওঁৎ পেতে আছে সবসময়। কিন্তু ঝুঁকি তো তাকে নিতেই হবে। শরীরে প্রবাহিত রক্ত বঙ্গবন্ধুর আর তাতে মিশে আছে রাজনীতি। জন্মের পর থেকেই বাবার রাজনীতি, মায়ের প্রবল রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও প্রখরতা। এসবের মধ্যেই বড় হয়েছেন তিনি। খুব কাছ থেকে দেখেছেন বাবার রাজনীতির নানা উত্থান-পতন, ঘাত-প্রতিঘাত, জেল-জুলুম ও মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা। তাই জেনে-বুঝে, ঝুঁকি নিয়ে সেই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রাজনীতির সমুদ্রে পা রাখলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।

আজ ২৮ সেপ্টেম্বর তার ৭৪তম জন্মদিন। শুভ জন্মদিন মাননীয় নেত্রী। ১৯৪৭ সালের এই দিনে টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেন শেখ হাসিনা, তার মাত্র ৪৩ দিন আগে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয় পাকিস্তান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন মুসলিম লীগের একজন সক্রিয় কর্মী কিন্তু স্বাধীন পাকিস্তানে হতাশ তরুণ নেতা শেখ মুজিব। তার স্বপ্নের বাংলাদেশ তিনি দেখতে পাচ্ছেন না এই পাকিস্তান রাষ্ট্রে। হয়তো তাই একই সময়ে জন্ম হলো তার প্রথম সন্তান শেখ হাসিনার, যিনি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ বাস্তবায়নে হাল ধরবেন। বাস্তবেও হলো তাই। ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে নিহত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করছেন তারই কন্যা শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তার কন্যার রাজনীতির পরশপাথর ছুঁয়ে জেগে উঠল আবার নিপীড়িত মানুষ। সংগঠিত হলো ছিন্নবিচ্ছিন্ন স্বপ্ন।

দীর্ঘ কয়েক দশক সামরিক স্বৈরাচার ও সেই স্বৈরাচারের উত্তরসূরিদের ষড়যন্ত্রের রাজনীতি দেয়াল ভেঙে আবার আলোর পথে যাত্রা শুরু। নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। তাই আজ তার জন্মদিনে সেই মূল্যায়নটা জরুরি। তিনি এসেছিলেন বলেই বাংলাদেশ আজ আবার বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ। দারিদ্র্য-শোষণমুক্ত করার স্বপ্ন বাস্তবায়ন ও উন্নয়নের পথরেখাই শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, পুরো বিশ্বের এক বিস্ময়। প্রখর রাজনীতির দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা এবং কৌশলী ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তিনি এখন এক বিশ্ব নেতৃত্বে আসীন ব্যক্তিত্ব। খুন আর হত্যার রাজনীতিতে যে দেশের ইমেজ ছিল ভূলুণ্ঠিত, সেই বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অনেক দেশের কাছে রোল মডেল। এখনো অনেকের কাছে অপার বিস্ময়, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত এই দেশ কীভাবে এত দ্রুত মাথা তুলে দাঁড়ায়। সঠিক নেতৃত্ব, যথাযথ উদ্যোগ আর লাখো মানুষের অফুরন্ত প্রাণশক্তি, এটাই বাংলাদেশের উন্নয়নের মূল রহস্য। তাই একসময়ের খাদ্য সংকটের দেশ এখন খাদ্যে উদ্বৃত্ত, এর মধ্যে মানুষ বেড়ে হয়েছে ৩ গুণ। শিল্পের উৎপাদনের যথার্থ সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক নানা বাধা উপেক্ষা করে কৃষিতে ভর্তুকি ও প্রণোদনা অর্থনীতিতে এনেছে নতুন প্রাণস্পন্দন। এর সবই হয়েছে সঠিক নেতৃত্ব আর যথাযথ সিদ্ধান্তের কারণে। আর সেই নেতৃত্বের কাণ্ডারি হচ্ছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা, রাজনীতির পরশপাথর তার হাতে। একটা সময় ছিল যখন রেশনে কাপড় দেয়া হতো একটি শার্ট সেলাই করার জন্য। সেই দেশ এখন এক নম্বর শার্ট রপ্তানিকারক দেশ। সমাজে অবহেলিত নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতিষ্ঠিত আত্মমর্যাদা নিয়ে। তাই বাংলাদেশ এখন বিশ্বজুড়ে মাথা তুলে দাঁড়ানো এক বিস্ময়ের নাম।

বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় তাকে দিয়েছে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিন ফোর্বস অনুযায়ী তিনি এখন পৃথিবীর রাজনৈতিক ক্ষমতাশালী নারী নেতৃত্বের মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশ ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ২৫টি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তিনটি প্রকাশিত গ্রন্থ সম্পাদনা করে তিনি জাতির সামনে তুলে ধরেছেন। ইতিহাসের উল্লেখিত অধ্যায়ে অন্যতম দলিল হিসেবে পরিচিত নতুন প্রজন্মের কাছে তাই তিনি এক অনুসরণীয় নেত্রী। আমার দুই কন্যাকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লিখে দেয়া দুটি চিঠিতে আমি দেখেছি কী অসাধারণ পাণ্ডিত্য তার লেখায়। এই দুই চিঠি তাদের জীবনের অমূল্য সম্পদ এবং অনন্য দিকনির্দেশনা।

আজকের বাস্তবতায় পুরো বিশ্ব বিপর্যস্ত এক ভাইরাসের কারণে। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও জনমানসে তার বহুমাত্রিক প্রভাব। উন্নয়নের সহায়ক সব শিল্প-কারখানার চাকা ঘুরছে না। শিক্ষা ব্যবস্থা বিপর্যস্ত, লণ্ডভণ্ড। শ্রমশক্তি যেতে পারছে না এক দেশ থেকে আরেক দেশে। বিশ্বের এই বেহাল দশা বিদ্যমান বাংলাদেশেও। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরো দুটি বিপর্যয়। করোনা বিপর্যস্ত বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘূর্ণিঝড়ের আক্রমণ। অন্যদিকে বন্যায় ডুবে আছে দেশের এক-তৃতীয়াংশ। পুরো পৃথিবী যখন একটি বিপর্যয় মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে, তখন বাংলাদেশকে সামলাতে হচ্ছে একসঙ্গে তিনটি বিপর্যয়। অসম্ভব সাহসী নেতৃত্ব আর দূরদর্শী চিন্তা ছাড়া এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ যে কত কঠিন, তা বিশ্লেষণের জন্য সমাজ বিশ্লেষকদের দরকার পড়ে না। এত কিছুর পরও আবারো বাংলাদেশ ফিরছে স্বমহিমায়, সমর্যাদায়। মানুষ নিশ্চিত, এই বিপর্যয় মোকাবিলায় মানুষের কিছুটা কষ্ট হলেও আস্তে আস্তে আবার নিজের গতিতেই ফিরবে বাংলাদেশ। কারণ আমাদের রাজনীতির পরশপাথর যার হাতে তিনি হচ্ছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। সেই জাদুকরী পরশপাথরের স্পর্শে আমরা আবার ফিরব উন্নয়নের মহাসড়কে। তাই আজ তার জন্মদিনে তার জন্য শুভকামনা। শুভ জন্মদিন মাননীয় নেত্রী।

শ্যামল দত্ত : সম্পাদক, ভোরের কাগজ

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

জুন ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« মে    
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০