শুক্রবার ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ইং ১৫ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ:
লক্ষ্মীপুরে আগুনে পুড়ে ৯ দোকান ছাই, ৭৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি মানবিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গঠনে সবার সহযোগিতা চাই নবনির্বাচিত ২৯৭ সংসদ সদস্যের গেজেট প্রকাশ নির্বাচনে ভোটের বক্স নিয়ে যাবে নদীর দিকে, আশঙ্কা জেএসডি নেতার ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির মহিমান্বিত রজনী-শবে বরাত জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশ পাকিস্তান হয়ে যাবে : ফজলুর রহমান লক্ষ্মীপুরে ৬ সিলসহ ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার : বিএনপি-জামায়াত প্রার্থীর পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন যাদের জন্য দেশে আসতে পেরেছেন, তারা জুলাইয়ের অবদান অস্বীকার করছেন : ডা. শফিকুর রহমান লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে নিখোঁজের ৭দিন পর কলেজ ছাত্রের লাশ উদ্ধার লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে যৌথবাহিনীর অভিযানে অস্ত্রসহ শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘চিতা’ গ্রেপ্তার

ঐতিহ্য হারানো এক বাজারের ক্রন্দন!

ইঞ্জি. আরিফ চৌধুরী শুভ. সাংবাদিক ও লেখক.

লক্ষ্মীপুর জেলার বয়স মাত্র ৩২ বছর। তার আগে লক্ষ্মীপুর ছিল চট্টগ্রাম বিভাগের একটি উল্লেখযোগ্য মহকুমা। লক্ষ্মীপুর মহকুমা ১৯৮৫ সালে তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি স্থান, জনসংখ্যা ও বিশেষ বৈশিষ্টের জন্যে জেলার স্বীকৃতি লাভ করে। লক্ষ্মীপুর জেলা হবার সময় দলিলপত্রে যেসকল গুরুত্বপূর্ণ স্থানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে ফরাশগঞ্জ স্থান পেয়েছে। ফরাশগঞ্জ লক্ষ্মীপুরের ঐতিহ্য হিসাবে স্থান পাওয়ার পিছনে জোরালে যুক্তি রয়েছে। এই যুক্তি লক্ষ্মীপুরের প্রবীণ, নবীণ, লেখক, রাজনৈতিক এবং যুক্তিবীদদের যুক্তি। লেখক নাজিম উদ্দিন মাহমুদ এর লেখা লক্ষ্মীপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বইয়ে স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরেছেন ফরাশগঞ্জ কেন এতিহ্যেবাহী গ্রামের দাবিদার। লেখক নাজিম উদ্দিনের বাড়ি হাজির হাঁটের কমলনগরে, ফরাশগঞ্জে নয়। এছাড়া বহু লেখক, গায়ক তাদের লেখা ও গানের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন ফরাশগঞ্জের কথা।

লক্ষ্মীপুরের ১৮নং কুশাখালী ইউনিয়নে ফরাশগঞ্জ গ্রামটি অবস্থিত। মানিক বন্ধোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসে আন্ধারমানিক গ্রামের কথা উল্লেখ আছে। এই আন্ধারমানিক গ্রাম ফরাশগঞ্জের পাশের গ্রাম। আন্ধারমানিকসহ আশাপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ নিত্য পণ্য বেচাকেনার জন্যে ফরাশগঞ্জের সাপ্তাহিক বাজারের উপর নির্ভরশীল ছিলো তখন। কালের পূরাণে স্বস্ব গ্রামে গড়ে উঠেছে স্থানীয় বাজার ব্যবস্থা। পরিবর্তন ব্যবস্থার নীতিতে অন্য গ্রামগুলো ঠিকই পরিবর্তন হচ্ছে কিন্তু ঐতিহ্য হারিয়ে নামেই টিকে আছে এই গ্রামটি। গ্রামটি জেলা সদরের অন্তর্ভুক্ত হলেও দীর্ঘ দিনেও নজরে আসেনি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের। ফলে ভাগ্যের দোহাই দেওয়া ছাড়া কিছুই করার ছিলনা গ্রামবাসীর।

