আকাশবার্তা ডেস্ক :
দেশব্যাপী চলমান মাদকবিরোধী অভিযানের সুযোগে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠেছে। ব্যক্তিগত শত্রুতা ও স্বার্থ হাসিল, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে কিংবা প্রতিপক্ষকে ফাঁসিয়ে দিতে মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছিলেন এমন মানুষকেও ফাঁসিয়ে দেওয়া হচ্ছে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে। মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করতে ভুল তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে মিডিয়ার কাছে।
এদিকে গতকালও রাজধানীতে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে মাদক সেবন ও বিক্রির অভিযোগে ৬১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শনিবার বেলা ১২টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত রাজধানীর দক্ষিণখান থানার ফায়েদাবাদ বালুরমাঠ, সোয়ারিরটেক, ট্রান্সমিটার ও মধুবাগ এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান চালানো হয়। এ সময় ৩০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, আধা কেজি গাঁজা, ২টা কিরিচসহ ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপরদিকে ডিএমপির ডিসি (মিডিয়া) মো. মাসুদুর রহমান জানান, শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত মাদকবিরোধী অভিযানে ৪৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ সময় তাদের কাছ থেকে ৩২২ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ১৫৫ গ্রাম ৫১৭ পুরিয়া হেরোইন, ২ কেজি ৩৬০ গ্রাম গাঁজা, ১৪ বোতল ফেনসিডিল ও ৬৯টি নেশাজাতীয় ইনজেকশন উদ্ধার করা হয়। মাদক আইনে তাদের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা করা হয়েছে। সম্প্রতি দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী কক্সবাজারের টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হক নিহত হওয়ার পর উল্লিখিত বিষয়গুলো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুনরায় যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা। খুব সতর্কতার সাথে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি ও পুলিশ সুপারদের যাতে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নিশ্চিত না হয়ে কাউকে মাদক মামলায় আটক করা না হয়।
ডিএমপি পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া সম্প্রতি বলেছেন, জঙ্গিদের মতো মাদক ব্যবসায়ীদের আস্তানাও গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। তবে কোনো নিরীহ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হয় সেদিকেও আমরা নজর রাখছি। তবে সরকার দলের লোকজনই একে অপরকে ফাঁসাতে মিথ্যা মাদক ব্যবসার অভিযোগ করছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল ও এলাকায় একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যেই মাদকের ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছেন তারা। রাজধানীর উত্তর কাফরুল থানা ৪নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম বাবু। দক্ষিণ আফ্রিকার দ্বৈত নাগরিক ব্যবসায়ী বাবুর সাথে জায়গাজমি ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আছে ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর একই রাজনৈতিক দলের সদস্য জামাল মোস্তফার।
চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে বাবুকে ফাঁসাতে জামাল মোস্তফা তাকে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন বলে তিনি এক সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেছেন। কাফরুল ভাষানটেকের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী সালাম বাহিনীর প্রধানকে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি। আবার আরেক শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী নাডু জামালকেও ডিবি পুলিশের হাতে অস্ত্র-মাদকসহ ধরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। রাজনৈতিক ও ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের জন্য তাকে চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে ফাঁসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন কাউন্সিলর জামাল।
সম্প্রতি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে তাকে মাদক ব্যবসায়ী উল্লেখ করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রিপোর্টও করিয়েছেন জামাল মোস্তফা। অথচ তার বিরুদ্ধে কোনো থানাতেই মাদকের কোনো অভিযোগ নেই বলে তিনি দাবি করেছেন। এ ঘটনায় বাবু আতঙ্কে দিনযাপন করছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, আইজিপিসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
তাছাড়া, রাজধানীর সবুজবাগ থানা এলাকার ৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি গোলাম মোস্তফা অভিযোগ করেন, এখানকার ওহাব কলোনীর শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী সোভাসহ অনেক মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে তিনি প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি এলাকায় মাদকবিরোধী সভা-সেমিনার ও মানববন্ধন করেছেন। আর এখন তার নামই ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে পুলিশের মাদক ব্যবসায়ীর তালিকায়। তিনি মাদকবিরোধী এসব করতে গিয়ে মাদক ব্যবসায়ীসহ অনেক অসৎ পুলিশের রোষানলে পড়েছিলেন। এ ঘটনায় তিনি নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে মাদক ব্যবসা ও নির্যাতনের অভিযোগে বাবর ফারদীন নামে এক হিজড়ার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছে বিহারীদের সংগঠন উর্দু স্পিকিং পিপলস্ ইউথ রিহ্যাবিলিটেশন মুভমেন্ট (ইউএসপিওয়াইআরএম)। পল্লবীর সেকশন-১১, ব্লক-এ, এডিসি ক্যাম্প ও পল্লবীর বিভিন্ন এলাকায় নিরাপদে মাদক ব্যবসা করে যাচ্ছে হিজড়া রূপধারী বাবর ফারদীন। হিজড়া রূপধারণ করায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারও করতে পারেনি। ওই হিজড়া মাদক ব্যবসা, খুন ও নিরীহ মানুষদের ওপর নির্যাতন করেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।
গত ১৮ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১১টায় রাজধানীর মিরপুর পল্লবীর বাজার রোডে বাবরসহ অন্যন্য মাদক ব্যবসায়ীদের ক্যাম্প থেকে উৎখাত করার দাবিতে বিহারীদের সংগঠন ‘উর্দু স্পিকিং পিপলস্ ইউথ রিহ্যাবিলিটেশন মুভমেন্ট (ইউএসপিওয়াইআরএম) আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশ করা হয়েছে। ওই সমাবেশে সন্ত্রাসী বাবর, হিজড়ার ছদ্মবেশ ধারণ করে মাদক ব্যবসা ও খুনসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ নিরাপদেই করে যাচ্ছে। মাদক ব্যবসা ছাড়াও তার বিরুদ্ধে একটি হত্যামামলাসহ আরও দুটি হত্যার অভিযোগ রয়েছে। সাধারণ ক্যাম্পবাসীর ওপর সে অমানবিক নির্যাতন চালাচ্ছে। সে অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বলা বা প্রতিবাদ করার সাহস পায় না।
তারা বলেন, মিরপুর সেকশন-১০, ১১ ও ১২তে খোলামেলাভাবেই ইয়াবা ও গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক বিক্রি করাচ্ছে বাবর। ছোট ছোট বাচ্চাদের মাদক সেবনে অভ্যস্ত করিয়ে তাদের দিয়েই মাদক বিক্রি করায় সে। ওই সভায় পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দাদন ফকিরও উপস্থিত ছিলেন। তিনি সেখানে বলেছেন, আমি এ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে রয়েছি। আমার সময় এ এলাকার নামকরা মাদক ব্যবসায়ী রাজীবকে গ্রেপ্তার করেছি। মাদক ব্যবসায়ী কালুকে গ্রেপ্তার করেছি। এ বাবর হিজড়া হোক বা যেই হোক, সে অপরাধের সাথে জড়িত। আমরা তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছি।
এএইচ/আমার সংবাদ