বুধবার ২২শে এপ্রিল, ২০২৬ ইং ৯ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ:
গণমাধ্যম সপ্তাহের স্বীকৃতিসহ সাংবাদিকদের ১৪ দফা দাবি, কর্মসূচি ঘোষণা লক্ষ্মীপুরে ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল :   বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জুলাই যোদ্ধা ফোর্সের সংঘর্ষ : পুলিশসহ আহত ১০ চট্টগ্রাম বিভাগীয় শ্রমিক দলের সদস্য হলেন মনির আহম্মদ রাজন কফিলউদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন ঈদের আগে অস্থির মুরগির বাজার, সবজিতে স্বস্তি আজ যে দামে বিক্রি হচ্ছে সোনা ফ্লাইট বাতিলে ভিসার মেয়াদ শেষ হলে সহায়তা করবে সরকার চন্দ্রগঞ্জে অস্ত্র-গুলিসহ ৩ ডাকাত গ্রেপ্তার চন্দ্রগঞ্জ প্রেসক্লাবের উদ্যোগে ইফতার ও দোয়ার মাহফিল ভূমিকম্প মোকাবিলায় ঢাকায় ১ লাখ স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুতের নির্দেশ

৫ বছরে বিএনপি কোথায়?

আকাশবার্তা ডেস্ক : 


১০ বছর ধরে তারা ক্ষমতার বাইরে৷ শুধু তাই নয়, ২০১৪ সালে নির্বাচনে না যাওয়ায় সংসদেরও বাইরে ছিল বিএনপি৷ কোনো আন্দোলন জমাতে পারেনি তারা৷ পাঁচ বছরের হিসেব-নিকেষে আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে বিএনপি?

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং সমমনা দলগুলো ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন বর্জনই করেনি, নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণাও দিয়েছিল৷ তাদের তখন দাবি ছিল নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে৷

বিএনপি নির্বাচন প্রতিহত করা তো দূরের কথা, কোনো কার্যকর আন্দোলনও গড়ে তুলতে পারেনি৷ বরং নির্বাচনের আগে ও পরে যে রাজনৈতিক সহিংসতা ও আগুন সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে, তার দায় পড়েছে দলটির ওপর৷তারপর এই দায় থেকে মুক্তি পেতে পার করতে হয়েছে পাঁচ বছর৷ ওই সন্ত্রাসের ঘটনায় দেশের অভ্যন্তরে তো বটেই, আন্তর্জাতিকভাবেও বিএনপি সমালোচনার মুখে পড়েছে৷

২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি ছিল সংসদে বিরোধী দল৷ ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে মাত্র ৩০টি আসন পেয়েছিল৷ আসন কম হোক, তবুও বিএনপি সংসদে ছিল৷ কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় একতরফা নির্বাচনের সুযোগ নেয় আওয়ামী লীগ৷ বিএনপি সংসদেরও বাইরে চলে যায়৷ আর তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসে৷

ফলে প্রায় একযুগ ধরে ক্ষমতার বাইরে আছে বিএনপি৷ এমনকি তারা সংসদেও নেই, যা বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক হতাশার সৃষ্টি করেছে৷ দলের অনেক নেতা-কর্মী নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন৷ তবে গত পাঁচ বছরে বিএনপি স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে অংশ নিয়েছে৷ আর তাতে তাদের অনেক প্রার্থী জয়ও পেয়েছেন৷ যদিও আইনি প্যাঁচে ফেলে তাঁদের অনেকের দায়িত্ব পালন বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে৷

বিএনপি অবশ্য এই হতাশা আর নিস্ক্রিয়তার জন্য সরকারের দমন-পীড়নকে দায়ী করছে৷ তারা বলছে, শত শত মামলা, হামলা আর হয়রানি বিএনপি নেতা-কর্মীদের ভয়ার্ত করে তুলেছে৷ দীর্ঘদিন তাদের জনসভা তো দূরের কথা, কেথাও দাড়াতেই দেয়া হয়নি৷ দলটির দাবি, এজন্য পুলিশ, প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে ব্যবহার করেছে সরকার৷

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া কারাগারে৷ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে আছেন দীর্ঘদিন ধরে৷ তিনিও একাধিক মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত৷এই দণ্ডপ্রাপ্তদের দলের নেতৃত্বে রাখার জন্য চলতি বছরে বিএনপি তার গঠনতন্ত্র সংশোধন করে৷ কিন্তু সম্প্রতি হাইকোর্ট সংশোধিত গঠনতন্ত্র গ্রহণ না করতে নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছে৷ তবে বিএনপি’র আপিলের সুযোগ আছে৷

চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে খালেদা জিয়া কারাগারে আছেন৷ ওইদিনই জিয়া অর্ফানেজ ট্রাস্ট মামলায় তাঁর পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয়৷ তবে সম্প্রতি দুদক-এর আপিলে সেই সাজার মেয়াদ বেড়ে ১০ বছর হয়েছে৷ জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট নামের আরেক মামলায় তাঁর সাত বছরের কারাদণ্ড হয়েছে৷ তারেক রহমান একুশে আগস্টের গ্রেনেড মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত৷ তিনি অর্থ পাচারের মামলায়ও দণ্ডপ্রাপ্ত৷

৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে সন্ত্রাসের জের বিএনপিকে গত ৫ বছর ধরেই টানতে হয়েছে৷ ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে কয়েকশ’ মামলা হয়েছে৷ আর সম্প্রতি ‘গায়েবি’ মামলা বলে যেসব মামলা হয়েছে, তাতেও বিএনপির নেতা-কর্মীদের একটি অংশ আসামি৷ সর্বশেষ গত বৃধবার নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে পুলিশের সঙ্গে দলটির নেতা-কমীদের যে সংঘর্ষ হয়েছে, তার দায়ও চাপছে বিএনপির ওপর৷

যদিও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দাবি করেছেন, ‘‘সরকার পরিকল্পিতভাবে ওই ঘটনা ঘটিয়েছে৷”পাঁচ বছরে বিএনপি তার সংগঠনকেও গোছাতে পারেনি৷ স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কমিটি হচ্ছে না দীর্ঘদিন ধরে৷ কাউন্সিল হচ্ছে না৷ একবার হয়েছে খালেদা জিয়া মুক্ত থাকার সময়৷ তবে তা-ও ছিল নিয়ম রক্ষার কাউন্সিল৷ নির্বাচন কমিশনের বাধ্যবাধকতার কাউন্সিল৷

ফলে শীর্ষ নেতৃত্বে যে সংকট, সেই সংকট এখন তৃণমূলেও৷ বিএনপিতে একটি কথা আছে যে, দলটি পরিচালিত হয় লন্ডন থেকে৷ তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের বাইরে কিছু করার সুযোগ নেই বিএনপি নেতাদের৷ আর এটাও শোনা যায় যে, ৫ ফেব্রয়ারির নির্বাচন বিএনপি বর্জন করেছিল তারই কথায়৷ নেতা-কর্মীরা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত ছিল৷ কারণ, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দল সুসংগঠিত হয়৷

বিএনপি এখন সেই বিষয়টি বুঝতে পেরেছে৷ শুরুতে তারা খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিল৷ তবে সেই অবস্থান থেকে এখন সরে এসেছে৷ নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি তাদের আছে৷ তবে দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচনে যাচ্ছে আন্দোলনের অংশ হিসেবে৷ এখন আর বিএনপি একা নয়৷ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে৷ ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ড. কামাল হোসেন৷ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপি এখানে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে৷ কারণ, বিএনপিতে এখন তৃতীয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা কঠিন ছিল৷ ঐক্যফ্রন্ট সেই সংকট কাটাতে সহায়তা করেছে৷

ঐক্যফ্রন্টের নেতা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. জাফর উল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘‘এমন একটা সময় ছিল, যখন বিএনপির সবাই তারেক রহমানের দিকে তাকিয়ে থাকত৷ হুক্কা হুয়া করত৷ আমি সরকারকে ধন্যবাদ দিই যে, তারা খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে সহায়তা করেছে৷ তারা বুঝতে পেরছে, এক ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে দল চলে না৷”

তিনি বলেন, ‘‘গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই বিএনপির মধ্যে এই পরিবর্তন শুরু হয়েছে৷ আমি তাদের কাছ থেকে জানি৷ আর এখন ঐক্যফ্রন্টের বৈঠকেও দেখি৷ তারা সম্মিলিতভাবে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়৷ কোনো এক ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে থাকে না৷ দলের মধ্যে তারা গণতন্ত্র চর্চা শুরু করেছে৷ খালেদা জিয়াও তাদের গণতান্ত্রিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে বলেছেন৷ ফলে নেতৃত্বের যে একটি সংকট তৈরি হয়েছিল, তা কেটে যাচ্ছে৷”

