দীর্ঘ সময় ধরে আমার সংবাদের অনুসন্ধানে উঠে আসা গত ১০ জুলাই প্রকাশিত সংবাদটির কপি লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের হাতে পৌঁছিয়েছে দলের একটি অংশ। লন্ডনের একাধিক সূত্র আমার সংবাদকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাদের ভাষ্য, তথ্যবহুল সংবাদটির মাধ্যমে তারেক রহমান যুবদলের চলমান আমল জেনেছেন। প্রকাশিত সংবাদের সত্যতা যাচাইয়ে তারেক জিয়া দলের হাই কমান্ডদের সাথে যোগাযোগ করছেন। তাদের ধারণা, হয়তো শিগগিরই এনিয়ে তারেকের ফয়সালা আসতে পারে।
এছাড়াও যুবদল, ছাত্রদল ও বিএনপির একাধিক নেতাও জানিয়েছেন, গত ১০ জুলাই তথ্যবহুল সংবাদটি প্রকাশিত হলে দলের নেতারা পত্রিকার কপিটি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের কাছেও পৌঁছায় এবং এনিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মাঝে এখন আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। বিএনপির অনেক নেতাকর্মীকেও দেখা গেছে সংবাদটি তাদের ফেসবুকে শেয়ার দিতে। আমার সংবাদের অনলাইনেও সংবাদটিতে পাঠক সংখ্যা্ ছাড়িয়েছে হাজার হাজার। শেয়ারের সংখ্যাও বহু। প্রায় আড়াই হাজারেরও বেশি শব্দের সংবাদটির সারসংক্ষেপ পাঠকদের জন্য কিঞ্চিৎ ফের তুলে ধরা হলো ‘যুবদলের প্রত্যেকটি কমিটিই হয়েছে লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে। যারা স্থানীয় রাজনীতির সাথে জড়িত, অভিজ্ঞ, মেধাবী এবং আন্দোলন-সংগ্রামে ত্যাগীদের বাদ দিয়ে ব্যবসায়ী এবং ঢাকায় যাদের বসবাস, ঢাকার নেতাদের বাসায় যাদের পদচারণা এমন নেতাদেরই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগ যারা দলে থেকেও অন্যের প্রেসক্রিপশনে দল চালায় এসব তাদের ষড়যন্ত্র। যাতে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে আন্দোলন নস্যাৎ হয়ে যায়।
এ কমিটি মূলত সরকারি দলের প্রেসক্রিপশনে হচ্ছে, যারা ত্যাগী, মাঠে রয়েছেন, রাজনৈতিক অভিজ্ঞ, তারা কেউ কমিটিতে স্থান পাচ্ছে না। একটা কমিটি গঠন হওয়ার আগে স্থানীয় শীর্ষ ও অভিজ্ঞ নেতাদের পরামর্শ নিতে হয়। কারো পরামর্শ ছাড়াই যুবদল সভাপতির একক ইচ্ছায় এসব কমিটি হচ্ছে। প্রতিটি কমিটিতে ৮ থেকে ৩০ লাখ টাকা নাড়াচাড়া হয় বলে তথ্য রয়েছে তাদের কাছে। টাকার বিনিময়ে এসব কমিটি অনুমোদনে রয়েছে তারেক জিয়ার একজন উপদেষ্টাও।
এছাড়াও দুজন স্থায়ী কমিটির সদস্য, দুজন ভাইস-চেয়ারম্যানও আছেন।’ গত ১২ জুন রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাহ উদ্দিন টুকুকে আটক করে পুলিশ। যুবদলের একটি সূত্র আমার সংবাদকে নিশ্চিত করেছে, সেদিন সেই বাসায় বৈঠকের কথা বলেই টুকুকে ডেকে নেয়া হয়। সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন- যুবদলের সভাপতি সাইফুল ইসলাম নীরব, সিনিয়র সহ-সভাপতি মোর্ত্তাজুল করিম বাদরু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন ও সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন হাসানও। সেই বৈঠকে উপস্থিত থাকা দুজনের সাথে কথা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তারা বলেন, মূলত নির্বাচন ও আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারা দেশের কমিটি নিয়ে আলোচনা হয় সেই বৈঠকে। নির্বাচনের আগে আন্দোলনে যুবদল নেতাদের ভূমিকা কী হবে সেই আলোকে রোডম্যাপ তৈরির পরামর্শ আসে। তবে হুট করে কমিটি ঘোষণার পক্ষে ছিলেন না টুকু ভাই। এ মুহূর্তে কমিটি ঘোষণা করলে দলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে এমন মতই দিয়েছিলেন তিনি। দলে প্রকৃতপক্ষে যারা ত্যাগী, মাঠে আন্দোলন-সংগ্রামে বিগত সময়ে যাদের সরব উপস্থিতি ছিলো, সবকিছু যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমেই কমিটির পক্ষে ছিলেন টুকু ভাই।
ওই বৈঠকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নাম ব্যবহার করে কমিটির পক্ষেই জোর দাবি তোলেন নীরব। একপর্যায়ে কমিটি দেয়া, না দেয়া নিয়ে তাদের মাঝে মনমালিন্য দেখা দেয়। কিছুক্ষণ পর সাদা পোশাকের লোকজন এসে সেই বৈঠকের পর টুকু ভাইকে নিয়ে যায়। বৈঠকে থাকা একজনের ধারণা এটি দলের সভাপতি নীরবের কাজ হতে পারে। কমিটি নিয়ে বাণিজ্য চালাতে এবং আন্দোলনকে ধ্বংস করতে কারো প্রেসক্রিপসন নিয়ে এমন কাজ করেছেন নীরব!