গ্রামের একটিমাত্র বাজারের অবস্থাও করুণ। প্রায় জরার্জীণ ও শোষনীয় বাজারের বিভিন্ন অংশ। ২০ বছরেও কোন সংস্কার করা হয়নি বাজারটিতে। দুই শতাধিকের বেশি দোকানপাট থাকলেও নেই কোন ড্রেন, পাবলিক টয়লেট, যাত্রী ছাউনি, সেডঘর এবং টিউবয়েল। বিশ বছর আগে এই বাজারে যে টিউবয়েলটি ছিল, সেটি ছিল এই গ্রামের একমাত্র সুপানিয় ব্যবস্থা। সেটি বিকল হয়ে আছে বছর তিনেক ধরে। বাজারে ব্যবসায়ী আছে কিন্তু ব্যবসা নাই। বাজারে দোকান আছে কিন্তু ক্রেতা নাই।

বাজারটি নিয়মিত সরকারিভাবে ডাক হয়। কিন্তু সরকারি সুযোগ সুবিধা পায় না। সপ্তাহে সরকারি ডাক অনুযায়ী সোমবার ও শুক্রবার মোট দুদিন হাট মিলিত হয় স্থানীয় পণ্য আমদানি ও রপ্তানির জন্যে। আগে জেলাশহর থেকে পাইকাররা স্থানীয়দের উৎপাদিত পণ্য কিনতে বাজারে আসলেও বতর্মানে যাতায়াত ব্যবস্থার বেহাল দশার কারণে এখন আর আসেন না পাইকাররা। ফলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে স্থানীয় কৃষির চাষাবাদ অনেকটা কমে গেছে। গ্রামবাসীর জোরালো মত বাজারটি এভাবে মরে মরে টিকে আছে। তাহলে বাজারটির সংস্কারই প্রথম কাজ মনে করি আমি।

সরকারি তালিকায় এ বাজারটির জিসি কোর্ড নাম্বার ৪৫১৪৩৯০৪১ এবং এটি একটি রুরাল মার্কেট তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। এর মোট আয়তন ৩৩৪ ডেসিমেল বা শতাংশ। এর মধ্যে সরকারি জমির পরিমাণ মাত্র ৩৪ ডেসিমেল এবং ব্যক্তিগত জমির পরিমাণ ৩০০ ডেসিমেল। বেশির ভাগ সরকারি খাস জমির দখল নিয়েছে প্রভাবশালী একটি চক্র। এই চক্রের কেউ গ্রামের বাসিন্ধা, কেউ জেলা সদরের। তারা শুধু জমি দখল করেই স্থানীয়দের দিয়ে দেখবাল করছেন, কিন্তু বাজার সংলগ্ন এই সকল জমিতে বাজারের উন্নয়নকল্পে তাদের কোন উদ্যোগও দেখেনি এলাকাবাসী। সরকারী ভাবে উদ্যোগ নেওয়া হলে এই জমিগুলো দখলমুক্ত করে বাজারের আয়তন বৃদ্ধি করা সম্ভব। এই সব দখলি জমি উন্মুক্ত হলে সেখানে মাছ বাজার, গরুবাজার, সবজি বাজার, যাত্রীছাউনি বানানো সম্ভব। প্রশাসন উদ্যোগ নিলে স্থানীয়রা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামতে প্রস্তুত এই গ্রাম ও বাজারের উন্নয়ন ও ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে।

এ গ্রামটি যে শুধু বাণিজ্যের জন্যে বিখ্যাত ছিল তা নয়। বাংলাদেশের বহু সূর্য্সন্তান জন্মেছিলেন এই ফরাশগঞ্জে। যাদের অবদান রাষ্ট্রে কম ছিলনা। বায়ান্নোর ভাষা সৈনিক কমরেড তোয়া, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলের শিক্ষামন্ত্রী মুজাফফর আহমেদ, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক সানাউল্লাহ নূরি, জমিদার রজনীকান্ত মজুমদার, জমিদার মুকুন্দ বাবু, কবি আবু হেনা আবদুল আউয়াল, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও শিক্ষানুরাগী মুনছুর আহম্মদ কোম্পানীসহ প্রমুখ জ্ঞানগর্ব সন্তান এই ফরাশগঞ্জ গ্রামেই জন্মেছিলেন। এঁরা কেউ বেঁচে নেই এখন। তবে তাঁদের উত্তরসূরিদের অনেকেই দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োজিত আছেন।