তিনি আরো বলেন, ‘‘আমি মনে করি, বিএনপির গত ৫ বছরে যদি কোনো অর্জন থাকে, সেটা এই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট৷ এটা বিএনপিকে সাহস জুগিয়েছে৷ বিএনপির নেতা-কর্মীরা এখন বাইরে বের হতে সাহস পাচ্ছে৷ তারা মনে করছে, তারা এগিয়ে যেতে পারবে৷”

বিশ্লেষকদের মতে, ড. কামাল হোসেনকে ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্বে আনা বিএনপির একটা বড় সাফল্য৷ এটা ভোটের হিসেব নয়৷ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন একটি ধারা সৃষ্টির বিষয়৷ এখন দেখা যাক, এই ধারা ধরে রেখে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি কোথায় যেতে পারে৷

বাংলাদেশে ২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয়৷ এই বিচারের প্রশ্নে বিএনপি কখনো স্বচ্ছ অবস্থান নিতে পারেনি৷ গত পাঁচ বছরেও তার অবস্থান পরিষ্কার ছিল না৷ এটা হয়ত জামায়াত ও নিজ দলের যুদ্ধাপরাধীদের কারণে হয়েছে৷ আর জামায়াতকে পরিত্যাগের প্রশ্নেও বিএনপি আগের অবস্থানে আছে৷ ২০১৪ সালের সহিংসতা, সাঈদীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের রায়ের পর সহিংসতায় জামায়াত ত্যাগের চাপ বিএনপির ওপর প্রবল হয়৷ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও বিএনপি জামায়াতের ব্যাপারে কী অবস্থান নেয়, তা পর্যবেক্ষণ করছে৷

এরই মধ্যে বিএনপির মিত্র জামায়াতের দলীয় নিবন্ধন বাতিল হয়েছে৷ তারা প্রতীকও হারিয়েছে৷ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের সময়ও জামায়াত ইস্যু সামনে আসে৷ বিএনপি জামায়াতকে বাদ দিয়ে ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিলেও তাদের ২০ দলীয় ঐক্যজোটে জামায়াত আছে৷ বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভোট এবং আদর্শিক কারণে বিএনপির পক্ষে জামায়াত-বিচ্ছিন্ন হওয়া সম্ভব নয়৷ ফলে জামায়াত বিতর্ক বিএনপির পিছু ছাড়বে না৷

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. শান্তনূ মজুমদার মনে করেন, ‘‘গত পাঁচ বছরে দল হিসেবে বিএনপি যে ভেঙে যায়নি বা ভাঙা যায়নি – এটাই বিএনপির বড় সাফল্য৷ নানা সংকট ও ভুল সিদ্ধান্তের পরও বিএনপি ভেঙে কোনো কোনো উপদল বা আলাদা দল হয়নি৷ এটার পিছনে নানা কারণ থাকতে পারে৷ বাংলাদেশে ভোটের ভাগ দু’টি৷”

তিনি বলেন, ‘‘২০১৪-১৫ সালে বিএনপি ভুল সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল, তার দায় কিন্তু তারা স্বীকার করেনি৷ ফলে বলা যাবে না যে, বিএনপি ওই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছে৷ তবে এবার নির্বাচনমুখী হয়েছে তার স্বার্থেই৷”তিনি আরো বলেন, ‘‘জামায়াতকে ত্যাগ করা বিএনপির পক্ষে সম্ভব নয়৷ এটা শুধু ভোটের কারণে নয়, আদর্শিক কারণেও৷”

বিএনপি এবার নির্বাচনে না গেলে নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে৷ আইন অনুযায়ী পরপর দু’বার কোনো নিবন্ধিত দল নির্বাচনে অংশ না নিলে নিবন্ধন বাতিল হয়ে যায়৷ বিএনপি সেটা জানে৷ আর নির্বাচনের মাধ্যমে নেতা-কর্মীরা উজ্জ্বীবিত হয়৷ ১০ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা এই দলটি এবার নির্বাচনের মাধ্যমে আবার ঘুরে দাঁড়াবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা৷ আর সেই ঘুরে দাঁড়ানোর মধ্যে ক্ষমতায় যাওয়া-না-যাওয়ার বিষয় নেই৷ বিষয়টি দল হিসেবে বিএনপির এগিয়ে যাওয়া ও টিকে থাকার৷

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

এপ্রিল ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« মার্চ    
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০