মঙ্গলবার ২রা জুন, ২০২৬ ইং ১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ:
লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে অস্ত্রসহ দুই যুবক আটক চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভবনের স্থান পুনর্বিবেচনার দাবিতে মানববন্ধন সেনবাগে ইয়াবাসহ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার লক্ষ্মীপুরে ১২শ’ পরিবারের মাঝে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা ঘোষণা : কফিল উদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে আনন্দ মিছিল চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা অনুমোদন : লক্ষ্মীপুরে আনন্দ মিছিল চন্দ্রগঞ্জে খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন চন্দ্রগঞ্জে যুবদলের কর্মী সম্মেলনে নুর হোসেন হারুন সভাপতি পদে এগিয়ে চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়ন যুবদলের কর্মী সম্মেলন কাল : সাধারণ সম্পাদক পদে লড়ছেন রিপন চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়ন কৃষকদলের ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা
প্রতীকী ছবি।

ক্ষতিপূরণ রায় বাস্তবায়ন হয় না

আইন আদালত ডেস্ক :
চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদীতে ২০০৩ সালে এমভি নাসরিন-১ লঞ্চ ডুবে যায়। এতে প্রাণ হারান ৪০২ জন। ওই ঘটনায় ক্ষতিপূরণ চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট হয়। পরে দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত নিহতের স্বজনদের প্রতি পরিবারকে ১০ লাখ করে মোট ১৭ কোটি ১১ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে রায় দেন। তবে আদালতের আদেশের পর ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

রায়ের পর দীর্ঘ বছর পার হওয়ায় বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াও ঢাকা পড়েছে। এ রায় দ্রুত কার্যকর দেখতে চান নিহত ও নিখোঁজ পরিবারের স্বজনরা। নাসরিন ট্র্যাজেডির ১৯ বছর পার হয়েছে। তবে এখনো স্বজনদের কান্না থামেনি। চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক মিশুক মুনির সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর এক রিটে তাদের পরিবারকেও ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

তবে সে আদেশ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। গাড়ির চালক ও মালিকের আপিল আবেদনে মামলা এখনো বিচারধীন। দুই বাসের রেষারেষিতে প্রথমে হাত, পরে প্রাণ হারানো তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী রাজীব হাসানের পরিবার ক্ষতিপূরণের ৫০ লাখ টাকা এখনো পাননি। বর্তমানে মামলাটি আপিল বিভাগে আটকে আছে। একই কারণে ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রাজধানীর পল্লবীর বেনারসি কারিগর মো. আরমান। ভুল আসামি হিসেবে সাজা দেয়ায় তাকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে আদেশ দেন হাইকোর্ট। তবে দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও রায়ের বাস্তবায়ন হয়নি।

শুধু লঞ্চ ও সড়ক দুর্ঘটনাই নয়, মানবসৃষ্ট বিভিন্ন দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট হয়। শুনানি শেষে উচ্চ আদালত ক্ষতিপূরণের আদেশ দিলেও যুগের পর যুগ সেটা প্রতিপালন হয় না। রায় কার্যকরের নজিরও খুব কম। নেই যথাযথ পদক্ষেপও। এছাড়া অনেক সময় শুনানি পর্যায়েই আটকে যায় মামলা।

যা চলতে থাকে বছরের পর বছর। দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বা হাত-পাসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হারানোর ঘটনায় বহু মামলার রায় উচ্চ আদালতে আটকে আছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দিনের পর দিনও আপিল কার্যক্রমও শেষ হয়নি। ফলে বিচারপ্রার্থীদের বছরের পর বছর ঘুরতে হচ্ছে আদালতের বারান্দায়। খরচ হচ্ছে কাড়িকাড়ি টাকা।

আবার ক্ষতিপূরণ আদায়ে মালামাল ক্রোক কিংবা সম্পত্তি নিলামের আদেশও তামিল হয় না। এমন পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী ও তার পরিবার যেমন ক্ষতিপূরণ বুঝে পায়নি, তেমনি আদেশ প্রতিপালন না করার শাস্তিও হয়নি। খুব অল্প সংখ্যক ক্ষেত্রে মালিক ও আক্রান্তদের মধ্যে আপসের নমুনা দেখা যায়। সড়ক দুর্ঘটনার ইস্যুতে বেশ কিছু মামলার রায় বাস্তবায়ন চিত্র পর্যবেক্ষণে মিলেছে এমন তথ্য।