টুকু আটকের মাত্র ৭ ঘণ্টার মাথায় ১৩ জুন দেশের ১৩টি সাংগঠনিক জেলায় যুবদলের আংশিক (পূর্ণাঙ্গ) কমিটি অনুমোদন দেন সভাপতি সাইফুল আলম নীরব ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন। এর মাধ্যমে নীরবের স্বেচ্ছাচারিতা প্রকাশ পায়। দলে নীরবের ওপর সন্দেহের তীর আরও বাড়ে। যেখানে হওয়ার কথাছিলো টুকুর মুক্তির আন্দোলন ও কর্মসূচি, সেখানে কমিটি গঠনের মাধ্যমে দলে চলছে উৎসব। নীরবের বেড়ে ওঠা রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায়। আবার সেই একই এলাকা থেকে এখন ক্ষমতাসীন দলে রয়েছেন একজন শীর্ষ মন্ত্রী। তার সাথে নীরবের বহুদিন থেকে সখ্য।
এ কারণে বিরোধী দলের নেতা হয়েও ক্ষমতাসীন দলের মর্যাদায় রয়েছেন তিনি। যে কারণে কখনো তাকে প্রশাসনের বাধা কিংবা আইনি জটিলতায় পড়তে হয় না। শুধু তাই না, ওই মন্ত্রীর প্রভাব নীরব দলেও খাটান। নিজের মতের বিরুদ্ধে গেলে ওই মন্ত্রীর সাহায্যে যেকোনো মুহূর্তে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা রাখেন এই নীরব। এজন্য গত ১০ বছরেও নীরব রাজনীতিতে বড় পদ-পদবিতে থাকলেও কখনো আটক হতে হয়নি তাকে। মামলার অজুহাতে রাজপথে বিগত সময়ে কোনো আন্দোলনেই দেখা মেলেনি নীরবের।
ঘরোয়া প্রোগ্রামেও কর্মীরা এই নেতার মুখ এখন দেখেন না। তাছাড়া সেই ১/১১-এর সময় থেকে দলে নীরবের ভূমিকা ছিলো প্রশ্নবিদ্ধ। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার বিজি প্রেস, সেন্ট্রাল প্রেস, গভঃ প্রিন্টিং প্রেসের প্রায় ৫শ কোটি টাকার কাজ এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন এই যুবনেতা। এ ছাড়া এই তিন প্রেসের কয়েক হাজার টন বাতিল কাগজ কোনো টেন্ডার ছাড়াই নিয়মিতভাবে নিতেন তিনি।
২০০২ সালে অপারেশন ক্লিনহার্টে মহাখালী ডিওএইচএস থেকে আটক হন নীরব। কিন্তু গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের ফোনে এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবরের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় চারদিনের মাথায় ছাড়া পান তিনি। দীর্ঘ সময়ে নেতৃত্বের নানা পালাবদল হলেও দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী কারাগারে গেলেও প্রায় এক দশক আর এই নেতাকে কারাগারে যেতে হয়নি। যুবদলে জায়গা পেয়ে নীরবকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। নেতৃত্ব বিরোধী দলে তবুও ক্ষমতাসীনদের কোনো বাধায় তাকে পড়তে হয় না।
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