মুনছুর আহাম্মদ কোম্পানীর বড় ছেলে মোহাম্মদ সেলিম আহমদ বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এর ১৪নং ওয়ার্ড কমিশনার এবং একজন বহুমুখি ব্যবসায়ী। তাঁর আরেক ভাই মোহাম্মদ শাহীন আহমেদ হাজারীবাগ ট্যানারী মোড় শিল্প কারখানা এসোসিয়েশনের সভাপতি এবং হাজারীবাগ থানা আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি। কয়েক বছর পর বা কখনো বছরে একবার এলাকায় আসলেও এদের অনেকেরই নেই কোন এলাকা উন্নয়নমুখি তেমন কোন উদ্যোগ। তারা প্রত্যেকেই স্বস্থানে অবদান রাখছেন রাষ্ট্রের কিন্তু পিছিয়ে গেছে নিজের জন্মস্থান এই গ্রামটি। এই গ্রামের উৎপাদিত শস্য এই গ্রামেই প্রসেসিং করা যেত যদি একটি খাদ্য গুদাম ও কারখানা থাকতো। শিল্পকারখানা ও কলেজ প্রতিষ্ঠা হলে সরাসরি যোগাযোগ সৃষ্টি হতো জেলা শহরের সাথে।

ফরাশগঞ্জ গ্রামে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্কুল, একটি পাঠাগার রয়েছে। শিল্পপতি মুনছুর আহাম্মদ ১৯৮৬ সালে ফরাশগঞ্জ গ্রামে মুনছুর আহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানের জমিদাতা ছিলেন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা মুরহুম ডাক্তার মোমতাজ উদ্দিন আহমেদ যিনি আমার বাবা ছিলেন। তার পর থেকে এই এলাকায় শিক্ষাপ্রসারের অনেক উন্নতি ঘটে। কিন্তু কলেজের অভাবে মাধ্যমিকের পরেই অনেক শিক্ষার্থী পাঠ চুকান শিক্ষাজীবনের। কেউ পাড়ি জমান প্রবাসে। এদের কেউ কেউ চাকুরিতে যোগ দিতে পারলেও বেশির ভাগই শিক্ষিত তরুণ বেকার হয়ে ‍ঘুরে বেড়ান এলাকাতে। অনেকে আবার বেকারত্বের মাঝে জড়িয়ে পড়েন বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে।কলেজ থাকলে এদের অনেকের উচ্চ শিক্ষার পথ সুগম হতো।

ফরাশগঞ্জবাসীর অরেক আতঙ্ক এখন ভূমিদস্যু। এই আতঙ্ক এখন অনেক তীব্র আকার ধারণ করছে। নিদ্দিষ্ট সংখ্যক ভূমিদস্যুর দখল করে আছে গ্রামের বেশির ভাগ মানুষের জমি। দিনদিনই ভুমিদস্যুদের অত্যাচারের নি.স্ব ভুমিহীনরা হারিয়ে ফেলেছে প্রতিবাদের ভাষা। তারা ভুমিদস্যুদের জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পেতে চায়। তারা ফিরে পেতে চায় গ্রামের ঐতিহ্য। ভুমিদস্যুদের সহযোগিতায় গ্রামে গড়ে উঠেছে ব্রিকফিল্ড। বাংলা চিমনি দিয়ে চলছে এই সব ফিল্ড। গ্রামের সবুজ বৃক্ষ পোড়ানো হচ্ছে অনেক ফিল্ডে। বছর তিনেকের মধ্যে গ্রামে ও গ্রামের আশপাশে গড়ে উঠেছে ৫ টি ব্রিকফিল্ড। এতে করে এলকার বায়ুদূষণ থেকে শুরু করে নষ্ট হচ্ছে সামগ্রিক পরিবেশ। রাস্তাগুলো চলাচলের অনুউপযোগি হয়ে পড়েছে পাওয়ার টিলারের চাকার ঘর্ষণে। শিশু ও শিক্ষাথীরা বিদ্যালয়ের পরিবতে ব্রিকফিল্ডমুখি হচ্ছে অতিরিক্ত আয়ের লোভে।