এদিকে আদালতের রায় বাস্তবায়ন না হওয়ায় এ ক্ষেত্রে বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, নিষ্ক্রিয়তা ও অবহেলাকে দায়ী করছেন বিচার-সংশ্লিষ্টরা। রায় হলে তা কার্যকর হচ্ছে কি-না, সে বিষয়েও নেই কোনো তদারকি। আদেশ লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধেও নেই শাস্তির ব্যবস্থা। ফলে বাধ্যবাধকতা থাকলেও এসব রায়ের শতভাগ বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা। তারা বলছেন, এমনিতেই দীর্ঘ আইনি জটিলতা আর ঝামেলার কারণে অনেকেই আদালতের দ্বারস্থ হতে চান না।

সেখানে যদি ক্ষতির শিকার ব্যক্তি বা পরিবার আদালতের রায়ের বাস্তবায়ন দেখতে না পান তাহলে হতাশা আরও বেড়ে যায়। তাই রায় বাস্তবায়ন পরিস্থিতি তদারকিতে আদালতেরই একটি ম্যাকানিজম বের করা দরকার। পাশাপাশি এ ধরনের মামলা নিষ্পত্তিতে আদালতের দীর্ঘসূত্রতা দূর এবং মামলা পরিচালনায় আর্থিকভাবে অসচ্ছলদের সহায়তার ব্যবস্থা থাকা দরকার। ক্ষতিপূরণ আইনও যুগোপযোগী করতে হবে।’

এদিকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনায় উচ্চ আদালতের বেশ কিছু নির্দেশনা আছে। যারা এসব আদেশ বাস্তবায়ন করছেন না তাদের আইনের আওতায় আনা যেতে পারে। তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করে ব্যবস্থা নেয়া, আইন মেনে না চললে দেশে আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হবে বলেও মনে করে আইনজীবীরা। তারা বলছেন, ক্ষতিপূরণ হলো দেওয়ানি বিষয়। কেউ ফৌজদারি মামলা করার পাশাপাশি দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণের মামলা করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের ইতিহাসে এ পর্যন্ত মাত্র চারটি ঘটনায় ক্ষতিপূরণ পেয়েছে নিহতের পরিবার। ২০১০ সালের ২৬ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বেলাল হোসেন তুরাগ বাসের ধাক্কায় নিহত হওয়ার ঘটনায় ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পায় বেলালের পরিবার। ১৯৯১ সালের ২৯ মার্চ রাজধানীর মৌচাক মার্কেটের সামনে মারা যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নাফিয়া গাজী। ওই ঘটনার ২৬ বছর পর বিআরটিসি নাফিয়া গাজীর পরিবারকে ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়।

এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনায় বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাসের চাপায় নিহত হন দুই শিক্ষার্থী আবদুল করিম রাজীব ও দিয়া আক্তার মিম। পরে ওই দুই পরিবারকে উচ্চ আদালতের নির্দেশে পাঁচ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয় জাবালে নূর কর্তৃপক্ষ। এছাড়া রাজধানীর শাহজাহানপুরে পাইপে পড়ে নিহত শিশু জিহাদের পরিবারকে
আদালতের আদেশ অনুসারে ২০ লাখ টাকার ‘চেক ও পে-অর্ডার’ দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে অগ্নিদুর্ঘটনায় মারা যাওয়া চার রোগীর পরিবারের মাঝে ক্ষতিপূরণের এক কোটি টাকা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। রাজধানীর পল্টন কালভার্ট রোডের ওয়াসার খোলা ম্যানহোলে পড়ে মারা যাওয়া দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শানু মিয়ার পরিবারকে ক্ষতিপূরণের ৫০ লাখ টাকা বুঝিয়ে দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ও ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া গ্রিন লাইন পরিবহনের বাসচাপায় পা হারানো প্রাইভেটকারচালক রাসেল ক্ষতিপূরণের ১০ লাখ টাকার চেক গেলো বছর বুঝে পেয়েছেন।

