আকাশবার্তা ডেস্ক :
রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হিন্দু না মুসলিম তা নিয়ে দুই পরিবারে বিরোধের কারণে সাড়ে ৪ বছরের অধিক সময় লাশ পড়ে আছে ঢামেক মর্গে। তিনি ২০১৪ সালের ২৬ জুন তিনি বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এতে ১ হাজার ৬৬৩ দিন অর্থাৎ ৪ বছর ৬ মাস ১৯ দিন ধরে ঢামেক মর্গে তার লাশ পড়ে আছে। নিহতের নাম খোকন নন্দী ওরফে খোকন চৌধুরী। তার লাশের দাবিদার দুই স্ত্রী। তাদের একজন মুসলিম। অন্যজন হিন্দু। দুই জনেরই দাবি খোকন নন্দী ওরফে খোকন চৌধুরী তাদের স্বামী। মুসলিম স্ত্রীর দাবি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে খোকন তাকে বিয়ে করেছিলেন। আর মুসলিম হিসেবেই তিনি অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। আর হিন্দু ধর্মের দাবি সনাতন ধর্ম বিশ্বাসে থেকেই তিনি মারা গেছেন। দুজনের এমন দাবির বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। তবে প্রথম দফায় আদালতও কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি। দুই স্ত্রীর এমন অবস্থায় লাশের ঠিকানা এখন ঢামেক মর্গের মরচ্যুয়ারিতে।
নিহত খোকন নন্দী ওরফে খোকন চৌধুরীর লাশ নিয়ে দুই পরিবারের টানাটানি নিয়ে অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য এর আগে প্রকাশিত হয়েছে।
সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হিন্দু না মুসলিম তা নিয়ে দুই পরিবারের দাবি ও লাশ নিয়ে টানাহেঁচড়ার পেছনে রয়েছে নিহত খোকন নন্দী ও খোকন চৌধুরীর ফার্মগেট এলাকায় শত কোটি টাকার বিশাল মার্কেটসহ সম্পত্তির ভাগ নিয়ে লড়াই। খোকন নন্দী ওরফে খোকন চৌধুরী জীবিত অবস্থায় তিনি হিন্দু-মুসলিম দুই পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেছেন। রাজধানীর উত্তর শাহজাহানপুর এলাকায় তার দ্বিতীয় স্ত্রী হাবিবা আক্তার খানম ওরফে বাবলিকে নিয়ে থাকতেন। সেসময় ওই এলাকার মসজিদে গিয়ে মাঝে মধ্যে নামাজও পড়তেন। শুধু তাই নয়, ঈদুল আজহার সময় গরু কিনে কোরবানি দিয়ে এলাকায় মাংসও বিতরণ করতেন।
অপরদিকে খোকন নন্দীর প্রথম স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে তখন রায়েরবাজার এলাকায় থাকতেন। তিনি সনাতন ধর্মের সব আচার অনুষ্ঠান পালন করতেন। নিয়মিত মন্দিরেও যেতেন বলে তার পরিচিতজন জানিয়েছেন।
নিহত খোকন চৌধুরীর দ্বিতীয় স্ত্রী জানান, গত ২০১৪ সালের ১৪ জুন খোকন চৌধুরী অসুস্থ হন। এরপর দ্বিতীয় স্ত্রী হাবিবা আক্তার খানম ওরফে বাবলি রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৬ জুন সকাল ৯টা ৪০ মিনিটের সময় তিনি মারা যান। এরপর হাসপাতাল থেকে তার সঙ্গে থাকা দ্বিতীয় স্ত্রী হাবিবা আক্তার খানম ওরফে বাবলি স্বামীর লাশ নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেন। কিন্তু খোকন চৌধুরীর প্রথম স্ত্রী মিরা নন্দী এবং তার দুই সন্তান বাবুল ও চন্দনা বাধা দেন। তারা দাবি করেন, তাদের পিতা খোকন নন্দীর লাশ তারা নিয়ে হিন্দুধর্ম মতে সৎকার করবেন।
এ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। আর এই দুপক্ষের বিরোধের কারণে তৎকালীন রমনা থানা ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে বিরোধ মিটাতে না পারায় বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। মামলাটি এখনো চলমান। চলতি মাসেই একটি শুনানির তারিখ রয়েছে বলে খোকন চৌধুরীর দ্বিতীয় স্ত্রী হাবিবা খানম গতকাল জানিয়েছেন। এখন মামলাটি দ্বিতীয় জেলা জজ আদালতে রয়েছে বলে জানা গেছে।