ফরাশগঞ্জ বাজারের উন্নয়নে বিভিন্ন সময় ইউনিয়ন পরিষদের লোকদেখানো প্রশাসনিক জরিপ ছাড়া এলাকাবাসী আর কিছুই দেখেনি অতীত পরিষদের কাছে। এই গ্রামের দীর্ঘদিনের জনপ্রতিনিধি ও বাজার বণিক সমিতির সভাপতি সফি উল্যাহ মেম্বার বিভিন্ন ভাবে চেষ্টা করেও অনেকটা ব্যর্থ হচ্ছেন বাজারটির উন্নয়নে। যেখানেই যান সেখানেই শুধু আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতি পান তিনি, কিন্তু পান না কোন উন্নয়নমুখি বাজেট বা বরাদ্দ। এমন দাবী বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাওলানা নুরুল ইসলামসহ ব্যবসায়ীদেরও। তাই তাঁরা অনেকটা অভিমানীত ও ক্ষুব্ধ। সবাই জেলা প্রশাসনের আন্তরিক উদ্যোগ ও দৃষ্টি কামনা করছেন।

বহুল প্রচলিত ও লোকমুখে শোনা, ভাষা সৈনিক কমরেড তোয়া সাহেবের বংশধর ফরান হাজী ফরাশগঞ্জ প্রতিষ্ঠা করেন। নদী ভাঙ্গার পরে ফরান হাজীরা সব গুটিয়ে চলে যান রামগতির কমলনগরে (বর্তমানে কমলনগর উপজেলা)। সেখানে গিয়ে হাজীরহাঁট প্রতিষ্ঠা করেন। আজ হাজীরহাঁটও লক্ষ্মীপুর জেলার একটি বিখ্যাত ও সমৃদ্ধ স্থান। কিন্তু ভাগ্য বদলায়নি ফরাশগঞ্জের। নদী ভাঙ্গার কারণে ফরাশগঞ্জের স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন এলাকায় স্থানান্তরিত হয়ে আলোকিত করছে সেই সব এলাকা কিন্তু ফরাশগঞ্জ কাঁদছে তার ঐতিহ্য হারিয়ে।

বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটারের প্রেসিডেন্ট ও বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদারের সাথে এক সৌজন্য সাক্ষাতে উঠে আসে ফরাশগঞ্জের প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিভিন্ন স্মৃতিকথা। তিঁনি মনে করেন, প্রশাসন উদ্যোগ ছাড়া এই গ্রামের অতীত ঐতিহ্য ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।

ফরাশগঞ্জ গ্রামের বয়োজৈষ্ঠ শিক্ষক মাস্টার আবু তাহের বলেন, আমরা যেই ফরাশগঞ্জ দেখেছি, সেটি এখন ইতিহাস। আমাদের ছেলেমেয়েরা সেটি এখন ইতিহাসে পড়ে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ফরাশগঞ্জ এখন শুধু ইতিহাসে আছে ,বাস্তবে নাই!

আমরা শুধু শহরকে উন্নয়ন করলে চলবে না, গ্রামকেও উন্নয়ন করতে হবে শহরের জন্যে। যে গ্রাম ঐতিহ্যের ধারক সেই গ্রামকে সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে প্রশাসনের। ফরাশগঞ্জ গ্রামের সন্তান হিসাবে আমারও বিশ্বাস এবার সত্যি প্রশাসন এগিয়ে আসবেন ফরাশগঞ্জ গ্রামের ঐতিহ্য রক্ষায়।

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

ফেব্রুয়ারি ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« জানুয়ারি    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