মোহাম্মদ আলী হোসেন :
লক্ষ্মীপুরের ৫টি উপজেলা ও ১টি থানা এলাকার বিভিন্ন বাজারের অলিতে গলিতে অনুমোদনহীন ব্যাঙের ছাতার ন্যায় গড়ে উঠেছে সহস্রাধিক ঔষধের দোকান।
ঔষধ প্রশাসনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে শুধু ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে জেলা শহর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন বাজার কেন্দ্রীক বা পাড়া-মহল্লায় ফার্মেসী ব্যবসা খুলে বসেছেন অনেকে। এছাড়া জেলার চন্দ্রগঞ্জ, রায়পুর, রামগঞ্জ, কমলনগর, রামগতি উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় গড়ে ওঠেছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের ফার্মেসী। এসব ফার্মেসী চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই উচ্চ মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক, নিষিদ্ধ, ভারতীয়, নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের নানা প্রকার ঔষধ বিক্রি করছে অবাধে। অনেক ফার্মেসী ব্যবসায়ীর নেই কোন ফার্মাসিস্ট প্রশিক্ষণ। ফলে রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে আরো জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন রোগীরা। এতে আর্থিক, শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন অনেক রোগী ও তাদের পরিবার-পরিজন।
ড্রাগ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ, ১৯৮২-এর ৪ নম্বরের ১৩ নম্বর ধারার ‘ফার্মাসিস্টদের নিয়োগ’ শিরোনামের ২ নম্বর ধারায় উল্লেখ আছে ‘কোনো খুচরা বিক্রেতা বাংলাদেশ ফার্মেসী কাউন্সিলের কোনো রেজিস্ট্রারের রেজিস্ট্রিভূক্ত ফার্মাসিস্টদের তত্ত্বাবধান ব্যতিরেকে কোনো ড্রাগ বিক্রি করতে পারবে না।’ কিন্তু এ সকল বিধি বিধানকে তোয়াক্কা না করে উপজেলাগুলোর অধিকাংশ ফার্মেসী চলছে প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্ট ছাড়াই। অল্প পারিশ্রামিকে অদক্ষ লোক বসিয়ে বিক্রি করছে জটিল কঠিন সবরোগের ঔষধ। ফলে মানহীন ভুল ঔষধ যেমন বিক্রি হয়, তেমনি এসব ঔষধ কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হন ক্রেতারা।
সাধারণত এ, বি, সি এই তিন ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্ট রয়েছে দেশে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্মেসী বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রীধারীরা হলেন ‘এ’ ক্যাটাগরির, চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্সধারীরা ‘বি’ ক্যাটাগরির আর তিন মাসের কোর্সধারীরা ‘সি’ ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্ট। উপজেলার যে সকল ফার্মেসীতে ফার্মাসিস্ট রয়েছে এদের ৯৯ শতাংশ ‘সি’ ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্ট। যাদের নুন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা মাধ্যমিক পাস।
ফার্মেসীগুলো কোনো দিক চিন্তা না করেই ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ব্যতিত সিপ্রোফ্লোক্সাসিলিন, এজিথ্রোমাইসনসহ অনেক হাই অ্যান্টিবায়োটিক, ঘুমের বড়ি, ব্যাথা নাশক ও যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট অবলীলায় বিক্রি করছে।
কয়েকজন সচেতন ক্রেতার সাথে কথা বলে জানা যায়, এখন ফার্মেসীতে আর বিশেষজ্ঞ লোকজনের দরকার হয়না। ঔষধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভরা বলে দেন কোন ঔষধ কখন এবং কী কাজে লাগে সেই মোতাবেক ঔষধ বিক্রি হয়। এছাড়া অনেক ঔষধের দোকানে নিম্নমানের ঔষধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভরা ঔষধ বিক্রি করে দেয়। এমনকি তারা অসচেতন রোগীর কাছে ডাক্তারের ভূমিকায়ও অবতীর্ণ হয় এবং তাদের কোম্পানির নিম্নমানের ঔষধ বিক্রি করে দোকানের মালিককে লাভবান করে দিয়ে নিজেদের উপর অর্পিত টার্গেট পূরণে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এছাড়া অসচেতন রোগীদের ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে উল্লেখিত ঔষধের একই গ্রুফের নিম্নমানের ঔষধ সরবরাহ করার অভিযোগও রয়েছে।
জানা গেছে, ভেজাল ও নিম্নমানের ঔষধ বিক্রির ক্ষেত্রে ভালমানের ঔষধের চেয়ে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি কমিশন দেয়া হচ্ছে। এতে করে বেশি লাভের আশায় ভেজাল ও নিম্নমানের ঔষধ বিক্রিতে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন ঔষধ ব্যবসায়ীরা। সাধারণ মানুষও কোন ঔষধটি আসলে কোনটি ভেজাল তা চিহ্নিত করতে অপারগ। এর ফলে এই ভেজাল ও নিম্নমানের ঔষধের বাণিজ্য দিন দিন জমজমাট হচ্ছে। আর স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। উপজেলার অবৈধ ফার্মেসীগুলো সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যের ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ বেশি মূল্যে বিক্রি করছে, যা রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে উল্টো নানা উপসর্গের সৃষ্টি করছে।
ভুক্তভোগিদের দাবি অনুমোদনহীন ঔষধ ফার্মেসী বন্ধ করাসহ নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের ঔষধ বিক্রি বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
এ ব্যাপারে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোস্তফা খালেদ আহমেদ মুঠোফোনে বলেন, লাইসেন্সবিহীন ফার্মেসীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব জেলা ড্রাগ সুপারের। তবুও আমি বিষয়টি নিয়ে ড্রাগ সুপারের সাথে কথা বলব।
এ দিকে জেলা ড্রাগ সুপারের মুঠোফোনে বার বার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়। (চলবে)