জানতে চাওয়া হলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ক্ষতিপূরণ নিয়ে উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায় অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে। যদি সংশ্লিষ্টরা ক্ষতিপূরণ না দেন বা গড়িমসি করেন, তাহলে আদালত অবমাননার মামলা করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, আগে তো ক্ষতিপূরণ নিয়ে কোনো মামলা হতো না। এখন হচ্ছে, তবে সময়সাপেক্ষ আমার মনে হয় মালিকপক্ষ ক্ষতিপূরণ দেবে। মালিকপক্ষ মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি চান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরর আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, প্রয়াত তারেক মাসুদ পরিচিত মানুষ। হয়তো সেই কারণে তার পরিবার ক্ষতিপূরণের রায় পেয়েছে। আমি রায়কে স্বাগত জানাই, তবে অতিউৎসাহী হতে পারছি না। অনেক পরিবারের তো আদালতে যাওয়ারই সক্ষমতা থাকে না। অনেক দুর্ঘটনা ভাইরাল হয় না ও খবরেও আসে না।

তাহলে তারা কী করবে? তাই ক্ষতিপূরণের জন্য মামলা নয়, সরাসরি ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা রেখে আইন করা দরকার। ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অনেক আইন আছে। টর্ট আইন তার একটি। কিন্তু এটাকে সামনে নিয়ে আসবে কে? সড়ক দুর্ঘটনা কেন, যেকোনো ধরনের ক্ষতির ঘটনায় এই আইনে ক্ষতিপূরণের মামলা করা যায়। কিন্তু আইনটির ব্যবহার নেই। তিনি বলেন, ‘একটি সড়ক দুর্ঘটনা একটি পরিবারকে শেষ করে দেয়, পথে বসিয়ে দেয়। তাই রাষ্ট্রীয়ভাবেই ক্ষতিপূরণের বিধান করা উচিত।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জামিউল হক ফয়সাল বলেন, ‘যারা দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে তাদের জীবনের মূল্য কী? তারা বেঁচে থাকলে কি পরিমাণ ইনকাম বা রোজগার করতে পারতেন? এটি নির্ণয় করার জন্য একটি টেকনিক্যাল কমিটি করা হয়েছিল। যেটিতে ছিলেন ড. এম এম আকাশসহ আরও বেশ কয়েকজন।

তবে ‘সমপ্রতি হাইকোর্টেও ক্ষতিপূরণের যেসব আদেশ বা রায় হচ্ছে তাতে বলা হয়েছে, ক্ষতিপূরণ নিরূপণ ছাড়া বা যেকোনো টেকনিক্যাল কমিটি অথবা ক্ষতিপূরণের বিভিন্ন গাইডলাইন ছাড়া ক্ষতিপূরণ দেয়া সম্ভব নয়। অর্থাৎ ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ণয় করা, আমার জীবনের যে মূল্য অন্যের জীবনের মূল্য সমান হতে পারে না। তাই সম্ভবত উচ্চ আদালত থেকে দ্রুত সময়ের মধ্যে হয়তো এ বিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত পেতে পারি।’

জামিউল হক বলেন, ‘বাংলাদেশে ক্ষতিপূরণের জন্য নির্দিষ্ট আদালত আছে এবং আইনে অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের কথাও বলা আছে, যেমন— বাংলাদেশে একটি আইন, মোটর ভেহিকেল অর্ডিন্যান্স, যেটি বর্তমানে সড়ক পরিবহন আইন, সেখানেও ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিধানগুলোর কথা বলা আছে। কিন্তু আমরা যারা রিটে এসে ক্ষতিপূরণ দাবি করি, বাংলাদেশে এটা একটা এক্সারসাইজ কনস্টিটিউশনাল রেমিড হিসেবে। কনস্টিটিউশনাল রেমিড হিসেবে যেখানে রাইট টু লাইফ মানুষের জীবনের প্রশ্ন এবং জীবন কেড়ে নেয়া হচ্ছে, সে ক্ষেত্রে বিগত বছরগুলোতে আমরা অনেকগুলো মামলা করেছি।

সেইগুলো হলো— রাইট টু লাইফের অংশ হিসেবে এবং ফান্ডামেন্টাল রাইটস ভায়োলেশন হয়েছে, যেখানে ফান্ডামেন্টাল রাইটস ভায়োলেশনে কোনো দুর্ঘটনা হয়, সেখানে কনস্টিটিউশনাল কোর্ট হিসেবে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনে এটার ফলে বেশ কয়েকটি মামলায় জাজমেন্ট এসেছে। পৃথিবীর অনেক দেশসহ ভারতেও কনস্টিটিউশনাল রেমিড হিসেবে আলাদা একটি রেমিডি আছে, সেখানে আমরা এটা দাবি করতেই পারি।’

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

জুন ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« মে    
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০