বিশেষ সম্পাদকীয়-
রাজধানীর বাইরে যারা সাংবাদিকতা করেন, মূলত তাদেরকেই মফস্বল সাংবাদিক বা সংবাদ কর্মী বলে। তাই বলে জাতীয় সমস্যা বা জাতীয় ইস্যু নিয়ে যে এসব মফস্বল সাংবাদিকরা চিন্তা করেন না তা কিন্তু নয়। সাংবাদিকতায় উর্বরক্ষেত্র বা অবাধ স্বাধীনতা কখনই ছিলনা। অবাধ লেখালেখিতে পৃথিবীর দেশে দেশে সাংবাদিকতায় সেন্সরশীপ আরোপ হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। সকল প্রতিকূলতা চাপিয়ে এগিয়ে চলেছে আমাদের এই মহান পেশার দায়িত্ব পালন। প্রায় প্রত্যেক গণতান্ত্রিক দেশেই সরকারি অফিসে তথ্য সংরক্ষণে গুপ্তচরবৃত্তি রোধে রাষ্ট্রীয় আইন রয়েছে। তবে উন্নত বিশ্বের এসব দেশে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া সাংবাদিকদের হয়রানি করা হয়না। বরং সাংবাদিকদের কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্র তাদের দায়িত্ব পালন করে।
আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে স্বাধীনতার পক্ষে তৎকালীন যেসব গণমাধ্যম কর্মী লেখালেখিতে স্বোচ্চার ছিলেন, তখনও সংবাদকর্মীদের উপর রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন হয়েছে। এসব দমন-পীড়ন উপেক্ষা করে পৃথিবীব্যাপি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত সৃষ্টি করেছেন সাংবাদিকরা। সাংবাদিকদের এই জনমত সৃষ্টির আন্দোলন বা লেখালেখি বৃথা যায়নি। আমরা ঠিকই ন’মাস পর স্বাধীনতার লাল সূর্য্য চিনিয়ে আনতে পেরেছি।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের উপরও অলিখিত সেন্সরশীপ চলছে। এটা আমি একজন ক্ষুদে সংবাদকর্মী হিসাবে মেনে নেওয়ার প্রশ্নই ওঠেনা। তবে ডিজিটাল এই যুগে বা অবাধ তথ্য প্রবাহের এই সময়ে গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যে যথেচ্চার ব্যবহার হচ্ছেনা তা কিন্তু নয়। কম্পিউটার প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্রাইম সিন পরিবর্তন করে এর ব্যবহার করা হচ্ছে যে যার মত করে। এখানে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে নিজেদের সুবিধামত করে ব্যবহার হচ্ছে তথ্য। এক্ষেত্রে ফটোশপের মাধ্যমে তৈরী করা হচ্ছে বিভৎস চিত্র। এসব বিভৎসতা দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট করছে।
সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদের সর্বশেষ অধিবেশনে পাশ করা হলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮। এই আইনের ৩২ ধারাসহ কয়েকটি ধারা নিয়ে কঠোর আপত্তি তুলেছেন সাংবাদিকরা। সাংবাদিকরা বলছেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এসব ধারা গুপ্তচরবৃত্তি হিসাবে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে পারে। তাই সাংবাদিকরা আইনটি সংশোধন করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সাথে দেনদরবার করছেন। এক্ষেত্রে মহামান্য রাষ্ট্রপতি একটি ভূমিকা রাখতে পারেন। কারণ, মহামান্য রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের মধ্যদিয়ে এটি আইনে পরিণত হবে। তবে মহামান্য রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর না করে আইনটি পুনর্বিবেচনার জন্য আবারো সংসদে ফেরত পাঠাতে পারেন। সেক্ষেত্রে আইনটি পরিমার্জন করতে হলে সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকতে হবে। আগামী ডিসেম্বরেই আসছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরই মধ্যে নির্বাচনের তোড়জোড় চলছে। মাঠে ময়দানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। তবে এবারের নির্বাচন নিয়ে এখনো নানা সংশয় রয়ে গেছে। এমন একটি মুহুর্তে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি সংশোধনের জন্য সরকার সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকবেন কীনা সেটাই প্রশ্ন?
যাক, আমার বিষয় হচ্ছে মফস্বল সাংবাদিকতার দায়িত্ব কর্তব্য নিয়ে। জাতীয় ইস্যু নিয়ে যারা রাজধানীতে বসে কাজ করেন তাদেরকেই জাতীয় সাংবাদিক হিসাবে সবাই মনে করেন। আমি জেলা পর্যায়ের একজন ক্ষুদে সংবাদ কর্মী। একটি জেলায় অনেক অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, চুরি-ডাকাতিসহ অনেক ধরণের অপরাধ সংগঠিত হয়। এসব নিয়ে লেখালেখি করার অনেক সুযোগ রয়েছে একজন মাঠপর্যায়ের সংবাদ কর্মীর। এগুলো তুলে ধরে আমজনতা এবং প্রশাসনের নজরে আনা এবং এর প্রতিকারের ব্যবস্থা করাই আমার দায়িত্ব কর্তব্য। কিন্তু আমরা কী এসব ক্ষেত্রে আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছি?
মফস্বলের অনাচার-দূরাচার, অসঙ্গতি, অনিয়ম, অবিচার, অন্যের অধিকার হরণ করা এসব যদি আমার লেখনির মাধ্যমে জনসম্মুখে তুলে ধরে প্রশাসনযন্ত্রের নজরে আনতে পারি। তাহলেই আমার প্রকৃত স্বার্থকতা। জাতীয় ইস্যু নিয়ে আমার লেখালেখি হতে পারে কিন্তু এটি আমার দৈনন্দিন দায়িত্ব পালনের বিষয় হতে পারে না। আমার দৈনন্দিন বিষয় হচ্ছে এখানকার বিষয় তুলে ধরা এবং এর প্রতিকারের ব্যবস্থা করা। দলবাজী আনুগত্য প্রকাশ করা আমার জন্য সঠিক পথ নয়। দলবাজ সাংবাদিকতার কারণে আজকে আমাদের মর্যাদা নষ্ট হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ে। এসব দলবাজী সাংবাদিকতা এখন অনেকটা সস্তা জনপ্রিয়তার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে নির্লজ্জ ভাবে। সময় এসেছে দলবাজ সাংবাদিকতাকে লালকার্ড দেখিয়ে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করার। আসুন, আমরা দলবাজ সাংবাদিকতা বর্জন করি।
মো. আলী হোসেন, সাংবাদিক ও লেখক
ahossain640@gmail.com