হাবিবা খানম আরও বলেন, খোকন নন্দী মুসলমান হয়ে খোকন চৌধুীর নাম রেখেছিলেন। তিনি মুসলমান হওয়ার পক্ষে তার কাছে যথেষ্ট দালিলিক ও স্থানীয়ভাবেও প্রমাণও রয়েছে। গত ১৯৮৪ সালের ২ জুলাই খোকনের সঙ্গে ইসলামী শরিয়ত মতে তাদের বিয়ে হয়।
এরআগে হাবিবুর রহমান নামে প্রথম শ্রেণির একজন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে এফিডেভিট করে খোকন ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তার বিয়ের কাবিননামা, এফিডেভিট রয়েছে। খোকন চৌধুরী আমার স্বামী এবং মুসলমান এটা প্রমাণের জন্য আর কি প্রয়োজন। খোকনের চার ভাইয়ের মধ্যে দুভাই জহরলাল নন্দী ও সাগর নন্দী রাজধানী ঢাকায় থাকতেন। তখন খোকন ও বাবলি উত্তর শাহজাহানপুরস্থ ৩৩১ নম্বর বাড়িতে থাকতেন। সেখানে খোকন চৌধুরীর ভাই সারগর নন্দী প্রায়ই আসা-যাওয়া করতেন। আর সাগর নন্দী দীর্ঘদিন তেজতুরি বাজারে থাকতেন।
ফার্মগেটস্থ খোকন চৌধুরীর মার্কেটের সামনে ব্যবসায়ীরা জানান, খোকন চৌধুরী আগে হিন্দু ধর্মের ছিল। কিন্তু পরে তার চালচলনে মুসলমান হিসেবেই মনে হতো। আর অনেকেই তাকে খোকা ভাই বলে ডাকতেন। তিনি সকালে সাজাহানপুরের বাসা থেকে বের হতেন, আর রাতে বাসায় ফিরতেন। এজন্য আশপাশের লোকজনের সঙ্গে তার তেমন ঘনিষ্ঠতা ছিল না বলেই জানা গেছে। তবে মাঝে মাঝে শুক্রবার জুমার নামাজ পড়তে স্থানীয় মসজিদে যেতেন খোকন।
এছাড়া, প্রতি ঈদ-উল-আজহায় গরু কিনে কোরবানি দিতেন খোকন চৌধুরী ও বাবলি দম্পতি। গরু কুরবানির পর মাংসও বিতরণ করতেন খোকন নিজেই। স্থানীয় দোকানদারসহ অনেককেই তিনি কুরবানির গরুর মাংস দিতেন। কুরবানি দিতেন খোকার শ্বশুরবাড়ি অর্থাৎ বাবলির বাবার বাড়ি সিদ্ধেশ্বরীতে। উত্তর শাহজাহানপুরে দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে ছিলেন এই দম্পতি। ওই বাড়ির বাসিন্দরাও খোকনকে একজন মুসলমান হিসেবেই জানতেন।
এর আগে খোকন চৌধুরী ওরফে খোকন নন্দীর প্রথম পক্ষের সন্তান ও তার স্ত্রীর অভিযোগ, হাবিবা আক্তার খানম বাবলির জাতীয় পরিচয়পত্রে তার পিতার নাম মৃত হাবিবুর রহমান, মায়ের মঞ্জুরা বেগম, জন্ম তারিখ ২ ডিসেম্বর ১৯৫৬ সাল ও বাসার ঠিকানা ১১/১ সিদ্ধেশ্বরী উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু স্বামী হিসেবে কারো নাম উল্লেখ নেই।
এ বিষয়ে হাবিবা খানম জানান, ভোটার হওয়ার সময় এ বিষয়টি চিন্তা করিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকার সময় তার সঙ্গে খোকন নন্দীর পরিচয় হয় পুরানা পল্টনে একটি চটপটির দোকানে। ওই পরিচয়ের সূত্র ধরে ১৯৮৪ সালের ২ জুলাই তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। এরপর ১৯৮৬ সালে প্রথম স্ত্রী মীরাকে ডিভোর্স দেন খোকা। এ সংক্রান্ত কাগজপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, মীরা নন্দীর সঙ্গে খোকনের এক ভাই বাবুল নন্দীর অনৈতিক সম্পর্ক ছিল। আর ওই বিষয়টি খোকন নন্দী জানার পর পরই তিনি দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার প্রথম স্ত্রী মীরা নন্দী এবং এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে রাজধানীর রায়েরবাগের বাসায় থাকতেন।
খোকনের গ্রামের বাড়ি মহেশখালীর জামালপাড়া গ্রামে। তার ভাই জহরলালের সঙ্গে তার বৌদি মীরার অবৈধ সম্পর্কের বিষয়টি গোপন কিছু না। আর এ কারণেই খোকা ধর্মান্তরিত হয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন হাবিবা খানম বাবলিকে। তাকে নিয়ে অনেকবার খোকা কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন। তার ভাই-বউদের সঙ্গেও পরিচয় করিছেন। সম্প্রতি একটি বেসরকারি চ্যানেলেও তারা সাক্ষাতকার দিয়ে বলেছেন আমাকে তারা চেনেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে খোকন নন্দীর মার্কেটের লোকজন জানান, খোকন ধর্মান্তরিত হওয়ার পর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেও তার ছোট ভাই সাগর ছাড়া আর কেউ তাকে দেখতে বারডেম হাসপাতালে যেতেন না।
বাবলি আরও জানান, গত ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে খোকন নন্দী একবার অসুস্থ হন। তখন তাকে কলাবাগানের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ সময় তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা তার ছোটভাই শান্তি নন্দীকে ফোনে বলেছিলেন, তোরা কি আমাকে দেখতে আসবি না? তখন শান্তি বলেছিলেন, আপনি মুসলমান। এসে কি করবো? আমরা তো আপনার লাশও পাবো না। তবে বারডেমে মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে দেখতে এসেছিলেন খোকার অন্য ভাইয়েরা। আর বারডেমে ভর্তির সময় বাবলি ফোনে ডেকে এনেছিলেন খোকনের ম্যানেজার দুলাল চন্দ্রকে। হাসপাতালের যাবতীয় কাগজে খোকনের নাম খোকন নন্দী লেখান দুলাল। ধর্মান্তরিত হলেও ব্যবসার প্রয়োজনে খোকন তার আগের নামই ব্যবহার করতেন বলে ফার্মগেট ক্যাপিটাল সুপার নামে তার মার্কেটের লোকজন জানিয়েছেন।
মোহাম্মদপুর থানাধীন রায়েরবাজারের সুলতানগঞ্জের কাপড় পট্টির ১৫ নম্বর হাজি ভবনের প্রথম তলার ১/সি নম্বর ফ্ল্যাটেও খোকন চৌধুরীর প্রথম স্ত্রী মীরা নন্দী তার ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে ভাড়া থাকেন। সেখানে থাকার সময় তিনি ধুতি পরে থাকতেন বলে তার পরিচিতরা বলেছেন। আর দ্বিতীয় স্ত্রী বাবলি খানমকে নিয়ে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে তার মাঝে মধ্যে ঝগড়া হতো। দ্বিতীয় স্ত্রী মুসলিম। আর প্রথম স্ত্রী হিন্দু। এজন্য কেউ কাউকে দেখতে পারতেন না। প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীর পক্ষ থেকে খোকনকে চাপ দেয়া হতো উভয়কে তালাক দেয়ার জন্য। মৃত্যুর প্রায় এক সপ্তাহ আগে তিনি বাসার পাশের মাংসের দোকান থেকে এক কেজি গরুর মাংস কিনে এনেছিলেন।
এর আগে খোকন নন্দীর ছেলে বাবলু জানিয়েছেন, তার বাবার লাশের শেষকৃত্য না হওয়ায় তাদের পরিবারের মাঝে হতাশা বিরাজ করছে। লাশ নিয়ে মামলা চলছে। মামলা মামলার মতোই চলবে। তবে এখন বিষয়টি আমার উপর নির্ভর করছে। তার বাবা যেন স্বর্গ লাভ করেন এজন্য গ্রামের বাড়িতে শ্রদ্ধানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
মৃত খোকন চৌধুর ওরফে খোকন নন্দীর ফার্মগেটের ক্যাপিটাল মার্কেটের প্রধান সিকিউরিটি গার্ড মোতালেব মিয়া জানান, মার্কেটের সবাই জানেন, মার্কেটের মালিক খোকন নন্দীর লাশ মর্গে পড়ে আছে। তবে একজন শিক্ষিকা ও মুসলিম স্ত্রী রয়েছে। এ নিয়ে বেশকিছু দিন আগে মার্কেটের ভেতরে একবার বিচার ডাকা হয়েছিল। ওই বিচারে কোনো মীমাংসা করতে পারেনি কেউ।
উল্লেখ্য, গত ২০০৯ সালে ২৫ ডিসেম্বর রাতে রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায় সন্ত্রাসীদের ছুরিকাঘাতে চন্দন কুমার চক্রবতী ওরফে সাজ্জাদ হোসেন নামে এক শিক্ষক খুন হন। এ ঘটনায় পুলিশ বাদি হয়ে মামলা করেন। পরে তার লাশ পলি আক্তার নামে মুসলিম যুবতি তার স্ত্রী পরিচয়ে লাশ দাফনের চেষ্টা করেন। এ সময় তিথি চক্রবর্তী নামে হিন্দু এক যুবতি তার প্রথম স্ত্রী দাবি করেন। এ ঘটনায় আদালতে মামলা হয়। মামলাটি দীর্ঘদিন আদালতে চলমান থাকে। শেষ পর্যন্ত নিহতের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগকে জনস্বার্থে দেওয়ার জন্য আদালত রায় দেন।